ঋণের পরিমাণ ও নেসাব যাচাই (Verification of Debt and Nisab)
কোনো ব্যক্তি ঋণগ্রস্ত হলে তাকে প্রথমে দেখতে হবে ঋণের পরিমাণ কত। ঋণ পরিশোধ করার পর যদি তার কাছে থাকা সম্পদ নেসাব পরিমাণ (Nisab amount) থাকে, তবেই তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে। এক্ষেত্রে দুটি বিষয় লক্ষণীয়:
নেসাবের নিচে সম্পদ: যদি ঋণ পরিশোধ করে দিলে কোরবানির নির্দিষ্ট সময়ে (১০, ১১ ও ১২ জিলহজ্ব) ব্যক্তির কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকে, তবে তার জন্য কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব নয়।
নেসাবের উপরে সম্পদ: যদি ঋণ পরিশোধ করার পরেও কোরবানির দিনগুলোতে নেসাব পরিমাণ অতিরিক্ত সম্পদ অবশিষ্ট থাকে, তবে ওই ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির জন্যও কোরবানি করা আবশ্যক বা ওয়াজিব।
আরও পড়ুন:
কোরবানির নেসাব ও সময়সীমা (Qurbani Nisab and Duration)
মনে রাখতে হবে, জাকাতের মতো কোরবানির সম্পদের ওপর এক বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত নয়। বরং জিলহজ্ব মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যান্তের আগে যদি কোনো ব্যক্তি পারিবারিক প্রয়োজনীয় খরচ ও ঋণ মেটানোর পর নেসাব পরিমাণ মালের মালিক হন, তবে তাকে কোরবানি দিতে হবে।
ইসলামি বিধান অনুযায়ী সম্পদের নেসাব হলো:
- সাড়ে ৭ ভরি স্বর্ণ (7.5 Tola Gold)।
- সাড়ে ৫২ ভরি রুপা (52.5 Tola Silver)।
অথবা এই পরিমাণ স্বর্ণ বা রুপার বাজার দর অনুযায়ী নগদ টাকা বা সম্পদ (যেমন ৫০ হাজার থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে)।
সুতরাং আপনার কাছে যদি বাৎসরিক পারিবারিক খরচ ও ঋণের টাকা আলাদা করার পর ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ্ব তারিখে উপরোক্ত পরিমাণ সম্পদ থাকে, তবে আপনি ঋণগ্রস্ত হওয়া সত্ত্বেও কোরবানি করা আপনার জন্য বাধ্যতামূলক। অন্যথায় কোরবানি না দিলে গোনাহগার হতে হবে।
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহর সকল নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিককে সহিহ নিয়তে কোরবানি করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
আরও পড়ুন:
বিষয়
বিস্তারিত বিবরণ
কোরবানির নেসাব
সাড়ে ৭ ভরি স্বর্ণ অথবা সাড়ে ৫২ ভরি রুপা বা এর সমমূল্যের নগদ টাকা/সম্পদ।
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির বিধান-১
ঋণ পরিশোধের পর নেসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকলে কোরবানি ওয়াজিব নয়।
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির বিধান-২
ঋণ পরিশোধের পরও নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে কোরবানি দেওয়া আবশ্যক।
প্রযোজ্য সময়কাল
১০, ১১ ও ১২ জিলহজ্ব তারিখের মধ্যে নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা।
সম্পদের হিসাব
ঋণ ও বাৎসরিক পারিবারিক খরচ মেটানোর পর অতিরিক্ত অর্থ বা সম্পদ।
ঋণ থাকলে কোরবানি দেওয়া যাবে কি না এ সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও উত্তর -FAQ
প্রশ্ন: ঋণ থাকলে কি কোরবানি দেওয়া জায়েজ?
উত্তর: হ্যাঁ, ঋণ থাকলে কোরবানি দেওয়া জায়েজ, যদি ঋণ পরিশোধের পর আপনার কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট থাকে।
প্রশ্ন: কত টাকা ঋণ থাকলে কোরবানি দেওয়া যাবে না?
উত্তর: ঋণের নির্দিষ্ট কোনো অংক নেই; বরং আপনার মোট সম্পদ থেকে ঋণের টাকা বিয়োগ করার পর যদি তা নেসাব (সাড়ে ৫২ ভরি রুপার মূল্য) এর নিচে নেমে যায়, তবে কোরবানি ওয়াজিব হবে না।
প্রশ্ন: ব্যাংক লোন বা কিস্তি থাকা অবস্থায় কি কোরবানি হবে?
