আশুরার রোজার বিধান যেভাবে এলো: জেনে নিন সঠিক নিয়ম ও হাদিস

আশুরার রোজা কয়টি ও কি কি
আশুরার রোজা কয়টি ও কি কি | ছবি: এখন টিভি
0

ইসলামের ইতিহাসে নানা তাৎপর্যপূর্ণ, স্মরণীয় ও অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী পবিত্র আশুরা। আরবি ‘আশারা’ (Ashara) শব্দ থেকে ‘আশুরা’ শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে, যার শাব্দিক অর্থ হলো '১০'। হিজরি বা আরবি সনের প্রথম মাস মহররমের ১০ তারিখকে পবিত্র আশুরা বলা হয় (Holy Ashura 10th Muharram)। পৃথিবীর সৃষ্টিলগ্ন থেকে এই পবিত্র দিবসে বহু ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। তবে ইসলামে আশুরার রোজার বিধান কীভাবে এলো এবং এর গুরুত্ব কতটা, তা প্রত্যেক মুসলমানের জেনে রাখা জরুরি (History and Rules of Ashura Fasting in Islam)।

আশুরার রোজার ঐতিহাসিক পটভূমি ও বুখারি শরীফের হাদিস (History of Ashura Fasting Hadith)

ইসলামের ইতিহাসে আশুরার রোজার বিধান চালু হওয়ার চমৎকার একটি পটভূমি রয়েছে। সহীহ বুখারি শরীফে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মক্কা থেকে হিজরত করে মদিনায় পৌঁছালেন, তখন তিনি মদিনার ইহুদিদের আশুরার দিনে রোজা পালন করতে দেখলেন।

নবীজি (সা.) তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এই দিনে কী ঘটেছিল যে তোমরা রোজা পালন করছ?’ ইহুদিরা জবাবে বলল, ‘এই দিনটি আমাদের কাছে অনেক বড় এবং পবিত্র একটি দিন। এই দিনে মহান আল্লাহ তায়ালা হযরত মুসা (আ.) ও তার অনুসারী বনী ইসরাঈলদের অত্যাচারী ফেরাউনের হাত থেকে মুক্ত করেছিলেন এবং ফেরাউন ও তার বিশাল বাহিনীকে সাগরে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। আল্লাহর এই অসীম অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতাস্বরূপ হযরত মুসা (আ.) রোজা রাখতেন (Prophet Musa Fasting on Ashura), তাই তার অনুসরণে আমরাও আশুরার রোজা পালন করি।’

ইহুদিদের এই উত্তর শুনে বিশ্বনবী সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘হযরত মুসা (আ.)-এর কৃতজ্ঞতার অনুসরণে তোমাদের চেয়ে আমরা (মুসলমানেরা) বেশি যত্নশীল হওয়ার অধিকারী।’ অতঃপর আল্লাহর রাসূল নিজে আশুরার রোজা রাখলেন এবং সমস্ত মুসলমানদের তা পালন করার নির্দেশ দিলেন (Command to Fast on Ashura)। (সহীহ বুখারি: ৩৩৯৭)

আরও পড়ুন:

আশুরার রোজার অপরিসীম ফজিলত ও মর্যাদা (Virtues and Rewards of Ashura Fasting)

ইসলামে রমজানের ফরজ রোজার পর মহররম মাসের নফল রোজাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব ও মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। হাদিস শরিফে এর একাধিক ফজিলত বর্ণিত হয়েছে:

বিগত বছরের গুনাহ মাফ: হযরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আশুরার রোজার ফজিলত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘এই রোজা বান্দার বিগত এক বছরের গুনাহ মুছে দেয়।’ (সহীহ মুসলিম: ১১৬২)

রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা: হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত অন্য একটি হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রমজান মাসের ফরজ রোজার পর সর্বোত্তম রোজা হলো মহররম মাসের রোজা (Best Fasting After Ramadan is Muharram Fasting)।’ (সুনানে কুবরা: ৮৪২১)

নবীজির বিশেষ উদগ্রীবতা: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আমার জানা মতে, নবীজি (সা.) অন্যান্য সাধারণ দিবসের রোজার তুলনায় আশুরার রোজার ফজিলত ও সওয়াব লাভের জন্য বেশি উদগ্রীব ও যত্নবান থাকতেন; যেমনটি তিনি থাকতেন রমজান মাসের রোজার ব্যাপারে। (সহীহ মুসলিম: ১১৩২)

আরও পড়ুন:

আশুরার রোজা কয়টি ও রাখার সঠিক নিয়ম (How Many Fasting in Ashura and Correct Rules)

রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরতের পর মুসলমানদের আশুরার রোজা রাখার নির্দেশ দিলেও পরবর্তী সময়ে ইহুদিদের ধর্মীয় রীতিনীতির সাথে যেন মুসলমানদের ইবাদতের সাদৃশ্য বা মিল না হয়, সেজন্য একটি বিশেষ নির্দেশনা দেন।

নবীজি (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা আশুরার দিনে রোজা রাখো, তবে এ ক্ষেত্রে ইহুদিদের সঙ্গে মিল না হওয়ার জন্য ১০ তারিখের আগের দিন অথবা পরের দিন আরও একটি রোজা রেখে নিও।’ (মুসনাদে আহমদ: ২১৫৪)

বিশুদ্ধ হাদিসের এই আলোকোজ্জ্বল নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করে ইসলামিক স্কলার বা ওলামায়ে কেরামগণ একমত হয়েছেন যে, আশুরার রোজা দুটি রাখতে হবে (Must Observe Two Fasting for Ashura)। রোজা রাখার সঠিক নিয়মটি হলো:

  • ১. মহররমের ৯ এবং ১০ তারিখ রোজা রাখা (এটি সর্বোত্তম)।
  • ২. অথবা, মহররমের ১০ এবং ১১ তারিখ রোজা রাখা।

অর্থাৎ, শুধুমাত্র মহররমের ১০ তারিখে একটি রোজা রাখা মাকরূহে তানজিহী বা অনুত্তম। ইহুদিদের সংস্কৃতির সাথে বৈসাদৃশ্য বজায় রাখতে অবশ্যই ১০ তারিখের আগে বা পরে মিলিয়ে জোড়া রোজা রাখতে হবে।

আরও পড়ুন:

একনজরে আশুরার রোজার ইতিহাস, ফজিলত ও রোজা রাখার সঠিক নিয়মাবলী

বিষয় (Topic) হাদিস ভিত্তিক বিস্তারিত তথ্য (Hadith Details) হাদিস ও রেফারেন্স (Reference)
আশুরার অর্থ ও তারিখ
(Meaning & Date)
'আশুরা' শব্দটি আরবি 'আশারা' থেকে এসেছে, যার অর্থ ১০। হিজরি বা আরবি সনের প্রথম মাস মহররমের ১০ তারিখকে পবিত্র আশুরা বলা হয়। ১০ই মহররম
বিধানের ঐতিহাসিক পটভূমি
(Historical Background)
এই দিনে মহান আল্লাহ ফেরাউনের হাত থেকে মুসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীদের মুক্ত করেন এবং ফেরাউনকে ডুবিয়ে মারেন। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মুসা (আ.) রোজা রাখতেন। মদিনার ইহুদিদের দেখে নবীজি (সা.) নিজেও রোজা রাখেন ও মুসলমানদের নির্দেশ দেন। সহীহ বুখারি:
হাদিস নং ৩৩৯৭
রোজার সেরা মর্যাদা
(Best Nafl Fasting)
রমজান মাসের ফরজ রোজার পর নফল বা অন্যান্য রোজার মধ্যে আল্লাহর কাছে মহররম মাসের আশুরার রোজা হচ্ছে সর্বোত্তম। সুনানে কুবরা:
হাদিস নং ৮৪২১
ক্ষমা ও বিশেষ ফজিলত
(Virtue & Reward)
রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আশুরার রোজার সওয়াব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, এই রোজা বান্দার বিগত এক বছরের গুনাহ মুছে দেয়। সহীহ মুসলিম:
হাদিস নং ১১৬২
রোজা রাখার সঠিক নিয়ম
(Correct Fasting Rules)
ইহুদিদের সংস্কৃতির সাথে যেন মুসলমানদের ইবাদতের মিল না হয়, সেজন্য আশুরার রোজা জোড়া বা ২টি রাখতে হবে। মহররমের ৯ ও ১০ তারিখ (সর্বোত্তম) অথবা ১০ ও ১১ তারিখ রোজা রাখতে হবে। মুসনাদে আহমদ:
হাদিস নং ২১৫৪
গুরুত্বপূর্ণ আমল: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এর বর্ণনা অনুযায়ী, নবীজি (সা.) সাধারণ অন্যান্য নফল দিবসের তুলনায় এই আশুরার রোজার ফজিলত পাওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি উদগ্রীব থাকতেন (সহীহ মুসলিম: ১১৩২)। তাই মহররমের চাঁদ দেখার ওপর ভিত্তি করে ৯ ও ১০ই মহররম অথবা ১০ ও ১১ই মহররম নিয়ত করে এই রোজা রাখা সুন্নাত।

এসআর