শোলাকিয়ার দীর্ঘদিনের রেওয়াজ অনুযায়ী জামাত শুরুর আগে তিন দফা শটগানের গুলি ফুটিয়ে নামাজের প্রস্তুতির সংকেত দেয়া হয়। এরপর শুরু হয় ঈদের জামাত। জামাতে ইমামতি করেন কিশোরগঞ্জ শহরের বড় বাজার মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ সাইফুল্লাহ। বিকল্প ইমাম হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হয়বতনগর এ ইউ কামিল মাদ্রাসার প্রভাষক মাওলানা জুবায়ের ইবনে আব্দুল হাই।
দূর-দূরান্ত থেকে আগত মুসল্লিদের যাতায়াত সহজ করতে রেল মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে চলাচল করে শোলাকিয়া স্পেশাল নামে দুটি বিশেষ ট্রেন। একটি ট্রেন ভৈরব থেকে সকাল ৬টায় এবং অন্যটি ময়মনসিংহ থেকে সকাল ৬টায় কিশোরগঞ্জের উদ্দেশে ছেড়ে আসে। নামাজ শেষে দুপুর ১২টায় ট্রেন দুটি পুনরায় নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাবে।
ঈদগাহ ময়দানে জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ঈদের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষে দেশ, জাতি এবং মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনায় বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
ঈদুল ফিতরের তুলনায় ঈদুল আজহায় শোলাকিয়ায় মুসল্লির উপস্থিতি কিছুটা কম দেখা যায়। সংশ্লিষ্টরা জানান, কোরবানির প্রস্তুতি ও আশপাশের মসজিদে আগেই জামাত অনুষ্ঠিত হওয়ায় মুসল্লির সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল।
আরও পড়ুন:
জামাতকে ঘিরে নেয়া হয় পাঁচ স্তরের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। মাঠ জুড়ে মোতায়েন ছিল পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও সাদা পোশাকের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।
নিরাপত্তার জন্য স্থাপন করা হয় আর্চওয়ে, ওয়াচ টাওয়ার, সিসিটিভি ক্যামেরা, ভিডিও ক্যামেরা ও ড্রোন নজরদারি ব্যবস্থা। বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ও কুইক রেসপন্স টিমও প্রস্তুত রাখা হয়।
এছাড়া ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট, অ্যাম্বুলেন্স ও মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করে। স্কাউট সদস্যরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
জামাতে কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলাম, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল, কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, কিশোরগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেলসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানান, মুসল্লিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল। শান্তিপূর্ণভাবে জামাত সম্পন্ন হওয়ায় তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ভিপি খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেলও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে জামাত সম্পন্ন হওয়ায় সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
জেলা প্রশাসন জানায়, শোলাকিয়ার শতবর্ষের ঐতিহ্য অনুসরণ করেই এবারও জামাতের আগে তিনবার বন্দুকের গুলি ফুটিয়ে প্রস্তুতির সংকেত দেয়া হয়। খুতবা শেষে দেশ ও মুসলিম বিশ্বের শান্তি কামনায় বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ৭ জুলাই ঈদুল ফিতরের জামাত চলাকালে শোলাকিয়া ঈদগাহের কাছে জঙ্গি হামলায় দুই পুলিশ সদস্যসহ চারজন নিহত হন। ওই ঘটনার পর থেকেই শোলাকিয়াকে ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এবারও চার স্তরের নিরাপত্তাবেষ্টনী অতিক্রম করে মুসল্লিদের মাঠে প্রবেশ করতে হয়েছে।
ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহৎ ঈদগাহ হিসেবে পরিচিত। জনশ্রুতি রয়েছে, ১৮২৮ সালে এ মাঠে সোয়া লাখ মুসল্লি একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করেছিলেন। সেই থেকেই মাঠটির নাম হয় ‘সোয়া লাখিয়া’, যা পরে ‘শোলাকিয়া’ নামে পরিচিতি পায়। স্থানীয়দের দাবি, ঐতিহাসিক এই ঈদ জামাতকে ইউনেস্কোর স্বীকৃতির আওতায় আনা উচিত।





