ভোট বন্ধে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা: আইনি বিবর্তন ও বর্তমান চিত্র
১. ২০২৫ সালের নতুন সংশোধনীর প্রভাব (Impact of 2025 Amendment)
২০২৩ সালের সংশোধনীর মাধ্যমে ইসির ক্ষমতাকে শুধুমাত্র ‘ভোটের দিন’ এবং ‘নির্দিষ্ট কেন্দ্র’ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে হওয়া সর্বশেষ সংশোধনীতে সেই ক্ষমতা ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন নির্বাচন কমিশন চাইলে তফসিল ঘোষণা থেকে শুরু করে গেজেট প্রকাশ পর্যন্ত যেকোনো সময় কারচুপি বা সহিংসতার আশঙ্কায় পুরো নির্বাচনি এলাকার (Entire Constituency) ভোট বন্ধ করতে পারে।
আরও পড়ুন:
২. যে পরিস্থিতিতে ভোট বন্ধ হতে পারে (Situations for Poll Suspension)
সহিংসতা ও গোলযোগ (Violence and Turmoil): নির্বাচনি এলাকায় যদি এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যেখানে শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ অসম্ভব।
ব্যাপক কারচুপি (Massive Rigging): যদি দেখা যায় যে ব্যালট পেপার ছিনতাই, জালিয়াতি বা পেশীশক্তির মাধ্যমে ভোটের ফলাফল প্রভাবিত হচ্ছে।
প্রার্থীর মৃত্যু (Death of a Candidate): প্রতীক বরাদ্দের পর কোনো বৈধ প্রার্থীর মৃত্যু হলে ওই আসনের ভোট স্থগিত করা হয়।
আদালতের নির্দেশনা (Court Orders): সীমানা সংক্রান্ত জটিলতা বা প্রার্থীর যোগ্যতা নিয়ে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকলে।
আরও পড়ুন:
ইসির হাতে একচ্ছত্র ক্ষমতা: যখন-তখন বাতিল হতে পারে সংসদ নির্বাচন
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনার মূল চাবিকাঠি হলো গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিও (Representation of the People Order - RPO)। দীর্ঘ আইনি বিবর্তন ও ২০২৩ সালের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ২০২৫ সালের ৮ই ডিসেম্বর প্রকাশিত নতুন গেজেট অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী।
১. আরপিও ৯১ (ক) ধারার নতুন ক্ষমতা (RPO 91A New Powers)
২০২৩ সালের সংশোধনীতে ইসির ক্ষমতাকে সংকুচিত করে শুধুমাত্র ‘ভোটের দিন’ (Polling Day) নির্দিষ্ট কেন্দ্র বাতিলের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের নতুন সংশোধনীর ফলে এখন সহিংসতা বা অনিয়মের প্রমাণ পেলে ইসি তফসিল ঘোষণার পর থেকে যে কোনো পর্যায়ে (At any stage of election) পুরো আসনের নির্বাচন বন্ধ করে দিতে পারবে।
২. ভোট বন্ধের সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতি (Reasons for Stopping Polls)
নির্বাচনি সহিংসতা (Electoral Violence): প্রচারণার সময় বা ভোটের আগে যদি এমন সংঘাত শুরু হয় যেখানে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখা অসম্ভব।
বিঘ্নিত ভোট প্রক্রিয়া (Disrupted Voting Process): বলপ্রয়োগ, ভীতি প্রদর্শন বা জাল ভোটের মাধ্যমে প্রক্রিয়াটি কলুষিত হলে।
ফল বাতিল (Result Cancellation): ভোট শেষ হওয়ার পরেও যদি গুরুতর কারচুপির প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে গেজেট হওয়ার আগে পুরো আসনের ফল বাতিল করার ক্ষমতা এখন ইসির হাতে।
আরও পড়ুন:
আরও পড়ুন:
ভোট বাতিল না স্থগিত? নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতার আদ্যোপান্ত
নির্বাচন মানেই উৎসব, কিন্তু অনিয়ম বা বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে সেই উৎসব বিষাদে রূপ নিতে পারে। ২০২৫ সালের সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ বা আরপিও অনুযায়ী, নির্বাচনের দিন বা তার আগে যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কঠোর ক্ষমতা দেয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের।
১. ভোট বাতিল কখন হয়? (When is a vote cancelled?)
সাবেক নির্বাচন কমিশনার জেসমিন টুলির মতে, যদি কোনো ভোটকেন্দ্র প্রিজাইডিং অফিসারের (Presiding Officer) নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়—যেমন ব্যালট পেপার ছিনতাই (Ballot paper hijacking) বা ব্যালট বক্সে অবৈধ সিল মারা—তবে প্রিজাইডিং অফিসার তাৎক্ষণিকভাবে ভোট বন্ধ বা বাতিল করতে পারেন। এমনকি অফিসার নিজে ব্যবস্থা না নিলে ইসি সিসিটিভি ফুটেজ বা নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে তথ্য পেয়ে রিটার্নিং অফিসারকে (Returning Officer) কেন্দ্র বন্ধের নির্দেশ দিতে পারে।
২. পুরো আসনের ভোট বন্ধের ক্ষমতা (Power to stop election in an entire constituency)
যদি একটি আসনের অধিকাংশ কেন্দ্রে অনিয়ম হয় বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে ভোটাররা কেন্দ্রে আসতে পারছেন না, তবে নির্বাচন কমিশন পুরো আসনের ভোট বাতিল করতে পারে। এক্ষেত্রে কমিশনের নিজস্ব তদন্তে সত্যতা নিশ্চিত হতে হয়। এছাড়া কোনো রিটার্নিং অফিসারের পক্ষপাতিত্বের (Partiality of Returning Officer) প্রমাণ পেলেও ইসি কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে।
৩. ভোট স্থগিত ও সাময়িক বিরতি (Suspension of polling and temporary break)
ভোট চলাকালীন সাময়িক বিশৃঙ্খলা, যেমন ককটেল বিস্ফোরণ (Cocktail blast) বা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হলে যদি ব্যালট বক্স নিরাপদ থাকে, তবে প্রিজাইডিং অফিসার ভোটগ্রহণ ‘স্থগিত’ (Postpone/Suspend) করতে পারেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পুনরায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়।
আরও পড়ুন:
ভোট বন্ধের ইতিহাস: গাইবান্ধা থেকে ওয়ান-ইলেভেনের স্মৃতি
বাংলাদেশের নির্বাচনি মানচিত্রে কেন্দ্র বা আসনভিত্তিক ভোট বন্ধের ঘটনা খুব একটা বিরল নয়। তবে পুরো একটি সংসদীয় আসনের ভোট বাতিল করার মতো সাহসী পদক্ষেপ প্রথম দেখা গিয়েছিল ২০২২ সালে।
১. গাইবান্ধা-৫ উপ-নির্বাচন ও ক্ষমতার পালাবদল (Gaibandha-5 By-election & Power Shift)
২০২২ সালে গাইবান্ধা-৫ আসনের উপ-নির্বাচনে সিসিটিভি ক্যামেরায় (CCTV monitoring) ব্যাপক কারচুপির দৃশ্য দেখে পুরো আসনের ভোট বাতিল করে দেয় তৎকালীন কমিশন। এটিই ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম পুরো আসনের ভোট বাতিলের ঘটনা। তবে এর ফলে রাজনৈতিক চাপের মুখে ২০২৩ সালে আরপিও সংশোধন করে ইসির এই ক্ষমতা কিছুটা কমিয়ে দেয়া হয়েছিল, যা ২০২৫ সালে পুনরায় সংস্কার করা হয়েছে।
২. ওয়ান-ইলেভেন ও জাতীয় নির্বাচন স্থগিত (One-Eleven & National Election Suspension)
২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারি অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন স্থগিত হওয়ার ঘটনাটি ছিল ঐতিহাসিক। তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও জরুরি অবস্থা (Emergency State) জারির কারণে ইসি নয়, বরং সাংবিধানিক বিধি অনুযায়ী নির্বাচন স্থগিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ১ কোটি ৫০ লাখ ভুয়া ভোটার (15 million fake voters) শনাক্ত হওয়ার পর বায়োমেট্রিক ভোটার তালিকা প্রণয়ন করা হয়।
৩. স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নজির (Precedent in Local Government Elections)
২০০২ সালে ভোলার দৌলতখান পৌরসভা নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ের পেছনে অস্ত্র ও টাকার প্রভাব প্রমাণিত হওয়ায় পুরো নির্বাচন বাতিল করেছিলেন তৎকালীন সিইসি।
আরও পড়ুন:
নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার: স্বচ্ছ নির্বাচনের পথে নতুন আশার আলো
২০২৩ সালে তৎকালীন সরকারের করা আরপিও সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা সীমিত করার যে অভিযোগ উঠেছিল, ২০২৫ সালের নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে তার অবসান ঘটেছে। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার ড. এম সাখাওয়াত হোসেনের মতে, আগের সংশোধনীতে ইসির হাত-পা বেঁধে দেয়া হয়েছিল, যা এখন মুক্ত হয়েছে।
১. ক্ষমতার পূর্ণ প্রত্যাবর্তন (Full Restoration of Power)
সাবেক নির্বাচন কমিশনার জেসমিন টুলির মতে, নতুন সংশোধনীতে ইসিকে ‘যেকোনো পর্যায়ে’ নির্বাচন বন্ধ করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। এর মানে হলো, তফসিল থেকে শুরু করে গেজেট প্রকাশ পর্যন্ত যেকোনো সময় অনিয়ম ধরা পড়লে ইসি কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারবে। আইনের এই পরিবর্তনকে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা ‘পূর্বের শক্তিশালী অবস্থায় ফিরে যাওয়া’ (Returning to previous strong status) হিসেবে অভিহিত করেছেন।
২. আসনভিত্তিক ক্ষমতা ও জাতীয় প্রভাব (Constituency Power & National Impact)
আইনে যদিও ‘বিভিন্ন নির্বাচনি আসন’ (Various constituencies) কথাটি উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, আসনগুলো মিলেই পুরো দেশ গঠিত। তাই ইসি এখন চাইলে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় একাধিক বা সব আসনের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের (Election System Reform Commission) সদস্য ড. মোহাম্মদ আব্দুল আলীম মনে করেন, এই পরিবর্তনের ফলে নির্বাচন কমিশনের আইনি সক্ষমতা বহুগুণ বেড়েছে।
আরও পড়ুন:





