বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা বা মুদ্রাস্ফীতির বাজারে ঐতিহাসিকভাবেই সবচেয়ে বিশ্বস্ত সম্পদ হলো স্বর্ণ। যুগের পর যুগ ধরে মানুষ তাদের কষ্টার্জিত অর্থ নিরাপদে রাখতে স্বর্ণে বিনিয়োগ (Gold Investment) করে আসছে। বর্তমান বাজারে স্বর্ণের দামের ব্যাপক ওঠানামা থাকলেও দীর্ঘমেয়াদী সম্পদ হিসেবে এর আবেদন কমেনি বরং বেড়েছে।
আরও পড়ুন:
সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের অতুলনীয় গুরুত্ব: কেন একে বলা হয় বিনিয়োগের নিরাপদ স্বর্গ?
মানব সভ্যতার শুরু থেকেই প্রাচুর্য ও আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে স্বর্ণের অবস্থান সবার উপরে। বর্তমান যুগে ডিজিটাল কারেন্সি বা কাগজের মুদ্রার দাপট থাকলেও সম্পদ হিসেবে স্বর্ণের (Gold as an Asset) গুরুত্ব বিন্দুমাত্র কমেনি। বরং বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা ও মুদ্রাস্ফীতির এই সময়ে বিনিয়োগকারীরা অন্য সব মাধ্যম ছেড়ে স্বর্ণের দিকেই ঝুঁকছেন। স্বর্ণ কেন একটি অনন্য সম্পদ তা বিশ্লেষণ করা হলো।
১. মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার (Hedge Against Inflation): যখন বাজারে নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যায় এবং কাগজের মুদ্রার মান কমতে থাকে, তখন স্বর্ণ তার মূল্য ধরে রাখে। ইতিহাস বলছে, দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণের দাম সবসময়ই সাধারণ মুদ্রাস্ফীতির হারের চেয়ে বেশি বেড়েছে। তাই সঞ্চিত অর্থের মান ধরে রাখতে স্বর্ণে বিনিয়োগ (Gold Investment) সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
২. সংকটে নিরাপদ বিনিয়োগ (Safe Haven in Crisis): ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ (যেমন: রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত) বা বৈশ্বিক মহামারীর সময় যখন শেয়ার বাজার ও রিয়েল এস্টেট ব্যবসায় ধস নামে, তখন স্বর্ণের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে। এজন্যই অর্থনীতিবিদরা একে নিরাপদ আশ্রয় (Safe Haven) বলে অভিহিত করেন। এটি এমন এক সম্পদ যা কখনো দেউলিয়া হয় না।
৩. সহজ নগদায়ন ও তারল্য (High Liquidity): জমি বা ফ্ল্যাট বিক্রি করতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয়, কিন্তু স্বর্ণের ক্ষেত্রে তা হয় না। আপনি পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে যেকোনো সময় স্বর্ণ দ্রুত নগদ টাকায় (Instant Cash) রূপান্তর করতে পারবেন। এই উচ্চ তারল্যের কারণে এটি জরুরি প্রয়োজনে মানুষের সবচেয়ে বড় ভরসা।
৪. দুষ্প্রাপ্যতা ও অক্ষয় গুণ (Scarcity and Indestructibility): স্বর্ণ একটি বিরল ধাতু (Rare Metal)। এটি ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা সম্ভব নয় এবং খনি থেকে উত্তোলনের পরিমাণও সীমিত। এছাড়া স্বর্ণের ক্ষয় নেই, এটি মরিচাহীন এবং হাজার বছর ধরে এর ঔজ্জ্বল্য বজায় রাখে। এই সীমাবদ্ধ যোগান ও স্থায়ী গুণই এর দামকে সবসময় উঁচুতে রাখে।
আরও পড়ুন:
বিনিয়োগের আগে করণীয় (Things to Consider Before Buying)
স্বর্ণ কেনার আগে অবশ্যই বর্তমানের বাজারদর (Market Rate) এবং স্বর্ণের মান বা ক্যারেট (Carat) যাচাই করে নিতে হবে। এছাড়া হলমার্ক করা স্বর্ণ কেনা এবং ক্রয়ের রসিদ সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
মহাজাগতিক সৃষ্টি ও স্বর্ণের বিরলতা (Cosmic Origin and Rarity of Gold)
