কেন এটি বেশি বিপজ্জনক? (Why is it more dangerous?)
সারাদিন রোজা রাখার ফলে শরীরে রক্তে শর্করার মাত্রা (Blood sugar level) কমে যায় এবং পানিশূন্যতা (Dehydration) দেখা দেয়। এ সময় শরীরের কোষগুলো পুষ্টি ও অক্সিজেনের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। ঠিক এই মুহূর্তে ইফতারের সঙ্গে সঙ্গে ধূমপান করলে শরীর পুষ্টির বদলে বিষাক্ত ধোঁয়ার কবলে পড়ে। এর ফলে রক্তে অক্সিজেনের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় এবং নানা শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়।
আরও পড়ুন:
হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের আশঙ্কা (Risk of Heart Attack and Stroke)
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইফতারের পরপরই ধূমপান করলে রক্তনালী দ্রুত সংকুচিত হয়ে পড়ে (Vaso-constriction), যা রক্ত চলাচলে বাধা দেয়। এর ফলে রক্তচাপ (Blood Pressure) হঠাৎ বেড়ে গিয়ে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ঝুঁকি (Risk of stroke) কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়। নিকোটিন তাৎক্ষণিকভাবে হৃৎস্পন্দন বাড়িয়ে দেয়, যা দুর্বল হার্টের রোগীদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে।
অক্সিজেন সরবরাহ ও পাকস্থলীর ক্ষতি (Oxygen Supply and Stomach Damage)
ধূমপানের ফলে নির্গত কার্বন মনোক্সাইড রক্তে মিশে অক্সিজেন পরিবহন ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। এতে শরীর প্রচণ্ড দুর্বল হয়ে পড়ে। এছাড়া খালি পেটে ধূমপান (Smoking on an empty stomach) করলে পাকস্থলীতে অ্যাসিড নিঃসরণ বেড়ে যায়, যার ফলে গ্যাস্ট্রিক, অম্বল বা মারাত্মক হজমের সমস্যা (Digestive problems) দেখা দেয়।
মস্তিষ্কে বিরূপ প্রতিক্রিয়া (Adverse Brain Reaction)
সারাদিন পর হঠাৎ নিকোটিন শরীরে প্রবেশ করলে মাথা ঘোরা (Dizziness), বমিভাব বা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এটি সাময়িক অচেতনতার (Fainting) কারণও হতে পারে।
আরও পড়ুন:
একনজরে ইফতার পরবর্তী ধূমপানের ঝুঁকি
ঝুঁকির ক্ষেত্র (Area of Risk) প্রভাব (Impact) হৃদরোগ (Heart Disease) রক্তচাপ বৃদ্ধি পেয়ে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা তৈরি হয়। মস্তিষ্ক (Brain) রক্ত প্রবাহ কমে যাওয়ায় স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। পাকস্থলী (Stomach) গ্যাস্ট্রিক, আলসার ও হজমে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে। রক্ত সঞ্চালন (Blood Flow) কার্বন মনোক্সাইডের কারণে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়।
ইফতার ও ধূমপান সংক্রান্ত জরুরি প্রশ্নোত্তর-FAQ
১. ইফতারের পরপরই ধূমপান করা কেন হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়ায়?
উত্তর: দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার পর শরীরে নিকোটিন প্রবেশ করলে রক্তনালী হঠাৎ সংকুচিত হয়ে যায়। এতে রক্তচাপ দ্রুত বেড়ে গিয়ে হার্টে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে, যা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
২. ইফতারের পর সিগারেট খেলে কেন মাথা ঘোরে বা অন্ধকার দেখি?
উত্তর: সারাদিন রোজা রাখার পর রক্তে অক্সিজেনের পরিমাণ কম থাকে। এই অবস্থায় ধূমপান করলে কার্বন মনোক্সাইড রক্তে মিশে অক্সিজেন সরবরাহ আরও কমিয়ে দেয়, ফলে মস্তিষ্কে অক্সিজেনের অভাবে মাথা ঘোরে বা বমি ভাব হয়।
৩. খালি পেটে ধূমপান কি স্ট্রোকের কারণ হতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ। হঠাৎ নিকোটিনের প্রভাবে রক্তচাপ অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে মস্তিষ্কের সূক্ষ্ম রক্তনালী ছিঁড়ে যেতে পারে বা রক্ত জমাট বাঁধতে পারে, যা থেকে ব্রেন স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৪. ইফতারের পর ধূমপান করলে কেন বুক ধড়ফড় করে?
