কত টাকা বা সম্পদ থাকলে কোরবানি দেওয়া আবশ্যক? জানুন শরীয়তের বিধান

কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার নিয়ম
কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার নিয়ম | ছবি: এখন টিভি
0

আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জনের অনন্য মাধ্যম কোরবানি কেবল একটি আর্থিক ইবাদত নয়, এটি একটি আত্মিক ইবাদতও বটে। জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ যদি কোনো মুসলিমের কাছে তার পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর উদ্বৃত্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তবে তার ওপর কোরবানি করা আবশ্যক বা ওয়াজিব।

নিসাব বা সম্পদের পরিমাণ (Nisab or Amount of Wealth)

শরীয়তের বিধান অনুযায়ী, কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য সম্পদের নিসাব হলো— সাড়ে ৭ তোলা সোনা অথবা সাড়ে ৫২ তোলা রুপা কিংবা সমমূল্যের নগদ অর্থ বা সম্পদ।

১. স্বর্ণের নিসাব (Nisab of Gold): যদি কেউ সোনাকে মানদণ্ড ধরেন, তবে সাড়ে ৭ তোলা সোনার বাজারদর অনুযায়ী বর্তমানে প্রায় ৪ লাখ টাকা (মানভেদে ভিন্ন হতে পারে) মালিকানায় থাকলে কোরবানি দেওয়া আবশ্যক।

২. রুপার নিসাব (Nisab of Silver): যদি কেউ রুপাকে মানদণ্ড ধরেন, তবে সাড়ে ৫২ তোলা রুপার বাজারদর অনুযায়ী সর্বনিম্ন প্রায় ৫০ হাজার টাকা থাকলেও তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে।

আরও পড়ুন:

কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্তসমূহ (Conditions for Qurbani to be Obligatory)

মালিকানার সময়সীমা: যাকাতের মতো কোরবানি আবশ্যক হওয়ার জন্য সম্পদ এক বছর পূর্ণ হওয়া শর্ত নয়; বরং জিলহজ মাসের ওই তিন দিন মালিকানায় থাকলেই হবে।

ব্যক্তিগত অবস্থা: সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন, প্রাপ্তবয়স্ক, মুসলিম এবং ঋণমুক্ত হতে হবে।

মুসাফিরের বিধান: যে ব্যক্তি কমপক্ষে ৪৮ মাইল সফরের নিয়তে এলাকা ত্যাগ করেছেন (মুসাফির), তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়।

নাবালেগ ও পাগল: নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেও নাবালেগ বা পাগলের ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়।

নিসাবের মাধ্যম (Nisab Type) পরিমাণ (Quantity) সম্ভাব্য বাজারমূল্য (Market Value)
স্বর্ণ/সোনা (Gold) সাড়ে ৭ তোলা / ভরি ৩,৭১,০০০ - ৫,৪০,০০০ টাকা
রৌপ্য/রুপা (Silver) সাড়ে ৫২ তোলা / ভরি ৪৮,৯০০ - ৭৯,৫০০ টাকা
নগদ টাকা (Cash) উপরিউক্ত সমমূল্য ৫০,০০০ - ৪,০০,০০০ টাকা (গড়)

আরও পড়ুন:

কোরবানির নিসাব ও মাসআলা সংক্রান্ত প্রশ্নোত্তর-FAQ

প্রশ্ন: কোরবানি কি সবার ওপর ফরজ?

উত্তর: না, কোরবানি সবার ওপর ফরজ নয়; বরং শরীয়ত নির্ধারিত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব।

প্রশ্ন: কত টাকা থাকলে কোরবানি ওয়াজিব হয়?

উত্তর: যদি কারও কাছে নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচের অতিরিক্ত সাড়ে ৫২ তোলা রুপার বাজারমূল্য (বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু) থাকে, তবে তাঁর ওপর কোরবানি ওয়াজিব।

প্রশ্ন: কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য কি সম্পদের ওপর এক বছর অতিবাহিত হতে হয়?