বিজ্ঞানীদের মতে, স্বর্ণের জন্ম কোনো ল্যাবরেটরিতে হয়নি। মহাকাশে হলুদাভ বা উজ্জ্বল হলুদ রঙের নক্ষত্র, যাদের বলা হয় সুপারনোভা (Supernova), তাদের প্রচণ্ড বিস্ফোরণের ফলেই স্বর্ণের সৃষ্টি। এই বিস্ফোরণের পর স্বর্ণ বায়বীয় আকারে ছিল এবং পরবর্তীতে সৌরজগৎ গঠনের সময় তা একত্রিত হয়ে পৃথিবীতে আসে। স্বর্ণের পারমাণবিক সংখ্যা ৭৯, যাতে ৭৯টি প্রোটন ও ইলেকট্রন এবং ১১৮টি নিউট্রন রয়েছে। মানুষের পক্ষে এই বিরল ধাতু (Rare Metal) তৈরি করা অসম্ভব, আর এই দুষ্প্রাপ্যতাই একে চিরকাল দামী করে রেখেছে।
আকর্ষণীয় ও অক্ষয় বৈশিষ্ট্য (Attractive and Indestructible Nature)
প্রাচীন মিশর থেকে চীন—পৃথিবীর প্রতিটি সংস্কৃতিতেই স্বর্ণ ছিল আরাধনা ও সাজসজ্জার অবিচ্ছেদ্য অংশ। গহনা তৈরির জন্য এর চেয়ে আকর্ষণীয় ধাতু (Attractive Metal) আর নেই। স্বর্ণের সবচেয়ে বড় গুণ হলো এটি অক্ষয় (Indestructible)। এটি বাতাসের অক্সিজেনের সাথে কোনো প্রতিক্রিয়া করে না, তাই এতে কখনোই মরিচা ধরে না। সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যত স্বর্ণ উত্তোলিত হয়েছে, তার প্রতিটি কণা আজও পৃথিবীতে কোনো না কোনো রূপে টিকে আছে।
সহজ বহনযোগ্যতা ও তারল্য (Portability and High Liquidity)
স্বর্ণকে ভেঙে ছোট ছোট টুকরো করা অত্যন্ত সহজ এবং যেকোনো অবস্থায় এটি তার মূল্য ধরে রাখে। যেখানে একটি কাগজের মুদ্রা ছিঁড়ে গেলে তার মূল্য থাকে না, সেখানে স্বর্ণের টুকরোকেও বাজারমূল্যে বিক্রি করা সম্ভব। এটি অত্যন্ত সহজ বিক্রয়যোগ্য সম্পদ (Easy to Liquidate Asset)। বিশেষ করে ভারত ও চীনে স্বর্ণের ক্রেতা সবসময় বেশি থাকে বলে এর বাজার কখনোই মন্দা হয় না।
বিনিয়োগের নিরাপদ আশ্রয়স্থল (Safe Haven for Investment)
গত তিন হাজার বছরের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, স্বর্ণে বিনিয়োগ কখনো কাউকে দেউলিয়া করেনি। স্বর্ণ দখলের জন্য কাগুজে দলিলের প্রয়োজন হয় না; এটি নিজেই একটি সম্পদ। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময় দেখা গেছে, যখন সবকিছুর দাম অনিশ্চিত, তখন ২০২২-এর শুরুতে প্রতি আউন্স স্বর্ণের দাম (Gold Price Per Ounce) ১,৮০০ ডলার থেকে বেড়ে ২,০৪৩ ডলারে উন্নীত হয়েছিল। ২০২০ সালের করোনাকালীন সংকটেও স্বর্ণের দাম সর্বোচ্চ ২,০৭০ ডলারে উঠেছিল। মার্কিন ডলারের দামের ওঠানামা এবং ভূ-রাজনীতি (Geopolitics) যাই হোক না কেন, স্বর্ণ সবসময়ই বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি নিরাপদ আশ্রয় (Safe Haven)।
আরও পড়ুন:
বিশ্বের স্বর্ণের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে চীন: রেকর্ড রিজার্ভ ও সাধারণ মানুষের স্বর্ণ কেনার ধুম
বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সম্ভাব্য বাণিজ্যযুদ্ধের আশঙ্কায় বর্তমানে স্বর্ণ কেনায় বিশ্বকে নেতৃত্ব দিচ্ছে চীন। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে শুরু করে সাধারণ নাগরিক—সবাই এখন ঝুঁকছেন এই নিরাপদ ধাতুর দিকে। মূলত ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকটের প্রেক্ষাপটে চীনের এই বিশাল স্বর্ণ ক্রয় (Gold Purchase) বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামকে অস্বাভাবিক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশাল মজুত (PBOC Gold Reserve)
