টানা বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের সুরমা, যাদুকাটা, বৌলাই, রক্তি ও পাটলাই নদীর পানি বাড়ছে। শুক্রবার সকালে সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৫০ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, ভারতের চেরাপুঞ্জিতে বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। এরইমধ্যে আশ্রয়কেন্দ্র, মেডিকেল টিম, স্বেচ্ছাসেবক ও কন্ট্রোল রুম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
হবিগঞ্জে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। খোয়াই নদীর বাঁধ ভেঙে অন্তত ২৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন ৩০ হাজারের বেশি মানুষ। অন্যদিকে কুমিল্লায় গোমতী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় চরাঞ্চলের বিস্তীর্ণ সবজি ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষকদের আশঙ্কা, এবারের মৌসুমি আবাদে বড় ধরনের লোকসান হবে।
মৌলভীবাজারে মনু নদীর পানি চাঁদনীঘাট পয়েন্টে বিপদসীমার বেশ ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। রাজনগরের উজিরপুর এলাকায় প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে অন্তত ১০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। কমলগঞ্জেও ঢলের পানি ঢুকে কয়েকটি গ্রাম পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। এপর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৮ হাজার ৫৩০ হেক্টর জমির আউশ ধান।
আরও পড়ুন:
স্থানীয়দের মধ্যে একজন বলেন, ‘পাহাড়ি এলাকায় কাজ হইছে আর ও যে যে জায়গা প্রত্যেক বছর ভাঙ্গে, এই জায়গাটার প্রতি কেউ দৃষ্টি রাখে না।’
পার্বত্য অঞ্চলেও দুর্যোগের প্রভাব অব্যাহত রয়েছে। রাঙামাটিতে সাত উপজেলায় গত কয়েকদিনে ১২৫টি পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। কাপ্তাই হ্রদের পানি বেড়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। ৪০টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন চার হাজারের বেশি মানুষ। সাজেকে দু’দিন ধরে আটকা পড়া ৫৬১ জন পর্যটকের মধ্যে শুক্রবার আরও ৩১১ জন গন্তব্যে ফিরে গেছেন।
তবে শতাধিক পর্যটক এখনও সাজেকে আটকা রয়েছেন। বান্দরবানে পানি কিছুটা কমলেও সাঙ্গু, মাতামুহুরি ও বাঁকখালী নদীর পানি এখনও বিপদসীমার ওপরে। অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক স্বাভাবিক হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে পৌর এলাকার আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন অন্তত ৫ হাজার মানুষ।
সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি কক্সবাজারে। জেলার অন্তত ৩৫টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। গত চার দিনে পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে রোহিঙ্গাসহ ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। পেকুয়ায় মাতামুহুরি নদীর বেড়িবাঁধ ভেঙে নতুন নতুন এলাকায় পানি ঢুকছে। ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ চলছে।
রামুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জিল্লুর রহমান বলেন, ‘উপজেলায় আসলে তো গত এক সপ্তাহ ধরে মানে প্রতিদিনই বৃষ্টি, অতি মাত্রায় বৃষ্টি হচ্ছে। এই কারণে রামুর প্রায় সবগুলা ইউনিয়নই বন্যায় আক্রান্ত।’
আরও পড়ুন:
পটুয়াখালী ও বরগুনাতেও ঝড়ো হাওয়া ও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বেড়েছে ভাঙনের আশঙ্কা। বৈরী আবহাওয়ায় সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন হাজারো জেলে। বরগুনার উপকূলে ট্রলারডুবির ঘটনায় এখনও নিখোঁজ রয়েছেন দুই জেলে।
স্থানীয়দের মধ্যে একজন বলেন, ‘হঠাৎ করে সাগরের এই আবহাওয়া খারাপ হইয়া গেলো, আইতে আইতে একটা এক্সিডেন্ট হয়ে গেছে। বঙ্গোপসাগরের জাল বাজা গাঁত নিয়া আমরা ওই কোম্পানির কাছে বুঝ দিতে পারি না।’
নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়াতেও টানা বর্ষণ ও অস্বাভাবিক জোয়ারে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। জোয়ারের পানিতে উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। তমরদ্দি, সুখচর, জাহাজমারা ও নলচিরাসহ বিভিন্ন এলাকায় বসতঘর, রাস্তাঘাট, মাছের ঘের ও কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে গেছে।
প্লাবিত হয়েছে নিঝুম দ্বীপসহ মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন একাধিক চরাঞ্চল। ফসল, মাছের ঘের ও কাঁচা ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পাশাপাশি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন নিম্নআয়ের মানুষ। তবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় উপজেলা প্রশাসনের ১১টি পৃথক টিম জরুরি খাদ্য সহায়তা নিয়ে কাজ করছে।
তবে দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কোনো শঙ্কা নেই বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। এরইমধ্যে কমতে শুরু করেছে পাঁচটি নদীর পানি। বৃষ্টিপাত কমার সঙ্গে সঙ্গে নদীর পানিও কমে গিয়ে আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতিরও উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন আবহাওয়া অফিসের কর্মকর্তারা।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী পার্থ প্রতীম বড়ুয়া বলেন, ‘পাঁচটা নদীর ৯টা পানি সমতল স্টেশন বর্তমানে বিপদসীমার ওপরে অবস্থান করছে। এই নদীগুলো হলো আমার মূলত বান্দরবান এবং কক্সবাজার জেলার সাঙ্গু এবং মাতামুহুরী নদী, মৌলভীবাজার এবং হবিগঞ্জ জেলার মনু, খোয়াই নদী এবং সেই সঙ্গে কুশিয়ারা নদীর দুইটা পয়েন্টে বর্তমানে বিপদসীমার ওপরে অবস্থান করছে। সামগ্রিকভাবে পানি সমতল হ্রাস পেয়েছে, যদিও এখনো ওইসব অঞ্চলে এখনো বৃষ্টিপাত হচ্ছে এবং আবহাওয়া অফিস থেকে যে আমরা যে তথ্য পেয়েছি যে অতি ভারী বৃষ্টিপাতের প্রবণতা অনেকটা অনেকটাই কমে এসেছে।’