উত্তর: না, যাকাতের মতো এক বছর পূর্ণ হওয়া শর্ত নয়; জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখের মধ্যে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেই কোরবানি ওয়াজিব।

প্রশ্ন: সাড়ে ৭ তোলা সোনা থাকলে কি কোরবানি দিতে হবে?

উত্তর: হ্যাঁ, সাড়ে ৭ তোলা সোনা বা তার সমমূল্যের (প্রায় ৪ লাখ টাকা বা তার বেশি) নগদ অর্থ জিলহজ মাসের নির্দিষ্ট দিনে মালিকানায় থাকলে কোরবানি দেওয়া আবশ্যক।

প্রশ্ন: ঋণী ব্যক্তির ওপর কি কোরবানি ওয়াজিব?

উত্তর: যদি ঋণ পরিশোধ করার পর উদ্বৃত্ত সম্পদ নিসাব পরিমাণ না থাকে, তবে সেই ব্যক্তির ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়।

প্রশ্ন: মুসাফির বা ভ্রমণকারীর ওপর কি কোরবানি ওয়াজিব?

উত্তর: না, যে ব্যক্তি কমপক্ষে ৪৮ মাইল সফরের নিয়তে নিজ এলাকা ত্যাগ করেছে, তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়।

প্রশ্ন: নাবালেগ বা শিশু যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয় তবে তার বিধান কী?

উত্তর: নাবালেগ শিশু বা পাগলের ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়, তবে অভিভাবক চাইলে তাদের পক্ষ থেকে কোরবানি দিতে পারেন।

প্রশ্ন: কোরবানি না দিলে কি গুনাহ হয়?

উত্তর: যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব, তিনি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে তা আদায় না করেন, তবে ওয়াজিব তরকের কারণে তিনি গুনাহগার হবেন।

প্রশ্ন: পরিবারের সবার পক্ষ থেকে কি একটি কোরবানি যথেষ্ট?

উত্তর: না, পরিবারের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক সদস্য যারা পৃথকভাবে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক, তাদের প্রত্যেকের ওপর আলাদাভাবে কোরবানি ওয়াজিব।

প্রশ্ন: রুপার নিসাব কেন ধরা হয়?

উত্তর: গরিবদের উপকারের কথা চিন্তা করে রুপার নিসাবকে (নিম্নতম নিসাব) মানদণ্ড ধরা হয়, যাতে বেশি মানুষ কোরবানির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

প্রশ্ন: ব্যবসা বা প্রাইজবন্ডের টাকা কি কোরবানির নিসাবে গণ্য হবে?

উত্তর: হ্যাঁ, নগদ টাকা, ব্যবসার পণ্য, প্রাইজবন্ড এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত যেকোনো সম্পদ কোরবানির নিসাবে যুক্ত হবে।

প্রশ্ন: কোরবানি করার সঠিক সময় কোনটি?

উত্তর: ১০ই জিলহজ ঈদের নামাজের পর থেকে ১২ই জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোরবানি করা যায়।

প্রশ্ন: ১০ই জিলহজ মুসাফির ছিলাম কিন্তু ১২ই জিলহজ মুকিম হয়েছি, বিধান কী?

উত্তর: কোরবানির তিন দিনের শেষ সময়ে যদি কেউ মুকিম (নিজ এলাকায় অবস্থানকারী) থাকে এবং নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়, তবে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে।

প্রশ্ন: কোরবানি কি কেবল টাকা থাকলেই দিতে হবে?

উত্তর: কেবল নগদ টাকা নয়, বরং সোনা, রুপা, ব্যবসার মাল এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ মিলিয়ে নিসাব পূর্ণ হলেও কোরবানি দিতে হবে।

প্রশ্ন: রুপার নিসাব অনুযায়ী সর্বনিম্ন কত টাকা থাকলে কোরবানি আবশ্যক?

উত্তর: রুপার বাজারদর অনুযায়ী সর্বনিম্ন প্রায় ৪৮,৯৮২ টাকা থেকে ৭৯,৫৯০ টাকার (মানভেদে) মালিক হলে কোরবানি ওয়াজিব হতে পারে।

এসআর