আশুরার রোজা কি একটি রাখা যাবে? জানুন মহররমের রোজা ও তাৎপর্য

আশুরার রোজা কয়টি ও কি কি
আশুরার রোজা কয়টি ও কি কি | ছবি: এখন টিভি
0

মহিমান্বিত ও তাৎপর্যপূর্ণ ইসলামি মাস মহররমের আগমন ঘটেছে। এই মাসের ১০ তারিখকে পবিত্র আশুরা (Holy Ashura 2026) বলা হয়, যা মুসলিম উম্মাহর কাছে অত্যন্ত বরকতময় ও ফজিলতপূর্ণ একটি দিন। তবে প্রতিবছর মহররমের আগমন ঘটলেই সাধারণ মুসলমানদের মনে একটি প্রশ্ন বারবার উঁকি দেয় আশুরার রোজা কি একটা রাখা যায় (Can we keep one fast for Ashura), নাকি দুটি রোজা রাখা আবশ্যক?

ইসলামি শরিয়তের আলোকে এ বিষয়ে একটি অত্যন্ত স্পষ্ট এবং ভারসাম্যপূর্ণ দিকনির্দেশনা রয়েছে। আশুরার রোজার সুন্নাহ পদ্ধতি, সঠিক সংখ্যা এবং এর পেছনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

আশুরার রোজা কি একটি রাখা জায়েজ? (Is it permissible to fast only on the day of Ashura)

ইসলামি ফিকহ ও মুহাদ্দিসদের মতে, কেউ যদি কেবল ১০ই মহররম একটি আশুরার রোজা (Single fast of Ashura) রাখেন, তবে তার রোজাটি ভেঙে যাবে না বা গুনাহ হবে না; বরং তার রোজা আদায় হয়ে যাবে এবং তিনি ফজিলতও লাভ করবেন। তবে ইহুদিদের সংস্কৃতির সাথে যেন মুসলমানদের ইবাদতের হুবহু মিল না হয়ে যায়, সেজন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু একটি রোজা রাখাকে অনুত্তম বা মাকরূহ তানজিহি বলেছেন।

আরও পড়ুন:

সহিহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) জীবনের শেষ বছর বলেছিলেন, "আমি যদি আগামী বছর বেঁচে থাকি, তবে অবশ্যই ৯ তারিখেও (১০ তারিখের সাথে মিলিয়ে) রোজা রাখব।" (সহিহ মুসলিম: ১১৩৪)। কিন্তু পরবর্তী মহররম আসার আগেই নবীজি (সা.) ইন্তেকাল করেন। তাই সুন্নতের পরিপূর্ণ অনুসরণ এবং ইহুদিদের আমলের সাথে অমিল রাখার জন্য আশুরার রোজা দুটি রাখা উত্তম (Better to keep two fasts of Ashura)।

আশুরার রোজা রাখার সঠিক নিয়ম ও সময়সূচি (Correct method and timing of Ashura fasting)

হাদিস শরিফ ও ওলামাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, আশুরার রোজা রাখার ক্ষেত্রে তিনটি স্তর বা পদ্ধতি রয়েছে:

১. সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি: মহররমের ৯, ১০ এবং ১১ তারিখ টানা তিন দিন রোজা রাখা।

২. মধ্যম বা সুন্নাহ পদ্ধতি: মহররমের ৯ ও ১০ তারিখ (যেমন এই বছর ২৫ ও ২৬ জুন) অথবা ১০ ও ১১ তারিখ মিলিয়ে মোট ২টি রোজা রাখা।

৩. অনুতম পদ্ধতি: কোনো বিশেষ অপারগতার কারণে কেবল ১০ই মহররম একটি মাত্র রোজা পালন করা।

আশুরার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও নবীজির নির্দেশনা (Historical background of Ashura)

হিজরি সনের প্রথম মাস মহররমকে (Month of Muharram) ইসলামের দৃষ্টিতে একটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ মাস হিসেবে গণ্য করা হয়। পৃথিবীর শুরু থেকে যুগে যুগে এই দিবসে বহু স্মরণীয় ও ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। মহান আল্লাহ যেদিন আকাশ, বাতাস, পাহাড়-পর্বত ও যাবতীয় সৃষ্টি-জীবের আত্মা সৃষ্টি করেছিলেন, সে দিনটি ছিল ১০ই মহররম।

আরও পড়ুন:

