যাদের কোরবানি কবুল হয় না: কোরআন ও হাদিসের আলোকে যে ৩ শ্রেণির মানুষ

কোরবানি কবুল না হওয়ার কারণ ও প্রতিকার
কোরবানি কবুল না হওয়ার কারণ ও প্রতিকার | ছবি: এখন টিভি
0

পবিত্র ঈদুল আজহায় (Eid-ul-Adha) নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক, প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ও স্বাভাবিক জ্ঞানসম্পন্ন মুসলমানের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব (Wajib)। শরিয়তের নিয়ম অনুযায়ী, কারও কাছে যদি সাড়ে ৭ ভরি সোনা বা সাড়ে ৫২ ভরি রুপা অথবা এর সমপরিমাণ নগদ টাকা বা ব্যবসায়িক সম্পদ থাকে, তবে তার ওপর কোরবানি (Whose Qurbani is Not Accepted) আবশ্যক।

তবে মনে রাখতে হবে, কোরবানি কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা বা পশু জবাইয়ের উৎসব নয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেছেন: ‘আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর (কোরবানির পশুর) গোশত ও রক্ত, বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।' (সুরা হজ, আয়াত: ৩৭)

কোরআন ও সহীহ হাদিসের (Quran and Sahih Hadith) আলোকে এমন ৩ শ্রেণির মানুষের কথা নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো, যাদের বিশেষ ভুল-ত্রুটি ও নিয়তের কারণে কোরবানি মহান আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না।

আরও পড়ুন:

একনজরে কোরবানি কবুল না হওয়ার কারণ ও প্রতিকার (Summary of Qurbani Acceptance Criteria)

প্রধান অন্তরায় (Main Obstacle) কেন কবুল হয় না (Reasons for Rejection) করণীয়/সমাধান (Remedy)
অশুদ্ধ নিয়ত (Riya/Show-off) গোশত খাওয়ার লোভ, সামাজিক মর্যাদা বা অহংকার প্রকাশ করা হলে। কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়ত করা।
হারাম উপার্জন (Haram Money) ঘুষ, সুদ বা দুর্নীতির টাকায় পশু কিনলে পুরো কোরবানিই বাতিল হয়। ১০০% হালাল টাকার তহবিল ব্যবহার।
অসুস্থ বা ত্রুটিপূর্ণ পশু (Defective Animal) পশু অন্ধ, খোঁড়া, শিং ভাঙা, কান কাটা বা অতিশয় রুগ্ন হলে শরিয়তে নিষেধ। সুস্থ, সবল ও দৃষ্টিনন্দন পশু কেনা।
শরিকের নিয়তে গলদ (Partner's Bad Intent) ভাগের কোরবানিতে যেকোনো একজন শরিকের টাকা হারাম বা নিয়ত খারাপ হলে। বিশ্বস্ত ও দ্বীনদার শরিক নির্বাচন করা।

১. যাদের নিয়ত শুদ্ধ নয় (Wrong Intention or Showing Off)

কোরবানি কবুল হওয়ার প্রধানতম শর্ত হলো নিয়তের পরিচ্ছন্নতা বা ইখলাস। একমাত্র আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যে পশু জবাই করলে তা বাতিল বলে গণ্য হবে।

লোকদেখানো কোরবানি: সমাজে নিজের সুনাম ছড়ানো, বড় বা দামি পশু কিনে বাহবা নেওয়া কিংবা কেবল পরিবার ও সমাজের মানুষের গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে কোরবানি দিলে তা কবুল হবে না।

হাদিসের দলিল: রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘প্রত্যেক কাজ নিয়তের সঙ্গে সম্পর্কিত। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পাবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ০১)। সুরা মায়েদার ২৭ নম্বর আয়াতেও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ কেবল মুত্তাকীদের (যাদের তাকওয়া আছে) থেকে কোরবানি গ্রহণ করেন।’

আরও পড়ুন:

২. যাদের উপার্জন হালাল নয় (Illegal or Haram Income)

কোরবানির পশু কেনার অর্থ বা টাকা সম্পূর্ণ হালাল উৎস থেকে আসতে হবে। ইসলামে হারাম অর্থ দিয়ে যেকোনো ইবাদত করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।

হারাম রিজিক: সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, আত্মসাৎ কিংবা অবৈধ ব্যবসার টাকা দিয়ে লাখ টাকা খরচ করে কোরবানি দিলেও আল্লাহর দরবারে তার কোনো মূল্য নেই।

হাদিসের দলিল: হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে লোক সকল! আল্লাহ পবিত্র, আর পবিত্র জিনিস ছাড়া তিনি কিছু গ্রহণ করেন না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২২৩৬)। অতএব, হারাম উপার্জনে (Haram Income) কেনা পশুর কোরবানি সম্পূর্ণ ব্যর্থ।

৩. যারা ত্রুটিপূর্ণ পশু দিয়ে কোরবানি করে (Defective or Sick Animal)

আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করার জন্য পশুটি অবশ্যই সুস্থ, সবল ও ত্রুটিমুক্ত হতে হবে। জেনেশুনে ত্রুটিপূর্ণ বা সস্তা রোগাক্রান্ত পশু কোরবানি দিলে তা শুদ্ধ হবে না।

অযোগ্য পশুর লক্ষণ: যে পশুর অন্ধত্ব স্পষ্ট (Blind Animal), চরমভাবে খোঁড়া বা পঙ্গু (Lame Animal), মারাত্মক রোগাক্রান্ত ও দুর্বল কিংবা যে পশুর হাড়ের মগজ পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে— এমন পশু দিয়ে কোরবানি করা জায়েজ নেই।

হাদিসের দলিল: রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ করেছেন যে, স্পষ্ট খোঁড়া, স্পষ্ট কানা, স্পষ্ট রুগ্ন এবং অতিশয় দুর্বল পশু দ্বারা কোরবানি হবে না (সুনান আত তিরমিজি, হাদিস: ১৫০৩)।

আরও পড়ুন:

কোরবানি কবুল ও বিশুদ্ধ হওয়ার শর্তাবলী সংক্রান্ত ১৫টি প্রশ্নোত্তর (Top 15 Qurbani FAQs)

প্রশ্ন: কার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব (Wajib) বা আবশ্যক হয়?

উত্তর: ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে যাদের কাছে জীবনযাত্রার মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর পর ‘নিসাব পরিমাণ’ সম্পদ (সাড়ে ৭ ভরি সোনা / সাড়ে ৫২ ভরি রুপা বা সমমূল্যের নগদ টাকা/ব্যবসায়িক পণ্য) থাকবে, তাদের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব।

প্রশ্ন: লোকদেখানো নিয়তে কোরবানি (Showing Off Qurbani) দিলে কি তা কবুল হবে?

উত্তর: একদমই নয়। ইসলামে যেকোনো ইবাদত কবুল হওয়ার মূল শর্ত হলো ইখলাস বা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়ত। সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি বা লোকদেখানোর নিয়ত থাকলে সেই কোরবানি বাতিল হয়ে যায়।

প্রশ্ন: যৌথ বা ভাগের কোরবানিতে (Joint Qurbani) কোনো একজনের টাকা হারাম হলে কি বাকিদের কোরবানি হবে?

উত্তর: না, ভাগের কোরবানিতে (যেমন এক গরুতে সর্বোচ্চ ৭ ভাগ) যদি কোনো একজন শরিকের উপার্জন হারাম হয় কিংবা তার নিয়ত শুধু গোশত খাওয়া বা লোকদেখানো হয়, তবে সেই পশুর অন্য সব শরিকের কোরবানিও বাতিল হয়ে যাবে।

প্রশ্ন: সুদের টাকা বা ঘুষের টাকা (Haram Income) দিয়ে কেনা পশুর কোরবানি কি জায়েজ?

উত্তর: না, হারাম টাকা দিয়ে পশুর কোরবানি সম্পূর্ণ অবৈধ ও বাতিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র জিনিস ছাড়া কোনো কিছু গ্রহণ করেন না" (সহিহ মুসলিম)।

প্রশ্ন: কোরবানির পশুর বয়স (Minimum Age of Animal) সর্বনিম্ন কত হতে হবে?

উত্তর: গরু, মহিষ ও উটের ক্ষেত্রে বয়স যথাক্রমে ন্যূনতম ২ বছর এবং ৫ বছর হতে হবে (দাঁত উঠতে হবে)। ছাগল, ভেড়া ও দুম্বার ক্ষেত্রে ন্যূনতম ১ বছর হতে হবে। তবে ৬ মাসের দুম্বা বা ভেড়া যদি দেখতে ১ বছরের মতো মোটাতাজা মনে হয়, তা দিয়ে কোরবানি বৈধ।

প্রশ্ন: অন্ধ বা চোখে কম দেখা পশু (Blind or Defective Animal) দিয়ে কোরবানি করা যাবে কি?

