চরম অর্থনৈতিক সংকটে মুদ্রার দরপতন ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে ইরানের বিক্ষোভ উত্তেজনা গড়িয়েছে সপ্তম দিনে। পুলিশি বাধায় সহিংস রূপ নেয়ায় প্রাণহানি বেড়েই চলেছে। আন্দোলনকারীদের দমনে চলছে ধরপাকড়ও। এ অবস্থায় বিক্ষোভকারীদের হত্যার অভিযোগ এনে ইরান সরকারের বিরুদ্ধে শুক্রবার সরাসরি হস্তক্ষেপের হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের কড়া হুঁশিয়ারির পর বিক্ষোভের উত্তাপ আরও কয়েকগুণ বেড়েছে বলে খবর প্রকাশ করেছে ইরানের গণমাধ্যম ইরান ইন্টারন্যাশনাল। ইতোমধ্যে দেশটির ১০০টিরও বেশি স্থানে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় ট্রাম্পের বেআইনি হুমকির নিন্দা জানাতে শুক্রবার জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ইরান। এমনকি বিক্ষোভের জেড়ে যেকোনো ধরনের নাশকতামূলক ব্যবস্থার জবাব হিসেবে ইসরাইল এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটিতে হামলা চালানো হবে বলে হুঁশিয়ারও করেছে তেহরান।
জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে চলমান বিক্ষোভ ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নাকগলানোক ভালো চোখে দেখছেন না ইরানের ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনতা। তাদের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে অন্যদেশের হস্তক্ষেপ মেনে নেবেন না বলেও জানিয়েছেন তারা।
ইরানের ব্যবসায়ীদের মধ্যে একজন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ কিছুতেই গ্রহণযোগ্য হবে না। আমরা ট্রাম্পকে ভয় পাই না। আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই। আমরা তাদের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে যাই না। তিনি বিশ্বের অন্য প্রান্ত থেকে আমাদের উপর শর্ত চাপিয়ে দিতে চান। আমরা এটা মেনে নেবো না।’
আরও পড়ুন:
ইরানের স্থানীয় একজন বলেন, ‘অহিংস বিক্ষোভ গ্রহণযোগ্য। তবে বিক্ষোভের নামে গাড়ির জানালা ভাঙা, দোকানে আগুন লাগানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমাদের শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করা উচিত। যাতে সরকার সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশকে সংকট থেকে উত্তরণের সুযোগ পায়।’
অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে ইরানের সরকারের ব্যর্থতাও দায়ী বলে অকপটে স্বীকার করেছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। সমস্যার সমাধানের আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।
মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেন, ‘মানুষ অসন্তুষ্ট; আমরাই দোষী। অর্থনৈতিক সংকটের জন্য আমেরিকা বা অন্য কাউকে দোষী করা ঠিক হবে না। আমাদেরই জনগণকে সেবা দিয়ে সন্তুষ্ট রাখতে হবে। দেশের সম্পদ সঠিকভাবে ব্যবহার করতে হবে। সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজে বের করতে হবে।’
তবে ইরানে কয়েক দশক ধরে চলমান অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের নিষেধাজ্ঞাকে বড় কারণ হিসেবে দেখেছেন বিশ্লেষকরা। এমনকি ২০২৫ সালে ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলাকেও অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে ইরান একই সঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং বহির্বিশ্বসহ ত্রিমুখী চাপ বা হুমকির মুখোমুখি বলেও মনে করা হচ্ছে।
চাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচি পরিচালক ড. সানাম ভাকিল বলেন, ‘ইরান কয়েক দশক ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সর্বোচ্চ নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপের ফলে সাধারণ ইরানিরা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছে। এটাও মনে রাখা উচিত যে ২০২৫ সালে ইসরাইল এবং যুক্তরাষ্ট্র ইরানে সামরিক হামলা চালিয়েছিলো। যা অবশ্যই দেশটির অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, পানি ও বিদ্যুৎ সংকটকে তীব্র করে তুলেছে। ফলে জনগোষ্ঠীর উপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করছে।’
ইরানে মুদ্রাস্ফীতির হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪২ শতাংশে। এতে জীবন-যাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ফুঁসে উঠেছেন ইরানের ব্যবসায়ী সমাজ ও সাধারণ জনগণ।





