যে কারণে মিসওয়াক করতে বলেছেন মহানবী (সা.), জানুন ইসলামিক ও বৈজ্ঞানিক উপকারিতা

মহানবী সা এর মিসওয়াক করার নির্দেশ
মহানবী সা এর মিসওয়াক করার নির্দেশ | ছবি: এখন টিভি
0

সম্প্রতি দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতেই (৭৬.৫%) বিষাক্ত মাইক্রোপ্লাস্টিকের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে ‘এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন’ (এসডো / ESDO)। প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত প্লাস্টিক কণা মিলছে, যা ত্বকের প্রদাহ, পেটের সমস্যা এবং ক্যানসারের মতো মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। এমন প্রেক্ষাপটে সর্বাধুনিক বিজ্ঞানের ক্ষতিকর দিক থেকে বাঁচতে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রায় ১৫ শতক আগের এক মহান সুন্নাহ ‘মিসওয়াক’ আজ বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে (Why Prophet Muhammad Said to Use Miswak: Microplastic Risks and Miswak Rules)।

নিত্যদিনের টুথপেস্টের বিকল্প হিসেবে কেন মিসওয়াক সেরা, হাদিসের আলোকে এর গুরুত্ব, ফজিলত এবং সঠিক নিয়মে মিসওয়াক করার পদ্ধতি সম্পর্কে (Miswak benefits in Islam, Prophet Muhammad sunnah miswak rules, miswak vs toothpaste microplastics, how to use miswak properly) নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

টুথপেস্টের প্লাস্টিক কণা ও সুন্নাহর প্রাসঙ্গিকতা (Microplastics in Toothpaste vs Miswak Sunnah)

গবেষণায় দেখা গেছে, আধুনিক বাণিজ্যিক টুথপেস্টে ব্যবহৃত প্লাস্টিক কণা মানুষের অজান্তেই পাকস্থলীতে প্রবেশ করে নানা জটিল ব্যাধি সৃষ্টি করছে। অথচ প্রিয় নবী (সা.) অজু, নামাজ ও দৈনিক দিনচর্যায় মিসওয়াকের যে অভ্যাস শিখিয়েছেন, তা সম্পূর্ণ কেমিক্যালমুক্ত ও শতভাগ নিরাপদ। মহানবী (সা.) বলেছেন, “মিসওয়াক হলো মুখ পরিষ্কার করার উপকরণ এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উপায়।” (মিশকাতুল মাসাবিহ, হাদিস: ৩৫০)।

আরও পড়ুন:

ইসলামে মিসওয়াকের গুরুত্ব ও ৪০টি হাদিস (Importance and Hadith Proof of Miswak)

ইসলামে মিসওয়াককে পরিচ্ছন্নতা ও স্বভাবজাত সুনানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, মানবজাতির ১০টি স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যের অন্যতম হলো মিসওয়াক করা।

রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে মিসওয়াক সম্পর্কে প্রায় ৪০টি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। মুসনাদে আহমাদে (হাদিস: ২২২৬৯) এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “যখনই জিবরাইল (আ.) আমার কাছে আসতেন, তখনই আমাকে মিসওয়াকের নির্দেশ দিতেন।” এমনকি তিনি উম্মতের কষ্টের কথা বিবেচনা না করলে প্রতি নামাজের আগেই মিসওয়াক ফরজ বা বাধ্যতামূলক করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৮৮৭)।

মিসওয়াক করার ইহ ও পরকালীন ৭০টি উপকারিতা (Benefits and Virtues of Miswak)

আল্লামা ইবনে আবেদিন (রহ.) তার বিখ্যাত ‘ফাতাওয়ে শামি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, মিসওয়াকের ৭০টিরও বেশি উপকারিতা রয়েছে:

  • সর্বনিম্ন উপকার (Physical Benefit): মুখের দুর্গন্ধ দূর হওয়া এবং দাঁত শক্তিশালী থাকা।
  • সর্বোচ্চ উপকার (Spiritual Benefit): মৃত্যুর সময়ে কালিমা নসিব হওয়া এবং আল্লাহর রেজামন্দি লাভ।

আরও পড়ুন:

মিসওয়াক করার সেরা ৯টি সময় (9 Best Times for Using Miswak)

রাসুলুল্লাহ (সা.) দিন-রাতের যেকোনো সময়েই মিসওয়াক করতেন (উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. এর বর্ণনা অনুযায়ী)। তবে ৯টি বিশেষ মুহূর্তে মিসওয়াক করা সুন্নাত ও মুস্তাহাব:

  • ১. প্রতিবার নামাজের সময়।
  • ২. কোরআন তেলাওয়াতের আগে।
  • ৩. অজুর শুরুতে।
  • ৪. ঘুম থেকে উঠার পর।
  • ৫. মুখে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হলে।
  • ৬. রাতে ঘুমানোর আগে।
  • ৭. দীর্ঘ সময় কথা বলার পর।
  • ৮. পানাহারের পূর্বে ও পরে।
  • ৯. দুর্গন্ধযুক্ত খাবার গ্রহণের পর।

মিসওয়াকের গাছ ও সঠিক ধরন (Best Miswak Trees and Material)

তিক্ত, কাঁচা ও নরম গাছের ডাল দিয়ে মিসওয়াক করা সবচেয়ে উত্তম। আমাদের প্রিয় নবী (সা.) বিশেষ করে জয়তুন (Olive tree branch) এবং খেজুরগাছের ডাল দিয়ে মিসওয়াক করতেন। এছাড়া নিমের ডালও অত্যন্ত কার্যকরী।

আরও পড়ুন:

সুনানি তরিকায় মিসওয়াক করার সঠিক নিয়ম (Sunnah Method of Holding and Using Miswak)

ভুল নিয়মে মিসওয়াক করলে দাঁত বা মাড়ির ক্ষতি হতে পারে। সঠিক পদ্ধতি নিচে দেওয়া হলো:

  • আকার ও পরিমাপ (Size): মিসওয়াক হাতের আঙুলের মতো মোটা এবং এক বিঘত পরিমাণ লম্বা হওয়া উচিত।
  • ধরা ও আঙুলের পজিশন (Holding Technique): ডান হাত দিয়ে মিসওয়াক ধরতে হবে। ডান হাতের কনিষ্ঠাঙ্গুলি (ছোট আঙুল) থাকবে মিসওয়াকের নিচে, মধ্যমা ও তর্জনী ওপরের দিকে এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি নিচে থাকবে।
  • মাজার সঠিক দিক (Cleaning Movement): মুখের ডান দিক থেকে শুরু করতে হবে। ওপর থেকে নিচে মিসওয়াক করতে হবে, কখনোই ডান-বামে আড়াআড়িভাবে ঘষা উচিত নয়। দাঁতের ভেতরের ও বাইরের অংশ এবং জিহ্বার গোড়া পর্যন্ত আলতোভাবে পরিষ্কার করতে হবে।

মহানবী (সা.) কেন মিসওয়াক করতে বলেছেন? জেনে নিন দাঁতের সুরক্ষায় এর অবিশ্বাস্য গুরুত্ব

একনজরে: ইসলামিক নির্দেশাবলি, হাদিসের আলোকেও ফজিলত, মিসওয়াক ব্যবহারের সঠিক নিয়ম এবং স্বাস্থ্যগত অবিশ্বাস্য সুরক্ষার বিবরণ

বিষয় / দিক গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ ও নির্দেশনা ফজিলত ও মূল সুবিধা

ইসলামিক বিধান ও হাদিস

• নবী-রাসুলদের গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত এবং অজু ও নামাজের সময় করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ।

"মিসওয়াক মুখের পবিত্রতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টির মাধ্যম।" (ইবনে মাজাহ: ২৮৯)

আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ঈমানি শক্তিবৃদ্ধি

স্বাস্থ্যগত ও প্লাস্টিক-মুক্ত সুরক্ষা

বাণিজ্যিক টুথপেস্টের ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিক থেকে শতভাগ নিরাপদ। প্রাকৃতিক কষ ও ডাল মুখের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া দূর করে এবং মাড়ি শক্ত করে।

ক্যানসার ও কেমিক্যাল ঝুঁকি হ্রাস

মিসওয়াক করার উত্তম সময়

১. অজুর শুরুতে ও নামাজের সময়।

২. ঘুম থেকে ওঠার পর ও ঘুমানোর আগে।

৩. কোরআন তেলাওয়াত, দীর্ঘ কথোপকথন ও দুর্গন্ধযুক্ত খাবার পানের পর।

দৈনিক ৯টি বিশেষ মুহূর্তে সুন্নাত

উত্তম মিসওয়াক নির্বাচন

জয়তুন, খেজুর গাছ ও নিমের কাঁচা, তিক্ত এবং নরম ডাল ব্যবহার করা সবচেয়ে উত্তম।

প্রাকৃতিক অ্যান্টিসেপটিক গুণাবলি

সঠিক প্রয়োগ ও ধরার নিয়ম

পরিমাপ: হাতের আঙুলের মতো মোটা ও এক বিঘত লম্বা।

ধরা: ডান হাতের ছোট আঙুল নিচে, মধ্যমা ও তর্জনী ওপরে এবং বৃদ্ধাঙ্গুলি নিচে রাখা।

দিক: ডান দিক থেকে শুরু করে ওপর-নিচে করা (আড়াআড়ি নয়)।

দাঁত ও মাড়ির সর্বোচ্চ সুরক্ষা

সারসংক্ষেপ: কেমিক্যালযুক্ত টুথপেস্টের বিকল্প হিসেবে মিসওয়াক কেবল সুন্নাত পালনই নয়, বরং এটি শারীরিক সুস্থতা, মুখের জীবাণুমুক্তকরণ এবং পরকালীন মুক্তির অন্যতম মাধ্যম।

আরও পড়ুন:

মিসওয়াক করার ফজিলত ও নিয়ম (miswak benefits and rules in islam), মহানবী সা এর মিসওয়াক করার হাদিস (hadith on miswak importance), জয়তুন ও নিমের মিসওয়াক (olive and neem miswak benefits), অজুর সময় মিসওয়াক করার সুন্নাত (sunnah of using miswak in wudu), মিসওয়াক বনাম টুথপেস্ট ক্ষতিকর দিক (miswak vs toothpaste microplastic side effects)

এসআর