কোরবানি না দিলে কি গোনাহ হয়? সামর্থ্যবানদের জন্য ইসলামের কঠোর নির্দেশনা

কোরবানি না দিলে কি গুনাহ হয়
কোরবানি না দিলে কি গুনাহ হয় | ছবি: এখন টিভি
0

ইসলামি শরিয়তে কোরবানি (Qurbani/Udhiyah) একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও আত্মিক ইবাদত। প্রতি বছর জিলহজ্ব মাসের ১০ থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে কোরবানি করা প্রত্যেক সামর্থ্যবান মুসলিমের ওপর আবশ্যক বা ওয়াজিব (Wajib)। কিন্তু অনেক সময় সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও অনেকে অবহেলা করে কোরবানি দেন না। প্রশ্ন হলো, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কোরবানি না দিলে কি গোনাহ হবে?

বিষয় (Topic) ইসলামি বিধান ও নির্দেশনা (Islamic Guidance) পরিণতি/ফল (Consequence)
সামর্থ্যবানদের জন্য কোরবানি ওয়াজিব (Wajib) বা আবশ্যক। পালন করা বাধ্যতামূলক।
ইচ্ছাকৃত না দিলে ওয়াজিব তরক করার গোনাহ। কবিরাহ বা বড় গোনাহ হবে।
নবিজি (সা.)-এর হুঁশিয়ারি ঈদগাহের কাছে না আসার নির্দেশ। আল্লাহর রসূলের অসন্তুষ্টি।
সঠিকভাবে আদায় করলে পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে নেকি। অশেষ সাওয়াব ও নাজাতের মাধ্যম।
নফল কোরবানি যাদের ওপর ওয়াজিব নয় তাদের জন্য। আল্লাহর বিশেষ ভালোবাসা ও নৈকট্য লাভ।

আরও পড়ুন:

কোরবানি কার ওপর ওয়াজিব? (On Whom Qurbani is Mandatory)

পারিবারিক প্রয়োজনীয় খরচ মেটানোর পর জিলহজ্ব মাসের ঐ তিন দিন যার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ (সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা অথবা এর সমমূল্যের নগদ টাকা/ব্যবসায়িক পণ্য) থাকবে, তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। বর্তমানে রুপার বাজার দর অনুযায়ী এই অংকটি আনুমানিক ৫০ হাজার থেকে ৪ লাখ টাকার মধ্যে হতে পারে।

কোরবানি না দেওয়ার পরিণতি (Consequences of Not Performing Qurbani)

যাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব, তারা যদি তা পালন না করেন, তবে তারা ওয়াজিব তরক করার গোনাহ (Sin of Skipping Wajib) করবেন। ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী, ওয়াজিব ত্যাগ করা কবিরাহ বা বড় গোনাহ। সামর্থ্যবান ব্যক্তি কোরবানি না দিলে তার ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যার সামর্থ্য আছে তবুও সে কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে।” (মুসনাদে আহমদ)

এই হাদিস থেকে স্পষ্ট হয় যে, কোরবানি করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তা থেকে বিরত থাকা মহানবী (সা.)-এর অসন্তুষ্টির কারণ এবং এটি ইবাদতের প্রতি চরম অবহেলার শামিল।

কোরবানির ফজিলত ও সাওয়াব (Rewards and Benefits of Qurbani)

কোরবানি কেবল একটি পশু জবেহ করা নয়, বরং এটি ত্যাগের মহিমা। হাদিসে এসেছে, কোরবানিকৃত পশুর গায়ের প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি বা সাওয়াব (Reward) দান করা হয়। অন্যদিকে, যাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়, তারা যদি নফল ইবাদত হিসেবে কোরবানি দেন, তবে তারাও আল্লাহর অশেষ রহমত ও ভালোবাসা লাভ করবেন।

মুমিন মুসলমানের উচিত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে আল্লাহ তাআলার হুকুম পালনার্থে কোরবানি করা। এতে একদিকে যেমন ওয়াজিব আদায় হয়, অন্যদিকে বড় গোনাহ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

আরও পড়ুন:

কোরবানি সংক্রান্ত ধর্মীয় বিধান নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর-FAQ

প্রশ্ন: কোরবানি কি সবার ওপর ফরজ?

উত্তর: না, কোরবানি সবার ওপর ফরজ নয়, বরং এটি একটি 'ওয়াজিব' ইবাদত। জিলহজ্ব মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ যার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ (প্রয়োজনের অতিরিক্ত) থাকবে, কেবল তার ওপরই কোরবানি করা ওয়াজিব।

প্রশ্ন: সামর্থ্য থাকার পরও কোরবানি না দিলে কি গুনাহ হবে?

উত্তর: হ্যাঁ, সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য কোরবানি করা ওয়াজিব। শরিয়তের কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া ওয়াজিব ত্যাগ করা কবিরাহ বা বড় গোনাহ।

প্রশ্ন: ঋণ করে কি কোরবানি দেওয়া যাবে?

উত্তর: যদি কারো ওপর কোরবানি ওয়াজিব না হয় এবং তিনি ঋণ করে কোরবানি দিতে চান, তবে তা জায়েজ। তবে ঋণের টাকা পরিশোধের সামর্থ্য বা উৎস না থাকলে ঋণ করে কোরবানি না দেওয়াই শ্রেয়।

প্রশ্ন: একই পরিবারে কতজনের ওপর কোরবানি ওয়াজিব হতে পারে?

উত্তর: কোরবানি ব্যক্তিভিত্তিক ইবাদত। পরিবারের একাধিক সদস্য (যেমন বাবা, মা, ছেলে) যদি প্রত্যেকে পৃথকভাবে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তবে প্রত্যেকের ওপর আলাদাভাবে কোরবানি ওয়াজিব হবে।

প্রশ্ন: কোরবানির পশুর বয়স কত হতে হবে?

উত্তর: গরু ও মহিষের ক্ষেত্রে অন্তত ২ বছর, উটের ক্ষেত্রে ৫ বছর এবং ছাগল, ভেড়া ও দুম্বার ক্ষেত্রে অন্তত ১ বছর পূর্ণ হতে হবে। তবে ভেড়া বা দুম্বা যদি ৬ মাসের হয় কিন্তু দেখতে ১ বছরের মতো বড় লাগে, তবে তা দিয়ে কোরবানি জায়েজ।

প্রশ্ন: কোরবানির টাকা কি দান করে দিলে কোরবানি আদায় হবে?

উত্তর: না, কোরবানির মূল উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর নামে পশু রক্ত প্রবাহিত করা। পশুর বদলে টাকা দান করলে ওয়াজিব কোরবানি আদায় হবে না। তবে নফল হিসেবে দান করা যেতে পারে।

প্রশ্ন: কোরবানি কার নামে দিতে হয়?

উত্তর: কোরবানি দিতে হয় মহান আল্লাহর নামে। তবে সাওয়াব পৌঁছানোর নিয়তে নিজের পাশাপাশি মৃত আত্মীয়-স্বজন বা নবিজি (সা.)-এর নামেও কোরবানি দেওয়া যায়।

প্রশ্ন: কোরবানির পশুর ভাগাভাগি নিয়ে নিয়ম কী?

উত্তর: গরু, মহিষ ও উটে সর্বোচ্চ ৭ জন শরিক হতে পারেন। তবে ছাগল, ভেড়া বা দুম্বায় একাধিক শরিক হওয়া জায়েজ নয়, এটি একজনের নামেই হতে হবে।

প্রশ্ন: কোরবানির মাংস কতদিন জমিয়ে রাখা যায়?

উত্তর: ইসলামের বিধান অনুযায়ী কোরবানির মাংস জমিয়ে রাখার কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। আপনি নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী তা জমিয়ে রাখতে পারেন, তবে অভাবগ্রস্তদের বিলিয়ে দেওয়া উত্তম।

প্রশ্ন: কোরবানির মাংস অমুসলিমদের দেওয়া যাবে কি?

উত্তর: হ্যাঁ, কোরবানির মাংস অমুসলিম প্রতিবেশী বা দরিদ্রদের দেওয়া জায়েজ। এটি ইসলামের উদারতা ও মানবিকতার পরিচয়।

প্রশ্ন: কোরবানিদাতার জন্য কি নখ বা চুল কাটা নিষিদ্ধ?

উত্তর: জিলহজ্ব মাসের চাঁদ দেখার পর থেকে কোরবানি সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত নখ, চুল বা গোঁফ না কাটা মুস্তাহাব (উত্তম)। এটি বাধ্যতামূলক নয়, তবে নবিজি (সা.)-এর সুন্নত।

প্রশ্ন: মৃত ব্যক্তির নামে কোরবানি দিলে কি সেই মাংস খাওয়া যাবে?

উত্তর: যদি কেউ স্বতঃস্ফূর্তভাবে মৃত ব্যক্তির সাওয়াবের জন্য কোরবানি দেয়, তবে সেই মাংস সবাই খেতে পারবে। তবে মৃত ব্যক্তি যদি অসিয়ত করে যান এবং সেই টাকা দিয়ে কোরবানি দেওয়া হয়, তবে সেই মাংস গরিবদের বিলিয়ে দিতে হবে।

প্রশ্ন: কোরবানির চামড়ার টাকা দিয়ে কি মসজিদের কাজ করা যাবে?

উত্তর: না, কোরবানির চামড়া বা চামড়া বিক্রির টাকা অবশ্যই দরিদ্র, এতিম বা দুস্থদের হক। এটি মসজিদের উন্নয়ন বা ইমামের বেতন হিসেবে ব্যবহার করা জায়েজ নয়।

প্রশ্ন: নবিজি (সা.)-এর সেই কঠোর হাদিসটি কী?

উত্তর: নবিজি (সা.) বলেছেন, "যার সামর্থ্য আছে তবুও সে কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে।" (ইবনে মাজাহ)। এটি কোরবানি বর্জনকারীদের জন্য একটি বড় সতর্কবাণী।

এসআর