হাদিসের বিবরণে ইমাম বুখারি (রহ.) সাহাবি হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরত করে মদিনায় পৌঁছে দেখতে পান যে, মদিনার ইহুদিরা আশুরার দিনে রোজা পালন করছে। নবীজি তাদের জিজ্ঞেস করেন, "এ দিনে কী ঘটেছে যে তোমরা রোজা পালন করো?" তারা বলে, "এই দিনটি অনেক বড় দিন। এ দিনে মহান আল্লাহ মুসা (আ.) ও তার সঙ্গীদের ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্ত করেছিলেন এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীকে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। এর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মুসা (আ.) রোজা রাখতেন, তাই আমরাও আশুরার দিন রোজা (Fasting on the day of Ashura) রাখি।"

ইহুদিদের জবাব শুনে নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "মুসা (আ.)-এর কৃতজ্ঞতার অনুসরণে আমরা তোমাদের চেয়ে বেশি যত্নশীল হওয়ার অধিকারী।" অতঃপর তিনি নিজেও আশুরার রোজা রাখেন এবং মুসলমানদের তা পালন করতে নির্দেশ প্রদান করেন। (বুখারি: ৩৩৯৭; মুসলিম: ১১৩৯)।

ইহুদিদের সাথে অমিল রাখার নির্দেশ (Instruction to differ from the Jews)

সাহাবিরা যখন নবীজিকে বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল! বিধর্মীরাও তো এই দিনটিকে বড় মনে করে রোজা রাখে, তাহলে তো তাদের সাথে আমাদের মিল হয়ে যাচ্ছে।" তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, "তোমরা আশুরার দিনে রোজা রাখো, তবে এ ক্ষেত্রে ইহুদিদের সঙ্গে মিল না হওয়ার জন্য ১০ তারিখের আগের দিন অথবা পরের দিন আরও একটি রোজা রেখে নিও।" (মুসনাদে আহমদ: ২১৫৪)।

আশুরার রোজার পুরস্কার ও ফজিলত (Rewards and significance of Ashura fasting)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।" (সহিহ মুসলিম)। অন্য একটি হাদিসে এসেছে, নবীজি (সা.) বলেন, "আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আশুরার দিনের রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা (গুনাহ মাফ) হবে।" (সহিহ মুসলিম: ১১৬২)।

তাই কোনো মুসলমান যদি কোনো কারণে ৯ই মহররমের রোজা মিস করে ফেলেন, তবে তার উচিত হবে ১০ই মহররমের সাথে ১১ই মহররমের রোজাটি মিলিয়ে নেওয়া। মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে সুন্নাহ সম্মত উপায়ে এই বরকতময় আমলটি করার তাওফিক দান করুন।

আরও পড়ুন:

একনজরে আশুরার রোজা ও মহররমের গুরুত্বপূর্ণ বিধান (Ashura Fasting Rules & Significance at a Glance)

বিষয়ের ক্ষেত্র
(Subject Area)
শরিয়তের বিধান ও সঠিক নিয়ম
(Islamic Rule & Correct Method)
ফজিলত ও গুরুত্ব
(Virtue & Importance)
১টি রোজা রাখার বিধান
(Single Fasting Rule)
১০ই মহররম কেবল একটি রোজা রাখলে তা আদায় হয়ে যাবে, তবে বিধর্মীদের (ইহুদিদের) সাথে সাদৃশ্য এড়াতে শুধু একটি রোজা রাখা অনুত্তম বা মাকরূহ। গুনাহ হবে না, তবে সওয়াব কম হতে পারে
উত্তম সুন্নাহ পদ্ধতি
(Best Sunnah Method)
ইহুদিদের সংস্কৃতির সাথে অমিল রাখার জন্য ১০ই মহররমের আগের দিন (৯ই মহররম) অথবা পরের দিন (১১ই মহররম) মিলিয়ে মোট ২টি রোজা রাখা সুন্নত। ১ বছরের পিছনের ছোট গুনাহ মাফ হয়
রোজার সর্বোত্তম কম্বিনেশন
(Best Fasts Combination)
আশুরার রোজার সবচেয়ে উত্তম ধারাবাহিকতা হলো মহররমের ৯ ও ১০ তারিখ রোজা রাখা। কোনো কারণে ৯ তারিখ মিস হলে ১০ ও ১১ তারিখ রাখা উচিত। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেষ ইচ্ছার পূর্ণ অনুসরণ
ঐতিহাসিক তাৎপর্য
(Historical Significance)
এই ১০ই মহররমের পবিত্র দিনে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মুসা (আ.) ও বনী ইসরাইলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে অলৌকিকভাবে মুক্তি দিয়েছিলেন। আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন
মহররম মাসের মর্যাদা
(Status of Muharram)
হাদিস অনুযায়ী রমজানের ফরয রোজার পর আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও সর্বোত্তম নফল রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা। নফল রোজার মধ্যে সবচেয়ে সেরা সওয়াব

এসআর