বিশেষ করে এই দিনে রোজা রাখার মাধ্যমে মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ এবং অতীতের গুনাহ খাতা মাফ করিয়ে নেওয়ার এক অপার সুযোগ রয়েছে। আসুন জেনে নিই আশুরার রোজার ফজিলত, এর ইতিহাস এবং রোজা রাখার সঠিক নিয়ম।
আশুরার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও মহানবী (সা.)-এর নির্দেশনা (Historical Significance of Ashura in Islam)
বিশ্বস্ত সাহাবি হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করলেন, তখন মদিনার ইহুদিদের আশুরার দিনে রোজা পালন করতে দেখলেন।
নবীজি (সা.) তাদের জিজ্ঞেস করলেন, "এ দিনে কী ঘটেছে যে তোমরা রোজা রাখো?" তারা উত্তর দিল, "এই দিনটি অত্যন্ত মহান। এই দিনে মহান আল্লাহ তাআলা হযরত মুসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্ত করেছিলেন এবং ফেরাউন ও তার বাহিনীকে লোহিত সাগরে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। এর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মুসা (আ.) রোজা রাখতেন, তাই আমরাও আশুরার রোজা পালন করে থাকি।"
ইহুদিদের এই জবাব শুনে দয়ার নবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, "মুসা (আ.)-এর কৃতজ্ঞতার অনুসরণে আমরা তোমাদের চেয়ে বেশি যত্নশীল হওয়ার অধিকারী।" (সহীহ বুখারি: ৩৩৯৭; মুসলিম: ১১৩৯)। অতঃপর তিনি নিজেও আশুরার রোজা রাখেন এবং উম্মতকেও তা পালন করতে নির্দেশ দেন।
আরও পড়ুন:
ইহুদিদের সাথে সাদৃশ্য বর্জন: আশুরার রোজা কয়টি ও কীভাবে রাখবেন? (How Many Roza for Ashura: Guidelines to Avoid Similarity with Jews)
ইসলাম অন্য কোনো ধর্মীয় রীতিনীতির হুবহু অন্ধ অনুকরণের সমর্থন করে না। সাহাবিরা যখন নবীজিকে বললেন যে, বিধর্মীরাও এই দিনটিকে মহান মনে করে রোজা রাখে, তখন নবীজি (সা.) মুসলিম উম্মাহর জন্য অনন্য বৈশিষ্ট্য নির্ধারণ করে দেন।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, "তারা যেহেতু এই দিন একটি রোজা পালন করে, আগামী বছর বেঁচে থাকলে আমরা ১০ তারিখের সঙ্গে ৯ তারিখ মিলিয়ে দুই দিন রোজা পালন করব, ইনশাআল্লাহ।" (সহীহ মুসলিম: ১১৩৪)।
মুসনাদে আহমদের (২১৫৪) আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, নবীজি বলেন, "তোমরা আশুরার দিনে রোজা রাখো, তবে এ ক্ষেত্রে ইহুদিদের সঙ্গে মিল না হওয়ার জন্য ১০ তারিখের আগের দিন অথবা পরের দিন আরও একটি রোজা রেখে নিও।"
ইসলামী শরিয়তের আলোকে প্রমাণিত হয় যে, আশুরার রোজা ২টি রাখতে হবে:
- পদ্ধতি ১: মহররমের ৯ এবং ১০ তারিখ (সর্বোত্তম নিয়ম)।
- পদ্ধতি ২: মহররমের ১০ এবং ১১ তারিখ।
আরও পড়ুন:
হাদিসের আলোতে আশুরার রোজার অনন্য ফজিলত ও গুরুত্ব (Virtues of Fasting on the Day of Ashura according to Hadith)
পবিত্র মহররম মাসের রোজা এবং বিশেষ করে আশুরার দিনের নফল রোজার মর্যাদা সম্পর্কে একাধিক সহীহ হাদিস বর্ণিত হয়েছে:
১. রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা: হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, "রমজান মাসের ফরয রোজার পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।" (সুনানে কুবরা: ৮৪২১০)।
২. এক বছরের গুনাহ মাফ: হজরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে আশুরার রোজার সওয়াব ও ফজিলত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, "আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, এই রোজা বান্দার বিগত এক বছরের গুনাহ মুছে দেয়।" (সহীহ মুসলিম: ১১৬২)।
৩. রাসুল (সা.)-এর বিশেষ আগ্রহ: হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আমার জানা মতে, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যান্য সাধারণ দিবসের রোজার তুলনায় আশুরার রোজার ফজিলত লাভের জন্য বেশি উদগ্রীব ও যত্নবান থাকতেন; যেমনটি তিনি রমজান মাসের রোজার ব্যাপারে থাকতেন। (সহীহ মুসলিম: ১১৩২)।
আরও পড়ুন:
আশুরার রোজার নিয়ত
আরবি: نَوَيْتُ أَنْ أَصُومَ غَدًا عَنْ سُنَّةِ عَاشُورَاءَ لِلّٰهِ تَعَالَىٰ
উচ্চারণ: নওয়াইতু আন আসুমা গাদান আন সুন্নাতি আশুরা লিল্লাহি তা’আলা।
বাংলায় নিয়ত (মনের ইচ্ছা): "আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আগামীকাল আশুরার সুন্নাত রোজা রাখার নিয়ত করলাম।
একনজরে পবিত্র আশুরার রোজার ফজিলত ও আমল (Virtues & Rules of Ashura Fasting at a Glance)
ইহুদিদের সাথে অমিল রাখতে **২টি রোজা** রাখতে হবে:
৯ ও ১০ মহররম
(অথবা)
১০ ও ১১ মহররম
বিশেষ নির্দেশনা: আশুরার দিন শুধুমাত্র ১০ তারিখে ১টি মাত্র রোজা রাখা মাকরূহে তানজিহী (উচিত নয়)। তাই সুন্নাতের অনুসরণে অবশ্যই ১০ তারিখের সাথে মিলিয়ে আগে বা পরে আরও একটি রোজা যুক্ত করুন।
বিষয় বা হাদিস
(Topic / Hadith Reference)ফজিলত ও তাৎপর্য
(Virtues & Significance)রোজার সঠিক নিয়ম
(Correct Method)
গুনাহ মাফের মাধ্যম
(সহীহ মুসলিম: ১১৬২)বিগত এক বছরের ছোট গুনাহ (সগিরা গুনাহ) ক্ষমা করা হয়।
সর্বোত্তম নফল রোজা
(সুনানে কুবরা: ৮৪২১)রমজান মাসের ফরয রোজার পর মহররম মাসের আশুরার রোজাই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ।
রাসুল (সা.)-এর আগ্রহ
(সহীহ মুসলিম: ১১৩২)অন্যান্য নফল রোজার তুলনায় নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই রোজা রাখার জন্য সবচেয়ে বেশি উদগ্রীব ও যত্নবান থাকতেন।
কৃতজ্ঞতার রোজা
(সহীহ বুখারি: ৩৩৯৭)এই পবিত্র দিনে মহান আল্লাহ হযরত মুসা (আ.) ও বনী ইসরাঈলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন, যার কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এই রোজা রাখা সুন্নাত।
আরও পড়ুন:


