জবাবে পুতিন তাকে যুদ্ধে প্রতিটি পশ্চিমা দেশের সংশ্লিষ্টতা ‘বিশ্লেষণ চালিয়ে যাওয়ার’ নির্দেশ দেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসের ছুটির আগে প্রচারিত এই ভিডিওবার্তায় রুশ প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে আমাদের এই বিশ্লেষণ প্রয়োজন হবে।’ ২০২২ সালে ইউক্রেনকে ‘বেসামরিকীকরণের’ পরিকল্পনা নিয়ে যুদ্ধ শুরু করেছিল মস্কো। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
বৈঠকে পুতিন দাবি করেন, তার সেনারা দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কিত পূর্বাঞ্চলীয় শহর কোস্তিয়ানতিনিভকা ‘সম্পূর্ণভাবে মুক্ত করেছে।’ তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই দাবি নাকচ করে বলেছেন, শহরটির নিয়ন্ত্রণ এখনো কিয়েভের হাতে রয়েছে। জেলেনস্কি পুতিনকে সেখানেই বৈঠকে বসে যুদ্ধ শেষ করার ‘কূটনৈতিক সমাধান’ খুঁজে বের করার আহ্বান জানিয়েছেন।
পুতিনের আরও দাবি, চলতি বছর মস্কো ইউক্রেনে ৩ হাজার বর্গকিলোমিটারের (১ হাজার ১৫৮ বর্গমাইল) বেশি ভূখণ্ড দখল করেছে। তবে মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার’ যাচাইকৃত ভূ-অবস্থানভিত্তিক তথ্যে জানিয়েছে, জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মস্কোর প্রকৃত দখল ৯৭ বর্গকিলোমিটার (৩৭ দশমিক ৪ বর্গমাইল)। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, ‘তথ্য পরিসরের ওপর পুতিনের নিয়ন্ত্রণ এবং রুশ সামরিক সাফল্যের বিভিন্ন গল্প তৈরি ও প্রচারের সক্ষমতা তার অবস্থান টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ।’
‘ন্যাটোর সঙ্গে যুদ্ধ’ বয়ানের প্রেক্ষাপট
ইউক্রেনের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফের সাবেক উপপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইহোর রোমানেঙ্কো আল-জাজিরাকে বলেন, ‘এই লক্ষ্যটা হলো, কেন কয়েক মাসের বদলে “বিশেষ সামরিক অভিযান” পঞ্চম বছরে গড়ালো, তার যুক্তি দেখানো।’ তার মতে, ‘যুদ্ধের কেন সম্প্রসারণ প্রয়োজন, কেন এটি ঘটছে, এটি আসলে একটি যুদ্ধ এবং তারা ইউক্রেনের সঙ্গে নয়, পুরো ন্যাটোর সঙ্গে যুদ্ধ করছে—এসব দেখানোর জন্যই ক্রেমলিন এমন প্রচারণামূলক কৌশল অবলম্বন করছে।’
আরও পড়ুন:
বাল্টিক থেকে পশ্চিম সাইবেরিয়া পর্যন্ত অধিকৃত এলাকা ও রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডে ইউক্রেনীয় বাহিনীর দৈনিক হামলা, ক্রমবর্ধমান জ্বালানি সংকট ও অর্থনৈতিক সমস্যার মধ্যেই ক্রেমলিন রুশ জনগণকে বৃহত্তর সেনা সংগ্রহের ধারণার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে চাইছে। এই সংগ্রহ কর্মসূচি ১৮ থেকে ২০ সেপ্টেম্বরের পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর শুরু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রোমানেঙ্কো বলেন, ‘এ কারণেই রাশিয়া সক্রিয় সংঘাত অব্যাহত রেখেছে, হামলা চালাচ্ছে এবং নির্বাচনের পর অন্তত আংশিক সেনা সংগ্রহ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে।’ পুতিন ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ‘আংশিক সেনা সংগ্রহের’ ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে বড় অঙ্কের বোনাসের প্রলোভনে ‘স্বেচ্ছাসেবক’ আকর্ষণ এবং অভিবাসীদের সেনাবাহিনীতে ভর্তি করার প্রচেষ্টার মধ্যে এই কার্যক্রম মূলত স্থগিত রয়েছে।
পুতিনের ‘পশ্চিমা মদদদাতাদের’ বিরুদ্ধে বক্তব্যের একদিন পর ক্রেমলিন সরাসরি ‘যুদ্ধ’ শব্দটি ব্যবহার করেছে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ রোববার টেলিভিশনে বলেন, ‘এটি একটি যুদ্ধ, প্রকৃত যুদ্ধ।’ এই শব্দ ব্যবহারের কারণে অতীতে হাজারো রুশ নাগরিক জরিমানা, গ্রেপ্তার ও কারাদণ্ডের শিকার হয়েছেন।
পেসকভ বলেন, ‘জানেন কেন এটি যুদ্ধ? কারণ, সব কিছু বিশেষ সামরিক অভিযান হিসেবে শুরু হয়েছিল, কিন্তু চলছে যুদ্ধের মতো। কারণ, কিয়েভের পেছনে রয়েছে বার্লিন, প্যারিস, হেগ, অসলো এবং ওয়াশিংটন।’
কিয়েভভিত্তিক ‘পেন্টা’ থিংক ট্যাংকের প্রধান ভলোদিমির ফেসেঙ্কো আল-জাজিরাকে বলেন, ‘যেই মুহূর্তে রাশিয়া রণক্ষেত্রে সমস্যায় পড়ে, যেই মুহূর্তে বেশি বেশি সামরিক ব্যর্থতার মুখোমুখি হয়, রুশ ভূখণ্ডে হামলা বাড়ে, ক্রিমিয়া ও জ্বালানি সংকট নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়—তখনই এসব ঘটনা নিজেদের জনগণের সামনে যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করতেই হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারা দেখাতে চাইছে যে সম্মিলিত পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে যুদ্ধ করছে; এ কারণেই চার বছরেরও বেশি সময় ধরে ইউক্রেনকে হারানো যাচ্ছে না।’