উত্তর: আপনার ওপর যদি দীর্ঘমেয়াদী ব্যাংক লোন বা কিস্তি থাকে, তবে সেই ঋণের টাকা বাদ দিয়ে যদি বর্তমানে নেসাব পরিমাণ অর্থ হাতে থাকে, তবে কোরবানি দিতে পারবেন।
প্রশ্ন: কোরবানি দেওয়া কি সবার জন্য বাধ্যতামূলক?
উত্তর: না, কোরবানি সবার জন্য বাধ্যতামূলক নয়; কেবল জিলহজ্ব মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিকের ওপর এটি ওয়াজিব।
প্রশ্ন: ঋণের টাকা দিয়ে কি কোরবানি দেওয়া যায়?
উত্তর: কারও কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ নেই, কিন্তু তিনি ঋণ করে কোরবানি দিতে চান—এমনটি করা বাধ্যতামূলক নয়, তবে দিলে কোরবানি আদায় হয়ে যাবে।
প্রশ্ন: ব্যবসায়িক ঋণ থাকলে কোরবানির বিধান কী?
উত্তর: ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বড় অংকের ঋণ থাকলেও যদি ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ্বে আপনার কাছে ঋণ ও পারিবারিক খরচ বাদে সাড়ে ৭ ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে ৫২ ভরি রুপার সমমূল্যের সম্পদ থাকে, তবে কোরবানি দিতে হবে।
প্রশ্ন: ঋণ পরিশোধ করা উত্তম নাকি কোরবানি দেওয়া?
উত্তর: ঋণ যদি জরুরি বা তাৎক্ষণিক পরিশোধযোগ্য হয় এবং তা দিলে কোরবানির সামর্থ্য না থাকে, তবে ঋণ পরিশোধ করাই উত্তম।
প্রশ্ন: স্বর্ণ বা রুপার নেসাব অনুযায়ী কোরবানির পরিমাণ কত?
উত্তর: সাড়ে ৭ ভরি স্বর্ণ অথবা সাড়ে ৫২ ভরি রুপার বাজার মূল্য অনুযায়ী সাধারণত ৫০ হাজার থেকে ৪ লাখ টাকার মধ্যে অতিরিক্ত সম্পদ থাকলে কোরবানি ওয়াজিব হয়।
প্রশ্ন: যাকাত আর কোরবানির নেসাব কি একই?
উত্তর: হ্যাঁ, যাকাত ও কোরবানির নেসাব একই (সাড়ে ৫২ ভরি রুপা), তবে যাকাতের ক্ষেত্রে সম্পদ এক বছর হাতে থাকা শর্ত, কিন্তু কোরবানির ক্ষেত্রে কেবল ওই তিন দিন নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলেই হয়।
প্রশ্ন: পরিবারের সবাই ঋণগ্রস্ত হলে কোরবানি কে দেবে?
উত্তর: পরিবারের যে সদস্যের নামে নেসাব পরিমাণ সম্পদ আছে, কেবল তার ওপরই কোরবানি ওয়াজিব হবে, বাকিদের ওপর নয়।
প্রশ্ন: ধার করা টাকা দিয়ে কোরবানি দিলে কি সওয়াব হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, ধার করা টাকা দিয়ে কোরবানি দিলে সওয়াব পাওয়া যাবে, তবে সামর্থ্য না থাকলে ধার করে কোরবানি দেওয়ার জন্য ইসলাম চাপ দেয় না।
প্রশ্ন: কোরবানি না দিলে কি গুনাহ হবে?
উত্তর: সামর্থ্য থাকার পর (নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েও) যদি কেউ কোরবানি না দেয়, তবে সে গুনাহগার হবে।
প্রশ্ন: নেসাব পরিমাণ সম্পদ সারাবছর থাকা কি জরুরি?
উত্তর: না, কোরবানির দিনগুলোতে (১০-১২ জিলহজ্ব) নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলেই কোরবানি ওয়াজিব হবে।
প্রশ্ন: কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার জন্য ন্যূনতম নগদ টাকা কত লাগবে?
উত্তর: এটি রুপার বাজার দরের ওপর নির্ভর করে; বর্তমানে সাড়ে ৫২ ভরি রুপার দাম যত হবে, তত টাকা থাকলেই কোরবানি ওয়াজিব।
প্রশ্ন: কেউ ঋণগ্রস্ত অবস্থায় মারা গেলে তার পক্ষ থেকে কোরবানি দেওয়া যাবে?
উত্তর: মৃত ব্যক্তি যদি ওসিয়ত করে যান এবং তার রেখে যাওয়া সম্পদ থেকে ঋণ পরিশোধের পর টাকা থাকে, তবে তার পক্ষ থেকে কোরবানি দেওয়া যেতে পারে।


