দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেকেই মহররমকে শুধু আশুরার শোক বা কিছু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন। অথচ কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে এই মাস হলো ইবাদত, নফল রোজা, দান-সদকা এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুবর্ণ সময়। একজন সচেতন মুমিনের উচিত এই মাসের ফজিলত উপলব্ধি করে নিজের আমলনামা সমৃদ্ধ করা। নিচে মহররম মাসের বিশেষ ১০টি আমল বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:
আরও পড়ুন:
১. মহররম মাসের মর্যাদা উপলব্ধি করা (Understanding the Blessings of Muharram)
মহররম মাসের গুরুত্ব উপলব্ধি করা এবং এ মাসকে মনে-প্রাণে সম্মান করা একজন মুমিনের প্রথম করণীয়। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি; তার মধ্যে চারটি সম্মানিত (হারাম) মাস।’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ৩৬)। মহররম সেই চারটি হারাম মাসের অন্যতম হওয়ায় এ মাসে নেক আমল বৃদ্ধি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২. আন্তরিক তওবা ও আত্মসমালোচনা করা (True Repentance & Self-Accountability)
হিজরি বছরের সূচনা আত্মসমালোচনা ও নতুনভাবে জীবন গঠনের এক উত্তম সময়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা কর।’ (সুরা নুর, আয়াত: ৩১)। মহররম মাসে বিগত বছরের ভুল-ত্রুটি স্মরণ করে আল্লাহর দরবারে ইস্তিগফার ও কান্নাকাটি করা জরুরি (Astaghfar and Taubah in Islamic New Year)।
৩. অধিক পরিমাণে নফল রোজা রাখা (Virtues of Voluntary Fasting in Muharram)
রমজানের পর ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ রোজা হলো মহররম মাসের রোজা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১hex)। তাই এ মাসে যত বেশি সম্ভব নফল রোজা রাখা মুস্তাহাব।
আরও পড়ুন:
৪. আশুরার রোজা পালন করা (Ashura Fasting Rules and Schedule)
মহররমের ১০ তারিখ ‘আশুরা’ অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি দিন (Holy Day of Ashura)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আশুরার দিনের রোজা সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি যে, তিনি এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)। ইহুদিদের সংস্কৃতির বিরোধিতা করার জন্য রাসুল (সা.) ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম মিলিয়ে ২টি রোজা রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন।
৫. বেশি বেশি নফল ইবাদত ও জিকির করা (More Nafal Namaz & Dhikr)
মহররম মাসে নফল নামাজ, তাসবিহ, তাহলিল, তাকবির, তাহাজ্জুদ ও জিকির বৃদ্ধি করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫২)। প্রতিদিন জিকির-আজকারে সময় ব্যয় করলে অন্তর প্রশান্তি লাভ করে।
৬. দান-সদকা ও মানুষের উপকার করা (Charity and Sadaqah in Islam)
মহররম মাসে গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। দান-সদকা মানুষের আকস্মিক বিপদ দূর করে এবং আল্লাহর রহমত লাভের অন্যতম মাধ্যম।
৭. হারাম ও গুনাহের কাজ থেকে দূরে থাকা (Abstaining from Sins in Sacred Months)
সম্মানিত মাসগুলোতে গুনাহের ভয়াবহতা আরো তীব্র হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সুতরাং তোমরা এসব (সম্মানিত) মাসে নিজেদের প্রতি জুলুম কর না।’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ৩৬)।
৮. বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত ও আমল (Daily Quran Tilawat & Implementation)
নতুন হিজরি বছরের শুরুতে কোরআনের সাথে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার অঙ্গীকার করা উচিত। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় এই কোরআন এমন পথ প্রদর্শন করে যা সর্বাধিক সরল ও সঠিক।’ (সুরা ইসরা, আয়াত: ৯)।
আরও পড়ুন:
৯. আত্মীয়তার সম্পর্ক সুদৃঢ় করা (Maintaining Family Ties - Silatur Rahim)
পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার রিজিক বৃদ্ধি ও হায়াতের বরকত কামনা করে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৬)।
১০. ইসলামের ইতিহাস ও আশুরার শিক্ষা অধ্যয়ন (Learning Islamic History & Lessons of Karbala)
আশুরার দিনে আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও তার অনুসারীদের ফেরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউনকে ডুবিয়ে মেরেছিলেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩৯৭)। এছাড়া কারবালার ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে সত্যের পক্ষে দৃঢ়তা ও ত্যাগের শিক্ষা নেওয়া উচিত।
আরও পড়ুন:
একনজরে মহররম মাসের বিশেষ ১০টি আমল ও ফজিলত (Top 10 Deeds of Muharram Month at a Glance)
বিশেষ আহ্বান: হিজরি নববর্ষের প্রথম মাস মহররমকে কুসংস্কার বা গাফেলতিতে নষ্ট না করে তওবা ও নেক আমলের মাধ্যমে কাজে লাগাই। আল্লাহ আমাদের তাওফিক দিন। আমীন।
ক্র. নং
(SL)করণীয় বিশেষ আমল
(Recommended Islamic Deeds)আমলের মূল ফজিলত ও তাৎপর্য
(Significance & Virtues)
০১
মর্যাদা উপলব্ধি করা
পবিত্র কোরআনে বর্ণিত ৪টি সম্মানিত (হারাম) মাসের অন্যতম হিসেবে এই মাসকে মনে-প্রাণে সম্মান করা।
০২
আন্তরিক তওবা করা
হিজরি বছরের শুরুতে আত্মসমালোচনা করা এবং বিগত বছরের গুনাহের জন্য লজ্জিত হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করা।
০৩
অধিক নফল রোজা
হাদিস অনুযায়ী, রমজানের পর আল্লাহর মাস মহররমের রোজাই হলো ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ নফল রোজা।
০৪
আশুরার রোজা পালন
মহররমের ১০ তারিখের (সাথে ৯ বা ১১ তারিখ মিলিয়ে ২টি) রোজায় পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ হয়।
০৫
নফল ইবাদত ও জিকির
বেশি বেশি ইস্তিগফার, তাসবিহ, তাহাজ্জুদ ও দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা ও ঈমান মজবুত করা।
০৬
দান-সদকা করা
গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করা; দান-সদকা মানুষের আকস্মিক বিপদ দূর করে এবং আল্লাহর রহমত আনে।
০৭
গুনাহের কাজ থেকে দূরে থাকা
পবিত্র মাসগুলোতে অন্যায়, জুলুম, গীবত ও অবাধ্যতার মতো পাপ কাজের ভয়াবহতা ও শাস্তি আরো গুরুতর হয়।
০৮
কোরআন তিলাওয়াত ও আমল
প্রতিদিন অর্থসহ নিয়মিত পবিত্র কোরআন অধ্যয়ন করা এবং নিজের ব্যক্তিগত জীবনে তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা।
০৯
আত্মীয়তার সম্পর্ক সুদৃঢ় করা
আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া ও পারিবারিক বন্ধন বজায় রাখা, যা রিযিক বৃদ্ধি ও হায়াতের বরকত আনে।
১০
ইসলামের ইতিহাস ও শিক্ষা জানা
মুসা (আ.)-এর ফেরাউন থেকে মুক্তি লাভ এবং কারবালার ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে সত্য, ধৈর্য ও ত্যাগের শিক্ষা নেওয়া।
আরও পড়ুন:


