নির্বাচনি আসনে শুধু একজন প্রার্থী থাকলে ভোট হবে? ভোটের নতুন নিয়মে যা আছে

সংসদ নির্বাচন
সংসদ নির্বাচন | ছবি: এখন টিভি
0

নির্বাচনি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফেরাতে এবং ভোটারদের অধিকার রক্ষায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। এখন থেকে কোনো আসনে একজন মাত্র প্রার্থী (Single Candidate Election Rules in Bangladesh) থাকলেও তিনি সরাসরি বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হতে পারবেন না। সেই ক্ষেত্রে ভোটারদের জন্য ‘হ্যাঁ-না’ ভোট (Yes-No Vote) বা ‘না’ ভোট (None of the Above - NOTA) দেওয়ার সুযোগ রাখা হচ্ছে।

একনজরে আরপিও-২০২৫: পুরাতন বনাম নতুন নির্বাচনি নিয়ম (New Rules for Yes-No Vote in Single Candidate Seats)

বিষয়আগে যা ছিল (পুরাতন নিয়ম)আরপিও-২০২৫ অনুযায়ী (নতুন নিয়ম)
একক প্রার্থীসরাসরি বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী ঘোষণা (Elected Unopposed)।সরাসরি জয়ের সুযোগ নেই; ‘না’ ভোটের সাথে লড়তে হবে।
না ভোট (No-Vote)২০০৯ সালে বাতিল করা হয়েছিল; কোনো সুযোগ ছিল না।পুনরায় চালু করা হয়েছে; ব্যালট পেপারে ‘না’ অপশন থাকবে।
ভোটারের ক্ষমতাপ্রার্থী পছন্দ না হলেও অনাস্থা প্রকাশের উপায় ছিল না।প্রার্থী অপছন্দ হলে ‘না’ ভোট দিয়ে অনাস্থা প্রকাশের পূর্ণ অধিকার।
ভোটের পদ্ধতিকাগজের ব্যালট ও ইভিএম (EVM) উভয় পদ্ধতি।ইভিএম সম্পূর্ণ বাতিল; শুধুমাত্র কাগজের ব্যালটে ভোট।
প্রার্থী জামানত20,000 (বিশ হাজার) টাকা।50,000 (পঞ্চাশ হাজার) টাকা।
জোটের প্রতীকজোটের শরিকরা যেকোনো বড় দলের প্রতীকে ভোট দিতে পারত।জোট করলেও নিজ নিজ দলীয় প্রতীকে ভোট করা বাধ্যতামূলক।
প্রবাসী ভোটসুযোগ খুবই সীমিত ও জটিল ছিল।ডিজিটাল পোস্টাল ব্যালট ও আধুনিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থা।
পলাতক আসামিঅযোগ্যতা নিয়ে আইনি অস্পষ্টতা ছিল।আদালত ঘোষিত ‘পলাতক’ (Fugitive) ব্যক্তি সরাসরি অযোগ্য।
তফসিল ও ফলএকবারই চূড়ান্ত হতো এবং ভোট ছাড়াই গেজেট হতো।‘না’ ভোট বেশি পড়লে গেজেট হবে না; পুনরায় নতুন তফসিল হবে।
মিথ্যা তথ্য/AI কনটেন্টসুনির্দিষ্ট কঠোর দণ্ড ছিল না।ফেক নিউজ বা এআই (AI) অপপ্রচার করলে প্রার্থিতা বাতিল ও জেল।

আরও পড়ুন:

আরপিও সংশোধনী ২০২৫-এর নতুন নিয়ম (New RPO Amendment Rules 2025)

নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ (Representation of the People Amendment Ordinance 2025)-এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে। এই সংশোধনী অনুযায়ী:

একক প্রার্থীর পরীক্ষা: কোনো আসনে একজন বৈধ প্রার্থী থাকলে তাকে জয়ী হতে হলে ‘না’ ভোটের চেয়ে বেশি ভোট পেতে হবে। অর্থাৎ, ভোটাররা যদি ওই প্রার্থীকে পছন্দ না করেন, তবে তারা ব্যালট পেপারে ‘না’ (No-Vote option) ঘরে সিল দিয়ে তাদের অনাস্থা জানাতে পারবেন।

পুনরায় নির্বাচন (Re-election): যদি কোনো কারণে ওই আসনে ‘না’ ভোট প্রার্থীর প্রাপ্ত ভোটের চেয়ে বেশি হয়, তবে সেই আসনে নির্বাচন কমিশন ফলাফল বাতিল করে পুনরায় নতুন তফসিল (New Election Schedule) ঘোষণা করবে।

পুনঃতফসিলের বিধান: ইসি সানাউল্লাহ স্পষ্ট করেছেন, পুনঃতফসিলেও যদি পুনরায় মাত্র একজন প্রার্থী থাকেন, তবে সেখানে আর ‘না’ ভোটের প্রয়োজন হবে না। তবে প্রথমবার ‘না’ ভোটের মুখোমুখি হওয়া বাধ্যতামূলক।

আরও পড়ুন:

নতুন আইনের মূল পরিবর্তন (Major Changes in New Election Law)

নির্বাচন কমিশন (Election Commission) এবং আরপিও-র প্রস্তাবিত নতুন নিয়ম অনুযায়ী, একক প্রার্থীর বৈধতা প্রমাণের জন্য জনমতের প্রতিফলন ঘটাতে হবে:

ভোট গ্রহণ বাধ্যতামূলক (Mandatory Polling): একক প্রার্থী থাকলেও ওই আসনে নির্ধারিত দিনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ব্যালট পেপারে প্রার্থীর প্রতীকের পাশাপাশি একটি ‘না’ (No) বা ‘অসম্মত’ চিহ্ন থাকবে।

জয়ী হওয়ার শর্ত (Winning Condition): একক প্রার্থীকে জয়ী হতে হলে মোট কাস্টিং ভোটের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ (যেমন: ৫০ শতাংশের বেশি) ‘হ্যাঁ’ ভোট বা তার পক্ষে পেতে হবে।

‘না’ ভোট জয়ী হলে কি হবে? (If 'No' Vote Wins): যদি কোনো আসনে প্রার্থীর পক্ষে পড়া ভোটের চেয়ে ‘না’ বা বিপক্ষের ভোট বেশি হয়, তবে ওই প্রার্থীকে নির্বাচিত ঘোষণা করা হবে না। সেই ক্ষেত্রে ওই আসনে পুনরায় তফসিল (Re-election Schedule) ঘোষণা করে নতুন করে নির্বাচনের আয়োজন করা হবে।

আরও পড়ুন:

আরপিও-২০২৫ এর ১২টি বৈপ্লবিক পরিবর্তন (12 Major Changes in RPO 2025)

বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ (RPO Amendment Ordinance 2025) এর খসড়া চূড়ান্ত করেছে নির্বাচন কমিশন (EC)। নতুন এই আইনে বিনা ভোটে নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ বন্ধ করাসহ ইভিএম বাতিল এবং কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

১. একক প্রার্থীর বিরুদ্ধে ‘না ভোট’ (No-Vote against Single Candidate): কোনো আসনে মাত্র একজন প্রার্থী থাকলে তিনি সরাসরি জয়ী হবেন না। তাকে ‘না ভোট’ অপশনের চেয়ে বেশি ভোট পেতে হবে। তবে দ্বিতীয়বার নির্বাচনেও যদি একই পরিস্থিতি হয়, তবে তিনি নির্বাচিত হবেন।

২. ইভিএম যুগ শেষ (Abolition of EVM): ভোটগ্রহণে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (EVM) ব্যবহারের সমস্ত ধারা (Article 26, 26A-D) বাতিল করা হয়েছে। এখন থেকে কেবল কাগজের ব্যালটেই ভোট হবে।

৩. প্রবাসীদের জন্য ডিজিটাল পোস্টাল ব্যালট (Postal Ballot for Expats): বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশি (Expatriate Voters) এবং সরকারি চাকুরিজীবীরা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধনের মাধ্যমে পোস্টাল ব্যালটে ভোট দিতে পারবেন। প্রতিটি ব্যালটে থাকবে ইউনিক ট্র্যাকিং নম্বর।

৪. ‘পলাতক’ হলে প্রার্থিতা বাতিল (Fugitive Candidate Disqualification): আদালত কর্তৃক ‘পলাতক’ (Fugitive) ঘোষিত কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য পদের জন্য অযোগ্য বলে গণ্য হবেন।

৫. ফেক নিউজ ও এআই কনটেন্টে কঠোরতা (Punishment for Fake News and AI Content): নির্বাচন নিয়ে মিথ্যা তথ্য, বিকৃত ছবি বা এআই (AI) তৈরি অডিও-ভিডিও প্রচার করলে তা ‘দুর্নীতিমূলক কাজ’ (Corrupt Practice) হিসেবে গণ্য হবে। এর জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সংবাদমাধ্যম সমানভাবে দায়ী থাকবে।

৬. আয় ও সম্পদের পূর্ণ বিবরণ (Asset and Income Disclosure): মনোনয়নপত্রের সাথে আয়কর রিটার্ন কপি এবং দেশে-বিদেশে থাকা নির্ভরশীলদের সম্পদের পূর্ণ হলফনামা (Affidavit) জমা দিতে হবে, যা কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।

৭. জামানত বৃদ্ধি (Increase in Security Deposit): নির্বাচনে প্রার্থীর জামানতের অর্থ ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০ হাজার টাকা (50,000 BDT) করা হয়েছে।

আরও পড়ুন:

৮. এমপিদের অযোগ্যতা নির্ধারণে ইসির ক্ষমতা (EC's Power on MP Disqualification): নির্বাচনের পর কোনো সংসদ সদস্যের অযোগ্যতা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে।

৯. কেন্দ্রে অবাঞ্ছিত প্রবেশে কঠোরতা (Strictness in Polling Centers): প্রার্থী বা প্রভাবশালী কেউ কেন্দ্রে অপ্রয়োজনে ভিড় করলে আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের সরাসরি গ্রেফতার (Arrest) করতে পারবে।

১০. নির্বাচন বন্ধের ক্ষমতা (Power to Cancel Election): জবরদস্তি বা দৈব কারণে (Act of God) সুষ্ঠু ভোট অসম্ভব মনে হলে ইসি পুরো আসনের ভোট বন্ধ করতে পারবে।

১১. দলের তহবিলের স্বচ্ছতা (Transparency in Party Fund): রাজনৈতিক দলের অনুদানের হিসাব তাদের নিজস্ব ওয়েবসাইটে (Official Website) প্রকাশ করা বাধ্যতামূলক।

১২. ভোট সমান হলে পুনঃভোট (Re-election for Equal Votes): দুই প্রার্থীর ভোট সমান হলে কেবল তাদের মধ্যেই নতুন করে ভোটগ্রহণ হবে।

আরও পড়ুন:

কেন এই পরিবর্তন? (Why No-Vote is Reintroduced?)

উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানান, বিগত সরকারের আমলে বিনা ভোটে এবং বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার যে অপসংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তা চিরতরে বন্ধ করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে নির্বাচনি ব্যবস্থায় ভোটারদের অংশগ্রহণ এবং প্রার্থীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।

জোটগত নির্বাচনে নতুন কড়াকড়ি (Alliance Election Symbols)

নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন (Coalition Election) করলেও রাজনৈতিক দলগুলোকে তাদের নিজ নিজ দলীয় প্রতীকে (Respective Party Symbols) ভোট করতে হবে। অর্থাৎ, জোটের বড় শরিকের প্রতীকে ছোট দলের প্রার্থীদের ভোট করার সুযোগ আর থাকছে না। এটি ভোটারদের বিভ্রান্তি দূর করতে সাহায্য করবে।

আরও পড়ুন:


এসআর