উত্তর: নিকোটিন শরীরে প্রবেশের সাথে সাথে হৃৎস্পন্দন (Heart rate) বাড়িয়ে দেয়। দীর্ঘ বিরতির পর এই আকস্মিক পরিবর্তন শরীর সহ্য করতে পারে না বলেই বুক ধড়ফড়ানি শুরু হয়।
৫. ইফতারের পর সিগারেট খেলে কি গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বাড়ে?
উত্তর: অবশ্যই। খালি পেটে নিকোটিন ও টার পাকস্থলীর আস্তরণকে উত্তেজিত করে প্রচুর পরিমাণে অ্যাসিড নিঃসরণ করে, যা থেকে মারাত্মক গ্যাস, অম্বল বা আলসার হতে পারে।
৬. স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ইফতারের পর ধূমপান কতটুকু ক্ষতিকর?
উত্তর: বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইফতারের পর ধূমপান স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে ১০ গুণ বেশি ক্ষতিকর। কারণ এ সময় শরীরের কোষগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল থাকে এবং দ্রুত বিষাক্ত ধোঁয়া শোষণ করে।
৭. ধূমপান কি ইফতারের পুষ্টিগুণ নষ্ট করে দেয়?
উত্তর: ইফতারের পর শরীর যখন খাবার থেকে ভিটামিন ও মিনারেল শোষণ করতে চায়, তখন ধূমপানের বিষাক্ত উপাদানগুলো সেই শোষণ প্রক্রিয়ায় বাধা দেয় এবং শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে দুর্বল করে দেয়।
৮. ইফতারের পর ধূমপান করলে কি পানিশূন্যতা বাড়ে?
উত্তর: ধূমপান সরাসরি পানিশূন্যতা না বাড়ালেও এটি মুখ ও গলা শুকিয়ে দেয় এবং শরীরকে ক্লান্ত করে তোলে, যা রোজার ক্লান্তি দূর করার বদলে আরও বাড়িয়ে দেয়।
৯. কেন অনেক ধূমপায়ী ইফতারের পর জ্ঞান হারান?
উত্তর: নিকোটিনের আকস্মিক ধাক্কায় রক্তচাপের দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। অনেক সময় মস্তিষ্কে রক্ত সঞ্চালন সাময়িকভাবে কমে যাওয়ায় ধূমপায়ী ব্যক্তি হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারেন।
১০. ইফতারের কতক্ষণ পর ধূমপান করা ‘কম’ ঝুঁকিপূর্ণ?
উত্তর: চিকিৎসকদের মতে, কোনো সময়ই ধূমপান নিরাপদ নয়। তবে ইফতারের পরপরই এটি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। শরীর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে অন্তত ২-৩ ঘণ্টা সময় নেওয়া উচিত, যদিও শ্রেষ্ঠ সমাধান হলো এটি পুরোপুরি বর্জন করা।
১১. ধূমপান কি ফুসফুসের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে?
উত্তর: হ্যাঁ, দীর্ঘ বিরতির পর ফুসফুসের অ্যালভিওলাইগুলো পরিষ্কার হতে শুরু করে, ঠিক তখনই ধোঁয়া প্রবেশ করালে ফুসফুসের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে এবং শ্বাসকষ্ট হতে পারে।
১২. ইফতারের পর ধূমপানের ফলে কি উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ, নিকোটিন সাময়িকভাবে রক্তচাপকে তুঙ্গে নিয়ে যায়। যাদের আগে থেকেই হাই ব্লাড প্রেশার আছে, তাদের জন্য এটি জানমালের জন্য হুমকি হতে পারে।
১৩. ধূমপান কি রমজানের ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে?
উত্তর: এটি একটি ভুল ধারণা। নিকোটিন সাময়িক উদ্দীপনা দিলেও প্রকৃতপক্ষে এটি শরীরকে আরও অবসাদগ্রস্ত এবং স্নায়ুগুলোকে দুর্বল করে দেয়।
১৪. ইফতার পরবর্তী ধূমপান কি ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায়?
উত্তর: হ্যাঁ, ইফতারের পর অতিরিক্ত নিকোটিন গ্রহণ করলে রাতে ঘুমের সমস্যা বা ইনসোমনিয়া দেখা দিতে পারে, যা সেহরি ও পরবর্তী দিনের রোজাকে কষ্টকর করে তোলে।
১৫. রমজান মাস কি ধূমপান ছাড়ার জন্য আদর্শ সময়?
উত্তর: অবশ্যই। যেহেতু একজন রোজাদার দিনের ১৫-১৬ ঘণ্টা ধূমপান ছাড়াই থাকছেন, তাই এই আত্মসংযমকে কাজে লাগিয়ে বাকি সময়টুকুও ধূমপানমুক্ত থেকে স্থায়ীভাবে এই অভ্যাস ত্যাগ করা সবচেয়ে সহজ।





