১২ ফেব্রুয়ারি গণভোট: ‘হ্যাঁ’ জিতলে কি বদলে যাচ্ছে আপনার নাগরিক পরিচয়?
- জাতীয় পরিচয় ও ভাষা: পরিচয় হবে 'বাংলাদেশি'। বাংলার সাথে সব মাতৃভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি।
- প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা: এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদে (১০ বছর) প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন; প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা হ্রাস।
- সংসদীয় কাঠামো: দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ (উচ্চকক্ষ ১০০ আসন ও নিম্নকক্ষ); ডেপুটি স্পিকার হবেন বিরোধী দল থেকে।
- নির্বাচন ও ইসি: তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা স্থায়ী করা; সর্বদলীয় কমিটির মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠন।
- মৌলিক অধিকার: নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষাকে মৌলিক অধিকার ঘোষণা।
- রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা: গোপন ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন; ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সম্মতি ছাড়া অপরাধীকে ক্ষমা করা যাবে না।
- বিচার বিভাগ: সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল শক্তিশালীকরণ ও বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
- সংবিধান সংশোধন: গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ ও তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা পরিবর্তনে গণভোট বাধ্যতামূলক।
- জরুরি অবস্থা: জারি করতে মন্ত্রিসভার অনুমোদন ও বিরোধী দলীয় নেতার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।
- নিয়োগ ও প্রশাসন: স্পিকারের নেতৃত্বে কমিটির মাধ্যমে ন্যায়পাল, দুদক ও পিএসসি প্রধান নিয়োগ।
আরও পড়ুন:
জাতীয় পরিচয় ও রাষ্ট্রভাষা (National Identity & State Language)
বিদ্যমান সংবিধানে কেবল বাঙালির কথা বলা হলেও, নতুন সংস্কার অনুযায়ী নাগরিকদের পরিচয় হবে বাংলাদেশি (Bangladeshi)। এছাড়া রাষ্ট্রভাষা বাংলা হওয়ার পাশাপাশি সব মাতৃভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি (Recognition of Mother Tongues) দেওয়া হবে।
দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ও প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ (Bicameral Parliament & PM Tenure)
জুলাই সনদের সবচেয়ে বড় চমক হলো দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ (Bicameral Parliament) ব্যবস্থা। ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। এছাড়া কোনো ব্যক্তি এক জীবনে দুই মেয়াদের বেশি (Max 2 Terms) প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। এই প্রস্তাবে কয়েকটি দলের ভিন্নমত (Note of Dissent) থাকলেও গণভোটে পাশ হলে এটি স্থায়ী আইন হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন (Caretaker Government & EC)
সংবিধানে আবারও তত্ত্বাবধায়ক সরকার (Caretaker Government) ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে ফিরিয়ে আনা হবে। নির্বাচন কমিশন (Election Commission) গঠনেও প্রধানমন্ত্রীর একক কর্তৃত্ব থাকবে না; বরং স্পিকারের সভাপতিত্বে সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি কমিশনারদের নিয়োগ দেবে।
আরও পড়ুন:
মৌলিক অধিকার ও ইন্টারনেট (Fundamental Rights & Internet)
বর্তমান সংবিধানে ২২টি মৌলিক অধিকার থাকলেও জুলাই সনদে নতুন করে যুক্ত হচ্ছে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট (Uninterrupted Internet) এবং ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা (Data Privacy)। এছাড়া জরুরি অবস্থা (Emergency State) জারির ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতার বদলে মন্ত্রিসভা ও বিরোধী দলের নেতার পরামর্শ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও অপরাধীকে ক্ষমা (President’s Power & Clemency)
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে গোপন ব্যালট (Secret Ballot) পদ্ধতি চালু হবে। আগে রাষ্ট্রপতি একক সিদ্ধান্তে অপরাধীকে ক্ষমা করতে পারতেন, কিন্তু নতুন সনদে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সম্মতি (Consent of Victim’s Family) ছাড়া ক্ষমা করা যাবে না।
জুলাই সনদ: গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবসমূহ একনজরে
সংস্কারের ধরন
সংখ্যা
বাস্তবায়ন পদ্ধতি
সাংবিধানিক সংস্কার
৪৭টি
গণভোট ও সংসদীয় সংশোধনী
আইনগত ও নির্বাহী সংস্কার
৩৭টি
অধ্যাদেশ, বিধি ও নির্বাহী আদেশ