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের (World Gold Council) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘পিপলস ব্যাংক অব চায়না’ (PBOC) গত দুই বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমিয়ে স্বর্ণের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ করছে। বর্তমানে চীনের কাছে অবিশ্বাস্য ২ হাজার ২৯৮ টন (২২ লাখ ৯৮ হাজার কিলোগ্রাম) স্বর্ণের রিজার্ভ রয়েছে। উল্লেখ্য যে, ২০২৪ সালের শেষেও এই মজুত ছিল ২ হাজার ২৭৯ টন। চীনের এই আগ্রাসী ভুমিকা দেখে উন্নয়নশীল অন্যান্য দেশগুলোও এখন তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ (Gold Reserve) বাড়াতে আগ্রহী হয়ে উঠছে।
সাংহাই গোল্ড এক্সচেঞ্জ ও সাধারণ নাগরিকদের আগ্রহ (Shanghai Gold Exchange and Retail Demand)
শুধুমাত্র কেন্দ্রীয় ব্যাংকই নয়, চীনের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও স্বর্ণ কেনার এক নজিরবিহীন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। চীনের অভ্যন্তরীণ সাংহাই গোল্ড এক্সচেঞ্জে (Shanghai Gold Exchange) রেকর্ড পরিমাণ বেচাকেনার তথ্য পাওয়া গেছে। দেশটির সাধারণ মানুষ এখন নগদ টাকার চেয়ে স্বর্ণের মুদ্রা, বার এবং গয়না জমানোকে বেশি নিরাপদ মনে করছেন। এমনকি বিয়ে বা বিশেষ পারিবারিক উৎসবে উপহার হিসেবে স্বর্ণের বার দেওয়ার রীতি এখন চীনাদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
বৈশ্বিক বাজারে প্রভাব (Global Market Impact)
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের এই ব্যাপক চাহিদাই বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম কমার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখনই বড় কোনো অর্থনীতির দেশ এভাবে স্বর্ণের ভাণ্ডার গড়ে তোলে, তখন আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের সরবরাহ (Gold Supply) কমে যায় এবং দাম বেড়ে যায়। চীনের এই পদক্ষেপ মূলত মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের অর্থনীতিকে সুরক্ষা দেওয়ার একটি দীর্ঘমেয়াদী কৌশল।
আরও পড়ুন:
স্বর্ণের বাজারে ভারতের দাপট: ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক সুরক্ষায় কেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী এই ধাতু?
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের চাহিদার কথা উঠলে চীনের পরেই আসে ভারতের নাম। ভারতীয়দের কাছে স্বর্ণ কেবল একটি মূল্যবান ধাতু নয়, বরং এটি তাদের সংস্কৃতি, ধর্ম এবং পারিবারিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্তমানে স্বর্ণের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার (Second Largest Gold Market) হিসেবে ভারত আন্তর্জাতিক দাম নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রাখছে।
ঐতিহ্য, ধর্ম ও শুভক্ষণ (Tradition, Religion, and Auspicious Occasions)
ভারতে বিয়েতে নববধূকে স্বর্ণের গয়না দেওয়া একটি প্রাচীন ও আবশ্যিক রীতি। এছাড়া নির্দিষ্ট ধর্মীয় উৎসবে স্বর্ণ কেনাকে অত্যন্ত শুভ মনে করা হয়। বিশেষ করে দীপাবলি বা দিওয়ালির (Diwali) আগে ‘ধনতেরস’ উপলক্ষে এক টুকরো স্বর্ণের কেনা মানেই লক্ষ্মী লাভ—এমন বিশ্বাস থেকে দেশটিতে প্রতি বছর এই সময়ে স্বর্ণ বিক্রির হিড়িক পড়ে। এই ধর্মীয় ও সামাজিক চাহিদাই ভারতের বাজারে স্বর্ণের দাম (Gold Price) বৃদ্ধিতে প্রধান প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।
দুর্দিনের অকৃত্রিম বন্ধু (Hedge Against Crisis)
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতীয়রা স্বর্ণেকে ‘দুর্দিনের সহায়’ হিসেবে বিবেচনা করে। করোনা মহামারীর সময় যখন অনেক পরিবার আর্থিক সংকটে পড়েছিল, তখন তারা গচ্ছিত স্বর্ণালঙ্কার, বার বা কয়েন বিক্রি করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। এছাড়া গোল্ড লোন বা স্বর্ণ বন্ধক রেখে ঋণ (Gold Loan) নেওয়ার প্রবণতাও দেশটিতে অনেক বেশি। এই সুরক্ষিত বিনিয়োগের (Safe Investment) কারণেই ভারতীয় পরিবারগুলো সঞ্চয়ের একটি বড় অংশ স্বর্ণ রূপান্তর করে।
