Recent event

বিশ্বজুড়ে ইফতারের বৈচিত্র্য: ইউনেস্কোর স্বীকৃতি ও বিভিন্ন দেশের ঐতিহ্যবাহী খাবার

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইফতার
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইফতার | ছবি: এখন টিভি
0

রমজান মাস মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে পবিত্র সময় (Holy Month of Ramadan)। এই মাসে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকেন। মাগরিবের আজান (Maghrib Adhan) নামাজের সঙ্গে সঙ্গে মুখে খাবার তুলে রোজা ভাঙার এই মুহূর্তকে বলা হয় ‘ইফতার’ (Iftar)।

বিশ্বের বড় অংশে মুসলমানরা ইফতার শুরু করেন হালকা খাবার যেমন খেজুর (Dates) ও পানি (Water) দিয়ে। তবে দেশের ও অঞ্চলের স্বাদ-সংস্কৃতির কারণে ইফতারের খাবার তালিকায় রয়েছে নানা রকম বৈচিত্র্য।

পাকিস্তানে মাংসের নানা পদ (Iftar in Pakistan)

পাকিস্তানে মুসলিম জনগোষ্ঠী দেশটির মোট জনসংখ্যার ৯৮ শতাংশের বেশি। এখানকার ইফতারে পানি ও খেজুর থাকলেও, প্রধান আকর্ষণ থাকে মাংসের নানা পদ (Meat Dishes)।

কাবাব (Kebab), টিক্কা (Tikka), তান্দুরি (Tandoori), কাটলেট (Cutlet) প্রতিদিনের ইফতারের প্রধান খাবার। পাশাপাশি থাকে বিভিন্ন ভাজাপোড়া যেমন সমুচা (Samosa), চপ (Chop), পাকোড়া (Pakora)। নানারকম ফল, ফলের সালাদ (Fruit Salad), ছোলা-বুট, ফালুদা (Falooda), জিলাপি, এমনকি বিরিয়ানি (Biryani)। সব মিলিয়ে পাকিস্তানির ইফতারের টেবিল থাকে পুরোপুরি সাজানো। সেখানে পানীয় হিসেবে সবচেয়ে জনপ্রিয় ‘রুহ আফজা’ (Rooh Afza)।

আরও পড়ুন:

ফল ও মিষ্টির দেশ ইন্দোনেশিয়া (Iftar in Indonesia)

ইন্দোনেশিয়ার মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৮৫ শতাংশ। এখানকার ইফতারে মূল প্রাধান্য পান বিভিন্ন ধরনের ফল ও ফলের শরবত (Fruit Juice)।

ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি যেমন বুবুর চ্যান্ডিল (Bubur Candil), বিজি সালাক (Biji Salak), কলা বা কুমড়া দিয়ে তৈরি কোলাক (Kolak), এস পিসাং ইজো (Es Pisang Ijo) ইত্যাদি ইফতারের সময় তৈরি হয়। তেল ও মশলার চেয়ে এগুলো ইফতারের কেন্দ্রবিন্দু।

ভারতে রাজ্যভেদে ইফতারের ভিন্নতা (Iftar in India)

ভারতের মোট মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ইফতারের খাবার আলাদা। হায়দ্রাবাদে হালিম (Haleem) ইফতারের প্রধান খাবার। কেরালা ও তামিলনাড়ুতে ‘নমবু কাঞ্জি’ (Nombu Kanji), মাংস, সবজি ও পরিজের সমন্বয়ে তৈরি ঐতিহ্যবাহী খাবার।

সামগ্রিকভাবে ভারতে ভাজাপোড়া, সমুচা, চপ ইত্যাদি বিক্রির প্রচলন আছে। মাগরিবের আগে খেজুর, ছোলা-বুট, ফল, দুধ, দই (Curd) ইত্যাদি দিয়ে ইফতার শুরু হয়। ভারী খাবারের মধ্যে থাকে কাবাব, হালিম, কাটলেট, শর্মা (Shawarma), বিরিয়ানি।

খেজুরের সঙ্গে ভাজাপোড়া আমাদের প্রিয় (Iftar in Bangladesh)

পেঁয়াজু (Piyaju), বেগুনি (Beguni), আলুর চপ (Alu Chop) বা পাকোড়া ছাড়া যেন বাংলাদেশে ইফতার আয়োজন ঠিক জমে ওঠে না। মুড়ি (Puffed Rice), ছোলা-বুট (Chola Boot), জিলাপি (Jalebi), হালিম, বিভিন্ন শরবত (Sharbat) ও ফল ইফতারের অপরিহার্য অংশ। হাতে তৈরি পিঠা-পুলি, তেহারি (Tehari), বিরিয়ানি, খিচুড়ি (Khichuri), তন্দুরি চিকেন (Tandoori Chicken), সবই ইফতারের সময়ে উপভোগ করা হয়। তবে খেজুর বাংলাদেশের ইফতারের প্রতীক।

আরও পড়ুন:

শর্করা ও ফলের দেশ নাইজেরিয়া (Iftar in Nigeria)