মোট প্রস্তাবনা
৮৪টি
জুলাই সনদ ২০২৬
আরও পড়ুন:
'জুলাই সনদ'-এর আওতায় প্রস্তাবিত ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের পূর্ণাঙ্গ তালিকা
'জুলাই সনদ'-এর আওতায় প্রস্তাবিত ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব মূলত রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের একটি মহাপরিকল্পনা। এর মধ্যে ৪৭টি সাংবিধানিক এবং ৩৭টি আইনগত ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবগুলো নিচে বিভাগ অনুযায়ী দেওয়া হলো:
১. সাংবিধানিক সংস্কার (৪৭টি প্রস্তাবের মূল সারাংশ)
ক্রমিক
বিষয় (Subject)
প্রস্তাবিত পরিবর্তন (Proposed Change)
১-৫
জাতীয় পরিচয় ও ভাষা
নাগরিকদের পরিচয় হবে 'বাংলাদেশি'। বাংলার পাশাপাশি সব ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মাতৃভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতি।
৬-১০
রাষ্ট্রীয় মূলনীতি
বাঙালি জাতীয়তাবাদের বদলে মূলনীতি হবে— সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি।
১১-১৪
মৌলিক অধিকার
নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা (Data Privacy) মৌলিক অধিকার হিসেবে যুক্ত হবে।
১৫-১৭
প্রধানমন্ত্রী
এক ব্যক্তি এক জীবনে ২ মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। প্রধানমন্ত্রী একইসাথে দলীয় পদে থাকতে পারবেন না।
১৮-২০
সংসদ কাঠামো
সংসদ হবে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট। উচ্চকক্ষ (১০০ সদস্য) এবং নিম্নকক্ষ (৩০০+ সদস্য)। সংরক্ষিত নারী আসন ১০০-তে উন্নীত করা।
২১-২৪
তত্ত্বাবধায়ক সরকার
সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার (Caretaker Govt) ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে পুনর্বহাল করা।
২৫-২৮
রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা
গোপন ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সম্মতি ছাড়া রাষ্ট্রপতি কাউকে ক্ষমা করতে পারবেন না।
২৯-৩২
অনুচ্ছেদ ৭০ সংশোধন
বাজেট ও অনাস্থা প্রস্তাব ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে এমপিরা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন।
৩৩-৩৫
জরুরি অবস্থা
জরুরি অবস্থা জারি করতে মন্ত্রিসভার অনুমোদন ও বিরোধী দলীয় নেতার উপস্থিতি বাধ্যতামূলক।
৩৬-৩৯
বিচার বিভাগ
বিচার বিভাগকে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিশনের মাধ্যমে হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগ।
৪০-৪২
সংবিধান সংশোধন
প্রস্তাবনা ও মৌলিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ সংশোধনে গণভোট বাধ্যতামূলক করা।
৪৩-৪৫
নির্বাচন কমিশন
স্পিকারের নেতৃত্বে সরকারি ও বিরোধী দলের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে ইসি গঠন।
৪৬-৪৭
নিয়োগ ও অভিশংসন
রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ উভয়ের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট লাগবে।
আরও পড়ুন:
২. আইনগত ও নির্বাহী সংস্কার (৩৭টি প্রস্তাবের মূল সারাংশ)
ক্রমিক
বিষয় (Subject)
প্রস্তাবিত পরিবর্তন (Proposed Change)
৪৮-৫২
ন্যায়পাল নিয়োগ
সংবিধানে থাকলেও কখনো নিয়োগ না হওয়া 'ন্যায়পাল' (Ombudsman) নিয়োগ হবে বিশেষ সার্চ কমিটির মাধ্যমে।
৫৩-৫৬
দুর্নীতি দমন কমিশন
দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগে প্রধানমন্ত্রীর একক ক্ষমতা খর্ব করে নিরপেক্ষ বাছাই কমিটি গঠন।
৫৭-৬০
গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশ
প্রেস কাউন্সিল ও তথ্য কমিশনকে শক্তিশালী করা। সকল প্রকার কালাকানুন বাতিল করে সংবাদপত্রের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ।
৬১-৬৫
মানবাধিকার কমিশন
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে একটি পূর্ণাঙ্গ স্বাধীন ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা।
৬৬-৭০
প্রশাসনিক সংস্কার
সিভিল সার্ভিসে দলীয় প্রভাব মুক্ত রাখা এবং কেবল মেধার ভিত্তিতে পদায়ন ও প্রমোশন নিশ্চিত করা।
৭১-৭৫
স্থানীয় সরকার
জেলা ও উপজেলা পরিষদকে আরও শক্তিশালী করা এবং স্থানীয় বাজেটের ওপর স্থানীয় প্রতিনিধিদের পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রদান।
৭৬-৮০
অর্থনৈতিক সংস্কার
বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা এবং জাতীয় বাজেট প্রণয়নে সংসদের স্থায়ী কমিটিগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ।
৮১-৮৪
সীমানা নির্ধারণ
সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণে নির্বাচন কমিশনের একক কর্তৃত্বের বদলে বিশেষজ্ঞ কমিটির সাথে সমন্বয়।
আরও পড়ুন:





