Recent event

দিনে কত বার মোবাইলে চোখ রাখেন? যতবার তাকালে পড়তে পারেন বিপদে

মোবাইল আসক্তির কুফল
মোবাইল আসক্তির কুফল | ছবি: এখন টিভি
0

বর্তমান যুগে স্মার্টফোন আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে অতিরিক্ত স্মার্টফোন আসক্তি (Smartphone Addiction) এখন উদ্বেগের বড় কারণ। অনেকেই মনে করেন একটানা দীর্ঘক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকলেই কেবল চোখের ক্ষতি হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, বারবার ফোন চেক করার অভ্যাসটি (Habit of checking phone) চোখের চেয়েও আমাদের মস্তিষ্কের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

প্রভাবের ধরণ (Type of Impact) বিবরণ (Details)
মস্তিষ্কের ক্ষতি বারবার ফোন চেক করায় নিউরোট্রান্সমিটারের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
মনোযোগের অভাব কাজের মাঝখানে ফোন দেখলে ফোকাস নষ্ট হয় ও উৎপাদনশীলতা কমে।
স্মৃতিশক্তি হ্রাস দীর্ঘমেয়াদে কোনো তথ্য মনে রাখার ক্ষমতা কমে যায়।
মানসিক জটিলতা অতিরিক্ত ডোপামিন নিঃসরণে উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও অবসাদ বাড়ে।

আরও পড়ুন:

ভয়ঙ্কর আসক্তি ও মস্তিষ্কের পরিবর্তন (Brain Changes due to Addiction)

সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকে রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত আমরা অসংখ্যবার ফোনে চোখ রাখি। অফিসের কাজের ফাঁকে, খাবার টেবিলে কিংবা যাতায়াতের পথে বারবার ফোনের স্ক্রিনে তাকানোর ফলে মস্তিষ্কে এক নেতিবাচক পরিবর্তন (Negative neurological changes) ঘটে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বারবার ফোন চেক করেন, তাদের মস্তিষ্কের গঠন ও কার্যকারিতা অন্যদের তুলনায় আলাদা হয়ে যায়।

মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তির বিনাশ (Loss of Focus and Memory)

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা (Harvard University Research) অনুযায়ী, বারবার ফোনের দিকে তাকালে মানুষের মনোযোগ (Attention span) মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়। যখনই আপনি কোনো কাজ চলাকালীন ফোন হাতে নেন, তখনই মস্তিষ্কের ওই কাজের সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে:

  • কাজে ভুল হওয়ার প্রবণতা বাড়ে।
  • দীর্ঘমেয়াদে স্মৃতিশক্তি (Long-term memory) কমে যায়।
  • কাজের গতি বা উৎপাদনশীলতা হ্রাস পায়।

ডোপামিন ও আসক্তির দুষ্টচক্র (Dopamine and Addiction Cycle)

কেন আমরা বারবার ফোন দেখতে বাধ্য হই? এর পেছনে রয়েছে ডোপামিন (Dopamine) নামক একটি হরমোন। প্রতিবার ফোনের নোটিফিকেশন (Phone Notification) বা সোশ্যাল মিডিয়া রিল দেখার সময় মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসৃত হয়, যা সাময়িক আনন্দ দেয়। এই আনন্দ পেতে মস্তিষ্ক বারবার ফোন দেখতে প্ররোচিত করে, যাকে বিশেষজ্ঞরা ডিজিটাল ড্রাগ (Digital Drug) হিসেবে অভিহিত করেছেন। এর ফলে মানসিক চাপ (Mental Stress) এবং উদ্বেগ (Anxiety) বহুগুণ বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চোখ ও মস্তিষ্ককে সুরক্ষিত রাখতে একটানা ফোন দেখার পাশাপাশি বারবার ফোন চেক করার এই নেশা কাটিয়ে ওঠা এখন সময়ের দাবি। ডিজিটাল ডিটক্স (Digital Detox) বা নির্দিষ্ট সময়ে ফোন ব্যবহারের অভ্যাস গড়ে তোলার মাধ্যমে এই ঝুঁকি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

আরও পড়ুন:

মোবাইল আসক্তির শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ

প্রভাবের ক্ষেত্র (Area of Impact) ক্ষতিকর প্রভাব (Negative Impacts)
মস্তিষ্ক (Brain) ডোপামিনের ভারসাম্যহীনতা ও মনোযোগ হ্রাস
চোখ (Eyes) ড্রাই আই সিন্ড্রোম ও দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া
মানসিক স্বাস্থ্য (Mental Health) উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা এবং অনিদ্রা (Insomnia)
স্মৃতিশক্তি (Memory) তথ্য মনে রাখার ক্ষমতা হ্রাস পাওয়া

আরও পড়ুন:

মোবাইল আসক্তি ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সংক্রন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর-FAQ

১. দিনে কতবার ফোন চেক করা স্বাভাবিক?

উত্তর: গবেষণায় দেখা গেছে, একজন সাধারণ মানুষ দিনে গড়ে ৮০ থেকে ১০০ বার ফোন চেক করেন। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, অপ্রয়োজনে বারবার ফোন চেক করা আসক্তির লক্ষণ।

২. বারবার ফোন দেখলে মস্তিষ্কের কী ক্ষতি হয়?

উত্তর: বারবার ফোন দেখলে মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটারগুলো বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, যা মনোযোগ (Attention Span) কমিয়ে দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদে স্মৃতিশক্তি হ্রাস করে।

৩. মোবাইল আসক্তি কীভাবে মানসিক চাপ বাড়ায়?

উত্তর: ফোনের নোটিফিকেশন বা সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করার সময় মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ নিঃসরণ হয়। এই চক্রে পড়ে মানুষ যখন বারবার ফোন দেখে, তখন শরীরে কর্টিসল বা স্ট্রেস হরমোন বেড়ে গিয়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি করে।

৪. স্মার্টফোনের নীল আলো (Blue Light) চোখের কী ক্ষতি করে?

উত্তর: নীল আলো চোখের রেটিনার ক্ষতি করে এবং ‘ডিজিটাল আই স্ট্রেন’ বা চোখ জ্বালাপোড়া ও ঝাপসা দেখার সমস্যা তৈরি করে।

৫. রাতে ফোন ব্যবহার করলে কেন ঘুম আসে না?

উত্তর: নীল আলো শরীর থেকে ‘মেলাটোনিন’ নামক ঘুমের হরমোন নিঃসরণে বাধা দেয়, ফলে সহজে ঘুম আসতে চায় না এবং অনিদ্রা (Insomnia) দেখা দেয়।

৬. স্মার্টফোন আসক্তি কি স্মৃতিশক্তি কমিয়ে দেয়?

উত্তর: হ্যাঁ, অতিরিক্ত তথ্যের ভিড়ে মস্তিষ্ক প্রয়োজনীয় তথ্য ধরে রাখার ক্ষমতা হারায়, যাকে বিজ্ঞানীরা ‘ডিজিটাল অ্যামনেশিয়া’ বা ডিজিটাল স্মৃতিভ্রংশ বলছেন।

৭. শিশুদের জন্য দিনে কতক্ষণ মোবাইল দেখা নিরাপদ?

উত্তর: ২ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য কোনো স্ক্রিন টাইম অনুমোদিত নয়। ২ থেকে ৫ বছরের শিশুদের জন্য দিনে সর্বোচ্চ ১ ঘণ্টা তদারকির মাধ্যমে দেখা যেতে পারে।

৮. ‘নোমোফোবিয়া’ (Nomophobia) কী?

উত্তর: ফোন কাছে না থাকলে বা ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে যে তীব্র আতঙ্ক বা দুশ্চিন্তা কাজ করে, তাকেই নোমোফোবিয়া বলা হয়।

৯. মোবাইল আসক্তি থেকে মুক্তির উপায় কী?

উত্তর: নির্দিষ্ট সময়ে ফোন ব্যবহার করা, অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা এবং ঘুমানোর অন্তত এক ঘণ্টা আগে ফোন দূরে রাখার অভ্যাস করা।

১০. ডিজিটাল ডিটক্স (Digital Detox) কেন প্রয়োজন?

উত্তর: মস্তিষ্ককে বিশ্রাম দিতে এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় মনোযোগ ফিরিয়ে আনতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকা বা ডিজিটাল ডিটক্স জরুরি।

১১. মোবাইল আসক্তি কি শিশুদের আচরণে প্রভাব ফেলে?

উত্তর: হ্যাঁ, এটি শিশুদের খিটখিটে মেজাজ, সামাজিক মেলামেশায় অনীহা এবং শেখার ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়ার জন্য দায়ী হতে পারে।

১২. ফোনের আসক্তি কীভাবে উৎপাদনশীলতা কমায়?

উত্তর: কাজের মাঝে বারবার ফোন চেক করলে মনোযোগের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়, ফলে একটি কাজ শেষ করতে স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগে।

১৩. অতিরিক্ত ফোন ব্যবহারে কি ঘাড়ে ব্যথা হয়?

উত্তর: একে বলা হয় ‘টেক্সট নেক’ (Text Neck)। দীর্ঘক্ষণ নিচের দিকে ঝুঁকে ফোন দেখার ফলে ঘাড় এবং মেরুদণ্ডে প্রচণ্ড ব্যথা হতে পারে।

১৪. স্ক্রিন টাইম কমানোর জন্য কোনো অ্যাপ আছে কি?

উত্তর: হ্যাঁ, অ্যান্ড্রয়েডের জন্য ‘Digital Wellbeing’ এবং আইফোনের জন্য ‘Screen Time’ ফিচার ব্যবহার করে ফোনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

১৫. স্মার্টফোন আসক্তি ও বিষণ্ণতার সম্পর্ক কী?

উত্তর: যারা অতিরিক্ত সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন, তাদের মধ্যে নিজেদের অন্যদের সাথে তুলনা করার প্রবণতা বাড়ে, যা থেকে হীনম্মন্যতা ও বিষণ্ণতা তৈরি হতে পারে।


এসআর