পশ্চিম আফ্রিকার নাইজেরিয়ার মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৯ কোটি ৭০ লাখ। ইফতারে জল্লফ রাইস (Jollof Rice), মই মই (Moin Moin/Pudding), ইয়াম (Yam), আকারা (Akara/Bean Cake), মাসা (Masa/Rice Cake) ইত্যাদি খাওয়া হয়।

মিশর মানেই আলোর ইফতার (Iftar in Egypt)

মিশরের মুসলিমরা ইফতারে রঙিন লণ্ঠন (Ramadan Lanterns/Fanous) জ্বালিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি করেন। ইফতারের প্রধান খাবার ‘আতায়েফ’ (Atayef/Pancake) ও ‘কুনাফা’ (Kunafa/Syrup Dessert)।

বাড়িতে বাদামি রুটি, মটরশুঁটি, টমেটো, অলিভ অয়েল দিয়ে ‘ফুল মেদেমাস’ (Ful Medames) খাওয়া হয়। কামার-আল-দিনান্দ আরায়সি, সোবিয়া (Sobya), দুধ, ভ্যানিলা, নারকেল দিয়ে তৈরি পানীয়ও ইফতারের সময়ে জনপ্রিয়।

তুরস্কে পিদেসি আর কাবাব (Iftar in Turkey)

তুরস্কের মুসলিম জনসংখ্যা প্রায় ৯৮ শতাংশ। ইফতারে খেজুর, ফলমূল, শরবত, বিভিন্ন কাবাবের পাশাপাশি সবচেয়ে পছন্দের খাবার হলো ‘রামাজান পিদেসি’ (Ramazan Pidesi), ময়দা, দুধ, মাখন, জলপাই দিয়ে খামির তৈরি রুটি, ভেতরে ডিম ও গরুর মাংসের পুর।

ইরানের ইফতারে হালুয়া ও পুডিং (Iftar in Iran)

ইরানের ৯২ শতাংশ মানুষ মুসলিম। ইফতারে ঘরে ঘরে তৈরি হয় জাফরানের ঘ্রাণযুক্ত পার্শিয়ান হালুয়া (Persian Halwa)। এছাড়া জাফরান চাল দিয়ে তৈরি ‘শোলেহ জার্দ’ (Sholeh Zard), ঘন স্যুপ ‘আশ রাসতেহ’ (Ash Reshteh), হালিম, স্যান্ডউইচ, চা, তাবরেজি চিজ (Tabrizi Cheese), জিলাপি (Bamieh) ইফতারের তালিকায় থাকে। খেজুর ইরানের ইফতারে অপরিহার্য (Essential)।

আরও পড়ুন:

আলজেরিয়া ও সৌদি আরবের স্থানীয় স্বাদ (Iftar in Algeria & Saudi Arabia)

আলজেরিয়ার মুসলিমরা ইফতারে পিজ্জা ‘সোয়ারবা’ (Shorba), সবজি রোল, দোলমা (Dolma) দিয়ে শুরু করেন। মাগরিবের পরে পানীয় হিসেবে ‘সিগার’ (Bourek/Cigar) পান।

সৌদি আরবের মানুষরা ইফতারে ‘গাহওয়া’ (Gahwa/Arabic Coffee) এবং খেজুর খান। এরপর অঞ্চলভেদে ভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী খাবার যেমন শৌরাইক (Shuraik), দুজ্ঞাহ, সালুনা (Saluna), আসিদাহ (Asidah), মারগগ (Marqoq), মাফরৌক, মাতাজিজ (Matazeez) বা থারিদ (Tharid) খাওয়া হয়।

ইফতারে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি (UNESCO Recognition for Iftar)

ইফতার কেবল খাবারের আয়োজন নয়, এটি সামাজিক মিলন ও সংস্কৃতির অংশ। ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর ইউনেস্কো এটিকে ‘অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ (Intangible Cultural Heritage) হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তুরস্ক (Turkey), ইরান (Iran), উজবেকিস্তান (Uzbekistan) ও আজারবাইজান (Azerbaijan) যৌথভাবে এই আবেদন জানিয়েছিল।

দেশ (Country) প্রধান খাবার (Main Dishes) বিশেষ পানীয় (Special Drinks)
বাংলাদেশ পিঁয়াজু, বেগুনি, ছোলা-বুট, হালিম। লেবুর শরবত, রুহ আফজা।
পাকিস্তান শিক কাবাব, তন্দুরি, চিকেন বিরিয়ানি। ফালুদা, লাচ্ছি।
সৌদি আরব খুরমা খেজুর, থারিদ, আসিদাহ। গাহওয়া (আরবি কফি)।
তুরস্ক রামাজান পিদেসি (রুটি), হরেক কাবাব। আইরান, ফলের শরবত।
ইন্দোনেশিয়া কোলাক (মিষ্টি পদ), বুবুর চ্যান্ডিল। এস পিসাং ইজো।
মিশর আতায়েফ (প্যানকেক), কুনাফা। সোবিয়া, কামার-আল-দিন।

এসআর