হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমাতে চায় ওয়াশিংটন, বাস্তবতা কী বলছে?

হরমুজ প্রণালি
হরমুজ প্রণালি | ছবি: রয়টার্স
0

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সাম্প্রতিক বক্তব্যের পর বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের ভবিষ্যৎ নিয়ে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালি। আল জাজিরার বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

শনিবার ফক্স নিউজে প্রচারিত এক সাক্ষাৎকারে রুবিও ইঙ্গিত দেন, হরমুজ প্রণালির বাইরে দিয়ে জ্বালানি পরিবহনের পথ খুঁজতে একটি স্থায়ী ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন অত্যাসন্ন। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরান আক্রমণ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ সমুদ্রপথে পরিবহন হওয়া তেল এ প্রণালি দিয়ে যাতায়াত করতো।

রুবিও যুক্তি দেন, এ কৌশলগত জলপথের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসা ইরানকে এখন আঞ্চলিক দেশগুলো একটি সক্রিয় হুমকি হিসেবে দেখছে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি পণ্য পরিবহনের পথ নতুন করে সাজানো জরুরি হয়ে পড়েছে।

তবে অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা সতর্ক করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি মানচিত্র নতুন করে সাজানো লজিস্টিক ও নিরাপত্তা দিক থেকে প্রায় অসম্ভব।

রুবিওর দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপকতা বুঝতে হলে এ জলপথ দিয়ে চলাচল করা পণ্যের পরিমাণের দিকে নজর দিতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের (ইআইএ) তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ৩৯ কিলোমিটার প্রশস্ত এ সরু জলপথ দিয়ে দৈনিক প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন হয়, যা বিশ্বের মোট পেট্রোলিয়াম তরল ব্যবহারের প্রায় ২০ শতাংশ। এছাড়া বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসেরও (এলএনজি) বাণিজ্য এ প্রণালি দিয়েই হয়। এ এলএনজির বেশির ভাগই আসে কাতার থেকে।

অর্থনৈতিক গবেষক আহমেদ আবু কামার আল-জাজিরাকে বলেন, রুবিওর বক্তব্য একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি; তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়নযোগ্য কোনো অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নয়। তার ভাষ্য, জ্বালানি বাজার চাহিদা ও জোগানের কঠিন বাস্তবতায় চলে। এ প্রণালির ওপর নির্ভরতা সামান্য কমাতেও কয়েক দশক সময় এবং শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন।

আবু কামারের মতে, সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রাকৃতিক গ্যাসের ক্ষেত্রে। কারণ, এলএনজি রপ্তানির পুরো ব্যবস্থা—তরলীকরণ প্লান্ট, বিশেষায়িত ট্যাংকার এবং গ্রহণকারী বন্দর—হরমুজ প্রণালির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। তিনি সতর্ক করে বলেন, এ পথ বন্ধ হয়ে গেলে ইউরোপ ও এশিয়ার দেশগুলো বিকল্প গ্যাস সরবরাহের জন্য তুমুল প্রতিযোগিতায় নামতে বাধ্য হবে। এতে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বিশাল আকারে বাড়বে, বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি দেখা দেবে এবং সব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকে জটিল পরিস্থিতিতে পড়তে হবে।

হরমুজ প্রণালিকে এড়িয়ে যেতে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি উৎপাদক দেশগুলো এর আগে বিশাল আন্তদেশীয় পাইপলাইন নির্মাণের ধারণা সামনে এনেছিল। এ কৌশলের অন্যতম বড় প্রকল্প সৌদি আরবের ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ বা পেট্রোলাইন। এটি আবকাইক তেল প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।

সৌদি জ্বালানি মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, যুদ্ধকালীন হামলার ক্ষতি সামলে পাইপলাইনটি সম্প্রতি আবার দৈনিক প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল পাম্প করতে সক্ষম হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ‘আবুধাবি ক্রুড অয়েল পাইপলাইনও’ চালু রয়েছে; যা ওমান উপসাগর তীরবর্তী ফুজাইরাহ বন্দরে দৈনিক ১৮ লাখ ব্যারেল পর্যন্ত তেল সরবরাহ করে। এটিও হরমুজ প্রণালির বাইরে দিয়ে চলে।

তারপরও কাছাকাছি সময়ে হরমুজ প্রণালিকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করা গাণিতিকভাবে অসম্ভব। আল-জাজিরার এক ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে বিদ্যমান বিকল্প পাইপলাইনগুলোর সম্মিলিত সর্বোচ্চ সক্ষমতা দৈনিক প্রায় ৯০ লাখ ব্যারেল, যা প্রণালি দিয়ে যাওয়া ২ কোটি ব্যারেলের তুলনায় খুবই কম। ইআইএর হিসাব অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালিতে হঠাৎ কোনো বিপর্যয় দেখা দিলে সৌদি ও আমিরাতের পাইপলাইনগুলো থেকে দৈনিক মাত্র ২৬ লাখ ব্যারেল অতিরিক্ত সরবরাহ পাওয়া যাবে। আবু কামার প্রশ্ন তোলেন, কুয়েত, কাতার ও ইরাকের মতো বড় উৎপাদক দেশগুলো তাদের বিপুল জ্বালানি এ প্রণালি ছাড়া কীভাবে রপ্তানি করবে।

হরমুজ প্রণালির বদলে লোহিত সাগরের ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর অর্থ হলো, ভূরাজনৈতিক দুর্বলতা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেয়া। সৌদি আরবের ইস্ট-ওয়েস্ট বিকল্প পথটি চালু রাখতে বাব-এল-মান্দেব প্রণালি খোলা রাখা জরুরি। কারণ, লোহিত সাগর হয়ে চীন, জাপান ও ভারতের মতো এশিয়ার বড় বাজারে পৌঁছানোর জন্য জাহাজগুলোকে বাব-এল-মান্দেব প্রণালি দিয়েই যেতে হয়। ইয়ানবু বন্দরে তেল রপ্তানির পথ বদলালে এশিয়ামুখী ট্যাংকারগুলোকে বাব-এল-মান্দেব দিয়ে চলাচল করতে হবে। কিন্তু এ প্রণালি এখন ইয়েমেনের হুথিদের সক্রিয় হুমকির মুখে রয়েছে।

সমুদ্রপথ এড়িয়ে স্থলপথে অবকাঠামো তৈরি করাও নিরাপত্তার দিক থেকে ভয়ংকর ঝুঁকিপূর্ণ। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে স্বাধীন জ্বালানি বিশ্লেষক জর্জ ভোলোশিন উল্লেখ করেছেন, পাইপলাইন ও পাম্পিং স্টেশনগুলো এক জায়গায় স্থির থাকা মূল্যবান লক্ষ্যবস্তু। অতীতেও দেখা গেছে, এসব স্থাপনা ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সহজ শিকার। সমুদ্রপথ থেকে দূরে যাওয়া মানে ঝুঁকিকে কেবল স্থলে সরিয়ে নেয়া।

আবু কামার বলেন, ইরান হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে থেকেও এ স্থল পাইপলাইনগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে এবং ট্যাংকার চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করতে সম্পূর্ণ সক্ষম। বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর আধুনিক ড্রোন যুদ্ধ ঠেকানোর মতো যথেষ্ট সুরক্ষা না থাকায় বৈশ্বিক জ্বালানি কোম্পানিগুলো এসব দুর্বল সম্পদে শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগ করতে দ্বিধায় ভুগছে।

শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমানোর প্রচেষ্টা চলছে ঠিকই, কিন্তু বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের সামনে এর ভৌগোলিক বাস্তবতা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসা এখনো এক অধরা স্বপ্ন।

এএম