Recent event

চার ঘণ্টা ঘুম: জানুন কীভাবে নিজেকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছেন

দিনে চার ঘণ্টা ঘুমের অপকারিতা
দিনে চার ঘণ্টা ঘুমের অপকারিতা | ছবি: এখন টিভি
0

রাত জেগে কাজ করা এখন একটি সাধারণ দৃশ্য (Common Scenario) হয়ে উঠেছে ঢাকার অফিসগুলোয়। দেশের প্রায় প্রতিটি করপোরেট অফিসে (Corporate Office), এমনকি প্রতিটি ছাত্রাবাসে (Student Dormitory) এমন মানুষ রয়েছেন যারা মাত্র চার ঘণ্টা ঘুমে (Four Hours Sleep) বিশ্বাস করেন। তাদের অনেকেই মনে করেন সাফল্যের জন্য ঘুমের ত্যাগ (Sleep Sacrifice for Success) অপরিহার্য। কিন্তু তারা জানেন না, এই অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রা (Unhealthy Lifestyle) তাদের ধীরে ধীরে অকাল মৃত্যুর (Premature Death) দিকে নিয়ে যাচ্ছে।

অপর্যাপ্ত বনাম পর্যাপ্ত ঘুমের প্রভাব
বিষয় (Factors) ৪ ঘণ্টা ঘুম (ঝুঁকি) ৭-৯ ঘণ্টা ঘুম (সুফল)
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ৩০% পর্যন্ত হ্রাস পায় সর্বোচ্চ কার্যকর থাকে
মস্তিষ্কের কার্যকারিতা স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ লোপ দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সৃজনশীলতা
হৃদরোগের ঝুঁকি ৪৮% বৃদ্ধি পায় স্বাভাবিক ও নিরাপদ
মানসিক অবস্থা উদ্বেগ ও বিষণ্নতা মানসিক প্রশান্তি ও স্থিতিশীলতা

জাতীয় স্বাস্থ্য সংকট ও পরিসংখ্যান

ঢাকা, চট্টগ্রাম এবং সিলেট—দেশের বড় শহরগুলোয় ঘুমের সংকট (Sleep Crisis) প্রকট আকার নিয়েছে। কর্মচাপ (Work Pressure), অনলাইন আসক্তি (Social Media Addiction) এবং আর্থিক চিন্তা (Financial Stress) মিলে আধুনিক বাংলাদেশের মানুষের ঘুমের সময় উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করেছে। এই সংকট এখন শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়, একটি জাতীয় স্বাস্থ্য সংকট (National Health Crisis) হয়ে উঠেছে।

আরও পড়ুন:

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (World Health Organization - WHO) ২০২৩ সালের রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ৩৫ শতাংশ মানুষ অপর্যাপ্ত ঘুমে (Sleep Deprivation) ভুগছেন। বাংলাদেশে এই হার আরও বেশি—শহুরে এলাকায় ৪৮ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন ছয় ঘণ্টার কম ঘুমান। এদিকে আঞ্চলিক গবেষণায় দেখা গেছে, ২৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী কর্মজীবী মানুষদের (Working Professionals) মধ্যে এই সংকট সবচেয়ে বেশি।

শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকির ভয়াবহতা

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা (Health Experts) জানান, প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম (7 to 9 Hours of Sleep) প্রয়োজন। যারা এর চেয়ে কম ঘুমান তাদের শরীরে জমা হতে থাকে বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী ব্যাধি (Chronic Diseases)। গবেষণা দেখায়, মাত্র পাঁচ দিন ঘুমের অভাব রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immune System) ৩০ শতাংশ কমিয়ে দেয়। এর ফলে:

  • হৃদরোগের ঝুঁকি (Heart Disease Risk) ৪৮ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
  • স্ট্রোকের সম্ভাবনা (Risk of Stroke) দ্বিগুণ হয়।
  • টাইপ টু ডায়াবেটিস (Type 2 Diabetes) হওয়ার আশঙ্কা তিনগুণ বেড়ে যায়।

মস্তিষ্কের ক্ষতি (Brain Damage) এক্ষেত্রে অনিবার্য। আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি অনিদ্রা (Chronic Insomnia) মস্তিষ্কের স্মৃতিকেন্দ্র ৫-১০ শতাংশ সংকুচিত করে দেয়। ফলে স্মৃতিশক্তি হ্রাস (Memory Loss), সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিফলতা (Cognitive Impairment) এবং স্নায়বিক রোগের (Neurological Disorders) ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি বিষণ্নতা (Depression), উদ্বেগজনিত ব্যাধি (Anxiety Disorders) এবং মানসিক অস্থিতিশীলতার (Mental Instability) সূচনা ঘটায়।

আরও পড়ুন:

চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা

চিকিৎসকরা সতর্ক করেছেন, যারা প্রতি রাতে মাত্র চার ঘণ্টা ঘুমান (4-hour Sleep Pattern), তাদের দীর্ঘমেয়াদিভাবে গড় আয়ু (Life Expectancy) পাঁচ থেকে দশ বছর কমে যেতে পারে। এক্ষেত্রে শরীর নিজের পুনরুদ্ধার ও মেরামত করার ক্ষমতা (Body's Self-Repair Mechanism) ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলে।

সম্প্রতি দেশের প্রধান চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঘুমের সমস্যার রোগী (Patients with Sleep Disorders) উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষত করপোরেট কর্মীরা নিউরোলজি (Neurology) ও মনোরোগ বিভাগে (Psychiatry Department) অনিদ্রার চিকিৎসা (Insomnia Treatment) নিচ্ছেন।

আপনার ক্যারিয়ার (Career) গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু জীবন তার চেয়েও বেশি মূল্যবান। আজই পুনরায় চিন্তা করুন আপনার ঘুমের সময়সূচি (Sleep Schedule) নিয়ে। কারণ পর্যাপ্ত ঘুম (Adequate Sleep) কোনো বিলাসিতা নয়—এটি সুস্থ জীবনের ভিত্তি (Foundation of Life)।

আরও পড়ুন:

ঘুম নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি প্রশ্ন ও উত্তর(FAQ)

প্রশ্ন: প্রতিদিন মাত্র ৪ ঘণ্টা ঘুমানো কি শরীরের জন্য যথেষ্ট?

উত্তর: না, অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতিদিন ৭-৯ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। ৪ ঘণ্টা ঘুম শরীর ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একেবারেই যথেষ্ট নয়।

প্রশ্ন: দীর্ঘমেয়াদে ৪ ঘণ্টা করে ঘুমালে কী ধরনের শারীরিক সমস্যা হতে পারে?

উত্তর: দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, স্ট্রোক এবং স্থূলতা বা ওজন বৃদ্ধির মতো গুরুতর স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হয়।

প্রশ্ন: ঘুমের অভাব কি সত্যিই আয়ু কমিয়ে দেয়?

উত্তর: হ্যাঁ, চিকিৎসকদের মতে যারা নিয়মিত ৪ ঘণ্টা বা তার কম ঘুমান, তাদের গড় আয়ু ৫-১০ বছর পর্যন্ত কমে যেতে পারে কারণ শরীর নিজেকে মেরামত করার পর্যাপ্ত সময় পায় না।

প্রশ্ন: ৪ ঘণ্টা ঘুমালে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউনিটি কি কমে যায়?

উত্তর: অবশ্যই। গবেষণায় দেখা গেছে, মাত্র ৫ দিন কম ঘুমালে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়, ফলে শরীর খুব সহজেই সর্দি, কাশি বা অন্যান্য সংক্রমণে আক্রান্ত হয়।

প্রশ্ন: কম ঘুম কীভাবে মস্তিষ্কের ক্ষতি করে?

উত্তর: পর্যাপ্ত ঘুম না হলে মস্তিষ্কের স্মৃতিকেন্দ্র (Hippocampus) সংকুচিত হতে শুরু করে। এতে স্মৃতিশক্তি হ্রাস পায়, মনোযোগ কমে যায় এবং দীর্ঘমেয়াদে আলঝেইমার্সের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

প্রশ্ন: ঘুমের অভাব কি ওজন বৃদ্ধির কারণ হতে পারে?

উত্তর: হ্যাঁ। কম ঘুমালে শরীরে 'লেপটিন' (তৃপ্তি হরমোন) কমে যায় এবং 'ঘেরলিন' (ক্ষুধা হরমোন) বেড়ে যায়, যার ফলে মানুষের অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয় এবং দ্রুত ওজন বাড়ে।

প্রশ্ন: ৪ ঘণ্টা ঘুমালে কি মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব পড়ে?

উত্তর: হ্যাঁ, অনিদ্রার ফলে উদ্বেগ (Anxiety), বিষণ্নতা (Depression), খিটখিটে মেজাজ এবং মানসিক অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়।

প্রশ্ন: কম ঘুমিয়ে কি কফি বা ক্যাফেইন খেয়ে ক্লান্তি দূর করা সম্ভব?

উত্তর: ক্যাফেইন সাময়িকভাবে আপনাকে সজাগ রাখতে পারে, কিন্তু এটি ঘুমের বিকল্প নয়। এটি শরীরের ভেতরের ক্ষতি বা কোষের ক্লান্তি দূর করতে পারে না।

প্রশ্ন: সপ্তাহে ৫ দিন ৪ ঘণ্টা আর উইকেন্ডে বেশি ঘুমালে কি ক্ষতি পূরণ হয়?

উত্তর: না। এই অভ্যাসকে 'স্লিপ ডেট' বলা হয়। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বেশি ঘুমিয়ে সারা সপ্তাহের শারীরিক ও মস্তিষ্কের ক্ষতি পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

প্রশ্ন: ঘুমের অভাব কীভাবে হার্টের ক্ষতি করে?

উত্তর: পর্যাপ্ত ঘুম না হলে রক্তে স্ট্রেস হরমোন বেড়ে যায় এবং ধমনীতে প্রদাহ সৃষ্টি হয়, যা সরাসরি হৃদরোগ ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

প্রশ্ন: ৪ ঘণ্টা ঘুমানো ব্যক্তিদের কি সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমস্যা হয়?

উত্তর: হ্যাঁ, অনিদ্রার ফলে মস্তিষ্কের 'প্রি-ফ্রন্টাল কর্টেক্স' ঠিকমতো কাজ করে না, যা মানুষের যৌক্তিক চিন্তা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে।

প্রশ্ন: ঘুমের সংকটের কারণে কি ত্বকের অকাল বার্ধক্য আসে?

উত্তর: হ্যাঁ। ঘুমের সময় ত্বক কোলাজেন তৈরি করে নিজেকে পুনর্গঠন করে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে চোখের নিচে কালি পড়া (Dark circles) এবং চামড়ায় দ্রুত বলিরেখা দেখা দেয়।

প্রশ্ন: ৪ ঘণ্টা ঘুমানোর পর গাড়ি চালানো কি ঝুঁকিপূর্ণ?

উত্তর: অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ঘুমের অভাবে রিফ্লেক্স কমে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, ৪ ঘণ্টা ঘুমিয়ে গাড়ি চালানো অনেকটা মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর মতোই বিপজ্জনক।

প্রশ্ন: স্লিপ অ্যাপনিয়া কী এবং এর সাথে কম ঘুমের সম্পর্ক কী?

উত্তর: স্লিপ অ্যাপনিয়া হলো ঘুমের মধ্যে শ্বাস-প্রশ্বাস সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়া। এটি ঘুমের মান কমিয়ে দেয়, যার ফলে কেউ ৪ ঘণ্টা ঘুমালে তার শরীর সাধারণ মানুষের চেয়েও বেশি ক্লান্ত থাকে।

প্রশ্ন: ঘুমের মান বা কোয়ালিটি বাড়ানোর উপায় কী?

উত্তর: প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস করা, ঘুমানোর ১ ঘণ্টা আগে মোবাইল ত্যাগ করা এবং ঘর অন্ধকার ও শান্ত রাখা ঘুমের মান বাড়াতে সাহায্য করে।




এএম