উত্তর: যে পশুর অন্ধত্ব স্পষ্ট (এক চোখ বা দুই চোখ সম্পূর্ণ অন্ধ) কিংবা চোখের দৃষ্টিশক্তি এক-তৃতীয়াংশ বা তার বেশি নষ্ট হয়ে গেছে, এমন পশু দিয়ে কোরবানি দেওয়া শরিয়তে জায়েজ নেই।

প্রশ্ন: পঙ্গু বা মারাত্মক খোঁড়া পশু (Lame Animal) দিয়ে কোরবানি কবুল হবে কি?

উত্তর: যে পশু তিন পায়ে ভর দিয়ে চলে এবং চতুর্থ পা মাটিতে রাখতেই পারে না, কিংবা জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত হেঁটে যাওয়ার সামর্থ্য নেই, এমন খোঁড়া পশু দিয়ে কোরবানি শুদ্ধ হবে না।

প্রশ্ন: শিং ভাঙা কিংবা কান কাটা পশু দিয়ে কোরবানি করার হুকুম কি?

উত্তর: যদি পশুর শিং একেবারে গোড়া থেকে ভেঙে যায় যার প্রভাব মগজ পর্যন্ত পৌঁছেছে, অথবা কান বা লেজের অর্ধেকের বেশি অংশ কাটা থাকে, তবে তা দিয়ে কোরবানি হবে না। তবে সামান্য ভাঙা বা অল্প কাটা থাকলে কোরবানি হয়ে যাবে।

প্রশ্ন: অতিশয় রুগ্ন ও হাড় জিরজিরে পশু (Sick and Weak Animal) দিয়ে কোরবানি দেওয়া যাবে?

উত্তর: যে পশু এতোটাই অসুস্থ বা দুর্বল যে তার হাড়ের ভেতরের মগজ পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে এবং নিজে হাঁটার ক্ষমতা হারিয়েছে, এমন পশু দিয়ে কোরবানি জায়েজ নয়।

প্রশ্ন: কোরবানির পশুর গোশত কি অমুসলিমদের দেওয়া যাবে?

উত্তর: হ্যাঁ, কোরবানির গোশত কাফের বা অমুসলিম প্রতিবেশীকে উপহার বা সদকা হিসেবে দেওয়া শরিয়ত অনুযায়ী সম্পূর্ণ জায়েজ।

প্রশ্ন: কোরবানির পশুর চামড়া বা গোশত দিয়ে কি কসাইয়ের মজুরি (Wages to Butcher) দেওয়া যাবে?

উত্তর: না, কসাই বা শ্রমিকের পারিশ্রমিক হিসেবে কোরবানির পশুর গোশত, চামড়া, রশি বা কোনো অংশ দেওয়া কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। মজুরি নিজের পকেটের টাকা থেকে আলাদাভাবে দিতে হবে।

প্রশ্ন: কোরবানির চামড়া বিক্রির টাকা (Qurbani Skin Sale Money) কোথায় দিতে হবে?

উত্তর: কোরবানির পশুর চামড়া নিজে ব্যবহার না করে বিক্রি করলে, সেই বিক্রিত অর্থ সম্পূর্ণটাই নিজে ভোগ না করে এতিম, মিসকিন ও সদকার হকদার গরিবদের মাঝে দান করে দেওয়া ওয়াজিব।

প্রশ্ন: ঋণ বা ধার করা টাকা দিয়ে কোরবানি দিলে কি তা কবুল হবে?

উত্তর: যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়, সে যদি ঋণ করে কোরবানি দেয় তবে কোরবানি হয়ে যাবে (যদি সহজে ঋণ পরিশোধের উপায় থাকে)। তবে সুদি ঋণ নিয়ে কোরবানি দেওয়া সম্পূর্ণ হারাম।

প্রশ্ন: মৃত ব্যক্তির নামে কোরবানি (Qurbani on Behalf of Deceased) দেওয়া কি বৈধ?

উত্তর: হ্যাঁ, মৃত পিতা-মাতা বা স্বজনদের সওয়াব পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে (ঈসালে সওয়াব) নিজের ওয়াজিব কোরবানি আদায়ের পাশাপাশি বা আলাদাভাবে কোরবানি দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।

প্রশ্ন: পরিবারের সবার পক্ষ থেকে কি একটি ছাগল দিয়ে কোরবানি সম্ভব?

উত্তর: ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দিয়ে কেবল মাত্র ১ জনের পক্ষ থেকেই কোরবানি দেওয়া যায়। পরিবারের একাধিক সদস্য সাহেব-ই-নিসাব (ধনী) হলে, প্রত্যেকের পক্ষ থেকে আলাদা কোরবানি বা গরুর আলাদা ভাগ নিতে হবে।


এসআর