বৈশ্বিক অস্থিরতা ও মুদ্রাস্ফীতি (Global Instability and Inflation)
রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত শুরুর পর থেকে ভারতের বাজারে স্বর্ণের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, যতক্ষণ ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বজায় থাকবে, ততক্ষণ মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে রক্ষক (Hedge Against Inflation) হিসেবে স্বর্ণের কদর কমবে না। বৈশ্বিক মন্দার সময়ে ভারতীয় বিনিয়োগকারীরা শেয়ার বাজারের তুলনায় স্বর্ণের বিনিয়োগ করাকেই বেশি নিরাপদ মনে করছেন।
আরও পড়ুন:
বিশ্ব কার রিজার্ভে কত স্বর্ণের? শীর্ষস্থানে যুক্তরাষ্ট্র, তলানিতে পাকিস্তান ও দক্ষিণ এশিয়ার অবস্থান
বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতায় প্রতিটি দেশই তাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে সুরক্ষিত রাখতে স্বর্ণে বিনিয়োগ করছে। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল (World Gold Council) এবং আইএমএফ-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, উন্নত দেশগুলো তাদের মোট সম্পদের একটি বিশাল অংশ স্বর্ণে রূপান্তর করে রেখেছে। মূলত মুদ্রাস্ফীতি ও বৈশ্বিক মন্দা থেকে বাঁচতে স্বর্ণের রিজার্ভ (Gold Reserve) বাড়ানোই এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর প্রধান লক্ষ্য।
শীর্ষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশসমূহ (US and Europe Gold Reserves)
বিশ্বের বৃহত্তম স্বর্ণের রিজার্ভের মালিক হলো যুক্তরাষ্ট্র (USA)। দেশটির কাছে বর্তমানে মোট ৮ হাজার ১৩৩ টন (৮১ লাখ ৩৩ হাজার কেজির বেশি) স্বর্ণ রয়েছে, যা তাদের মোট বিদেশি সম্পদের প্রায় ৭৮ শতাংশ। আইএমএফ-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৪ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্স এবং ইতালির কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত স্বর্ণের মজুত দাঁড়াবে ১৬ হাজার ৪০০ টনে।
ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার চিত্র (India and South Asia Gold Status)
দক্ষিণ এশিয়ায় স্বর্ণ মজুতে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে ভারত (India)। দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বর্তমানে ৮৮০ টন (৮ লাখ ৮০ হাজার কেজি) স্বর্ণের রিজার্ভ রয়েছে। বর্তমান বাজার মূল্যে এর দাম প্রায় ৯ হাজার ৩০০ কোটি ডলার, যা ভারতের মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ১৩ শতাংশ।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের অবস্থান (Bangladesh and Pakistan Gold Reserve)
অন্যতম উদীয়মান অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ (Bangladesh) তার রিজার্ভের একটি অংশ স্বর্ণ ধরে রেখেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বর্তমানে ১৪ দশমিক ৮ টন (১৪ হাজার ৮০০ কেজি) স্বর্ণের রিজার্ভ রয়েছে, যা দেশের মোট রিজার্ভের ৫.৬৫ শতাংশ। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক সংকটে থাকা পাকিস্তান (Pakistan) এর কাছে রয়েছে মাত্র ৬ দশমিক ৪ টন (৬ হাজার ৪০০ কেজি) স্বর্ণ, যার বাজার মূল্য প্রায় ৭০০ কোটি ডলার।
আরও পড়ুন:
আরও পড়ুন:
বিশ্বের শীর্ষ ৩০ স্বর্ণ রিজার্ভধারী দেশ: কোন দেশের ভাণ্ডারে কত স্বর্ণ?
বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, ডলারের মান নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির বাজারে বিশ্বের দেশগুলো তাদের রিজার্ভকে নিরাপদ রাখতে স্বর্ণের বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে স্বর্ণ এখন কেবল একটি সম্পদ নয়, বরং অর্থনৈতিক সুরক্ষার প্রধান হাতিয়ার। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, শীর্ষ ৩০টি দেশের ভাণ্ডারে থাকা স্বর্ণের পরিমাণ বিশ্ব অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষায় বড় ভূমিকা পালন করছে।
স্বর্ণের রিজার্ভ ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট (Gold Reserves and Global Context)
উন্নত দেশগুলো ঐতিহাসিকভাবেই বিশাল স্বর্ণের মজুত গড়ে তুলেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে চীন, ভারত এবং রাশিয়ার মতো দেশগুলো দ্রুত তাদের স্বর্ণের রিজার্ভ (Gold Reserve) বৃদ্ধি করছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম (Gold Price) যেমন বাড়ছে, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের একক আধিপত্য চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। নিচে শীর্ষ ৩০টি দেশের স্বর্ণের মজুত পরিস্থিতি তুলে ধরা হলো:
আরও পড়ুন:
স্বর্ণে বিনিয়োগ ও এর গুরুত্ব নিয়ে বহুল জিজ্ঞাসিত প্রশ্নোত্তর-FAQ
প্রশ্ন: স্বর্ণে বিনিয়োগ করা কি সত্যিই লাভজনক? (Is Investing in Gold Profitable)
উত্তর: হ্যাঁ, দীর্ঘমেয়াদে স্বর্ণ সবসময় লাভজনক। গত ৫ বছরে বাংলাদেশে স্বর্ণের দাম প্রায় ১৪৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি মুদ্রাস্ফীতির সাথে পাল্লা দিয়ে নিজের মূল্য বজায় রাখতে পারে।
প্রশ্ন: অর্থনৈতিক মন্দার সময় কেন সবাই স্বর্ণ কিনতে চায়? (Why Buy Gold During Recession)
উত্তর: মন্দার সময় শেয়ার বাজার বা মুদ্রার মান কমে গেলেও স্বর্ণের দাম সাধারণত স্থিতিশীল থাকে বা বাড়ে। একে ‘নিরাপদ আশ্রয়’ (Safe Haven) বলা হয় কারণ এটি কখনোই দেউলিয়া হয় না।
প্রশ্ন: মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে স্বর্ণ কীভাবে সুরক্ষা দেয়? (How Gold Protects Against Inflation)
উত্তর: যখন জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে এবং টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, তখন স্বর্ণের দাম সাধারণত বৃদ্ধি পায়। ফলে আপনার জমানো অর্থের মান স্বর্ণের মাধ্যমে সংরক্ষিত থাকে।
প্রশ্ন: স্বর্ণ কি অক্ষয় সম্পদ? (Is Gold an Indestructible Asset)
উত্তর: হ্যাঁ, স্বর্ণের ক্ষয় নেই। এটি অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে না বলে এতে মরিচা ধরে না। সৃষ্টির শুরু থেকে এ পর্যন্ত আহরিত প্রায় সব স্বর্ণই আজও কোনো না কোনো রূপে টিকে আছে।
প্রশ্ন: বিনিয়োগের জন্য অলঙ্কার নাকি গোল্ড বার—কোনটি সেরা? (Jewelry vs. Gold Bars for Investment)
উত্তর: বিনিয়োগের জন্য গোল্ড বার বা কয়েন সেরা। অলঙ্কারের ক্ষেত্রে বড় অংকের 'মেকিং চার্জ' ও ভ্যাট দিতে হয়, যা বিক্রির সময় ফেরত পাওয়া যায় না। বার বা কয়েনে এই খরচ অনেক কম।
প্রশ্ন: স্বর্ণ সহজে নগদায়ন করা যায় কি? (Is Gold Highly Liquid)
উত্তর: হ্যাঁ, স্বর্ণ বিশ্বের সবচেয়ে ‘লিকুইড’ বা সহজলভ্য সম্পদ। যেকোনো সময় যেকোনো জুয়েলারি দোকানে নিয়ে গিয়ে তাৎক্ষণিক নগদ টাকা পাওয়া সম্ভব।
প্রশ্ন: ক্যারেট (Carat) বলতে কী বোঝায়? (What does Gold Carat mean?)
উত্তর: ক্যারেট স্বর্ণের বিশুদ্ধতার একক। ২৪ ক্যারেট হলো সবচেয়ে বিশুদ্ধ স্বর্ণ (৯৯.৯%)। গয়না তৈরির জন্য সাধারণত ২১ বা ২২ ক্যারেট স্বর্ণ ব্যবহার করা হয় কারণ বিশুদ্ধ স্বর্ণ অত্যন্ত নরম হয়।
প্রশ্ন: স্বর্ণ কেনার সময় হলমার্ক কেন জরুরি? (Importance of Hallmark in Gold)
উত্তর: হলমার্ক হলো স্বর্ণের বিশুদ্ধতার গ্যারান্টি। এটি দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় যে আপনি সঠিক ক্যারেটের স্বর্ণ কিনছেন এবং পরবর্তীতে বিক্রির সময় এর সঠিক মূল্য পাবেন।
প্রশ্ন: বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো কেন সোনা মজুদ করে? (Why Central Banks Reserve Gold)
উত্তর: ডলারের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং দেশের মুদ্রার মান শক্তিশালী রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো স্বর্ণ মজুদ করে। এটি রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির একটি শক্তিশালী সুরক্ষা কবজ।
প্রশ্ন: স্বর্ণের দাম কীসের ওপর ভিত্তি করে ওঠানামা করে? (Factors Affecting Gold Price)
উত্তর: আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের মান, ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা (যেমন যুদ্ধ), সুদের হার এবং চীন ও ভারতের মতো দেশগুলোর চাহিদার ওপর ভিত্তি করে স্বর্ণের দাম কমে বা বাড়ে।
প্রশ্ন: ডিজিটাল গোল্ড বা গোল্ড ইটিএফ (ETF) কী? (What is Digital Gold or Gold ETF)
উত্তর: এটি হলো সশরীরে স্বর্ণ না কিনে অনলাইনে স্বর্ণের মালিক হওয়া। এতে ছোট অংকের টাকা দিয়ে বিনিয়োগ শুরু করা যায় এবং লকার বা নিরাপত্তার দুশ্চিন্তা থাকে না।
প্রশ্ন: স্বর্ণ কি একটি বহুমুখী সম্পদ? (Is Gold a Versatile Asset?)
উত্তর: হ্যাঁ, এটি যেমন আভিজাত্যের গয়না হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তেমনি ইলেকট্রনিক্স, চিকিৎসা এবং মহাকাশ বিজ্ঞানেও এর বিশাল চাহিদা রয়েছে।
প্রশ্ন: পুরানো স্বর্ণ বিক্রির সময় দাম কি কম পাওয়া যায়? (Resale Value of Old Gold)
উত্তর: সাধারণত বাজুস (BAJUS) নির্ধারিত নিয়মে বিক্রির সময় কিছু শতাংশ চার্জ কাটা হয়। তবে স্বর্ণের মান ঠিক থাকলে বর্তমান বাজারমূল্য অনুযায়ী আপনি লাভজনক রিটার্ন পাবেন।
প্রশ্ন: স্বর্ণ কি মরিচাহীন সম্পদ? (Is Gold Rust-free)
উত্তর: হ্যাঁ, স্বর্ণ প্রাকৃতিকভাবেই মরিচাহীন। এটি হাজার বছর মাটির নিচে থাকলেও তার উজ্জ্বলতা ও ওজন হারায় না।
প্রশ্ন: স্বর্ণ কেন একটি বিরল ধাতু? (Why is Gold a Rare Metal)
উত্তর:স্বর্ণ ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা সম্ভব নয়। এটি মহাকাশে সুপারনোভা বিস্ফোরণের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে এবং পৃথিবীতে এর যোগান অত্যন্ত সীমিত।





