একনজরে শবে কদরের বিশেষ রহমত ও সওয়াব
- কোরআন নাজিল: এ রাতেই মহাগ্রন্থ আল-কুরআন লওহে মাহফুজ থেকে অবতীর্ণ হয়।
- সওয়াবের পরিমাণ: ১ রাতের ইবাদত > হাজার মাস বা ৮৩ বছর ৪ মাসের ইবাদত।
- ক্ষমার সুযোগ: পূর্বের সকল গুনাহ মাফের আল্লাহর বিশেষ প্রতিশ্রুতি।
- ফেরেশতাদের উপস্থিতি: জিবরাইল (আ.)-সহ অসংখ্য ফেরেশতা পৃথিবীতে শান্তি বর্ষণ করেন।
- অনুসন্ধান: রমজানের শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলো (২১, ২৩, ২৫, ২৭, ২৯)।
আরও পড়ুন:
কোরআন নাজিলের রজনী ও সুরার বর্ণনা
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন— إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ অর্থাৎ, ‘নিশ্চয়ই আমি কোরআনকে কদরের রাতে অবতীর্ণ করেছি।’ (সুরা আল-কদর: ১)। মুফাস্সিরগণের মতে, এই রাতে কোরআন লওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে নাজিল হয়। এই মহান ঐশীগ্রন্থ নাজিল হওয়ার কারণেই এ রাতের মর্যাদা অপরিসীম। আল্লাহ মানুষের আগ্রহ বাড়াতে আবার প্রশ্ন করেছেন— وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ ‘তুমি কি জানো, কদরের রাত কত মহিমান্বিত?’ (সুরা আল-কদর: ২)। অর্থাৎ এই রাতের ফজিলত মানুষের কল্পনারও ঊর্ধ্বে।
হাজার মাসের চেয়েও উত্তম এক রাত
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেন— لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ ‘কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।’ (সুরা আল-কদর: ৩)। হাজার মাস মানে প্রায় ৮৩ বছর ৪ মাস। অর্থাৎ এই এক রাতের ইবাদত একটি দীর্ঘ জীবনের ইবাদতের চেয়েও বেশি সওয়াব বয়ে আনে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি ইমান ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরে ইবাদতে দাঁড়াবে, তার পূর্বের সব গুনাহ ক্ষমা (Forgiveness of previous sins) করে দেওয়া হবে।" (বুখারি ১৯০১)
ফেরেশতাদের আগমন ও শান্তির রাত (Arrival of Angels)
আল্লাহ তাআলা বলেন— تَنَزَّلُ الْمَلَائِكَةُ وَالرُّوحُ فِيهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ ‘সে রাতে ফেরেশতারা ও রূহ (জিবরাইল আ.) তাদের প্রতিপালকের অনুমতিতে প্রত্যেক বিষয়ের জন্য অবতীর্ণ হন।’ (সুরা আল-কদর: ৪)। এই রাতে অসংখ্য ফেরেশতা পৃথিবীতে নেমে এসে মসজিদে ও ঘরে ঘরে ইবাদতকারী বান্দাদের জন্য দোয়া করতে থাকেন। এটি ফজর পর্যন্ত সম্পূর্ণ শান্তি ও রহমতের রাত।
আরও পড়ুন:
মুফাস্সির ও আলেমদের দৃষ্টিতে শবে কদর (Views of Scholars)
১. ইমাম কুরতুবী (রহ.) মনে করেন, কোরআন নাজিল হওয়াই এই রাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা।
২. ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী (রহ.) বলেন, আল্লাহ যখন কোনো কিছুকে বিশেষ মর্যাদা দিতে চান, তখন সেটিকে নিজের সঙ্গে সম্পর্কিত করে দেন, যেমন—আল্লাহর রাত (লাইলাতুল কদর)।
৩. ইমাম নববী (রহ.)-এর মতে, এই এক রাতের ইবাদত হাজার মাসের চেয়ে উত্তম হওয়াটাই এর মূল ফজিলত।
৪. শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া (রহ.) বলেন, ইখলাসের সঙ্গে ইবাদত করলে অতীতের সব গুনাহ মাফ হয়ে যায়।
৫. মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর মতে, শবে কদর এমন এক রাত যখন মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করা হয়।
আরও পড়ুন:
শবে কদর কোন রাতে? জেনে নিন তারিখ ও রাতটি গোপন রাখার রহস্য
পবিত্র রমজান মাসের রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের এই সময়ে মুমিনদের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা হলো লাইলাতুল কদর (Lailatul Qadr) পাওয়া। কারণ, এই এক রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। তবে শবে কদর ঠিক কোন রাতে, তা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন থাকে। ইসলামি শরিয়ত ও হাদিসের আলোকে এর সময়সীমা এবং রহস্য নিচে আলোচনা করা হলো:
শবে কদর অনুসন্ধানের সঠিক সময় (The Right Time to Search for Shabe Qadr)
ইসলামি বিধান অনুযায়ী, শবে কদর নির্দিষ্ট কোনো একটি তারিখে স্থির করা হয়নি। তবে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মুসলমানদের রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে এটি অনুসন্ধান করার তাগিদ দিয়েছেন।
হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন— تَحَرَّوْا لَيْلَةَ الْقَدْرِ فِي الْوِتْرِ مِنَ الْعَشْرِ الْأَوَاخِرِ مِنْ رَمَضَانَ ‘‘তোমরা রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান কর।’’ (সহিহ বুখারি: ২০২০, সহিহ মুসলিম: ১১৬৭)।
এই সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী, রমজানের ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তম রাতগুলোতে শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।
আরও পড়ুন:
শবে কদর কি কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে?
হজরত আবু জর গিফারী (রা.) একবার রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, শবে কদর কি কেবল নবুয়তের যুগেই ছিল, নাকি কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে? উত্তরে নবীজি (সা.) নিশ্চিত করেছেন যে, এটি কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। তিনি আরও স্পষ্ট করেছেন যে, এটি রমজানের যেকোনো অংশে হতে পারলেও মূলত শেষ দশকের রাতগুলোতেই এটি তালাশ করা উচিত। (সহিহ মুসলিম: ১১৬৫, মুসনাদে আহমাদ: ২১৫৪৯)।
কেন এই রাতকে গোপন রাখা হয়েছে? (Why is this Night Kept Hidden?)
আল্লাহ তাআলা শবে কদরের সঠিক তারিখটি গোপন রেখেছেন এক বিশেষ হিকমত বা রহস্যের কারণে। যদি একটি তারিখ নির্দিষ্ট থাকতো, তবে মানুষ কেবল সেই রাতেই ইবাদত করতো। কিন্তু তারিখ গোপন থাকায় সওয়াবের প্রত্যাশায় মুমিন বান্দারা শেষ দশকের প্রতিটি রাতেই বেশি বেশি ইবাদত, তিৃলাওয়াত, জিকির ও কান্নাকাটি করে। এই নিরন্তর প্রচেষ্টার মাধ্যমেই বান্দার সঙ্গে আল্লাহর গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়।
শবে কদর হলো মূলত রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের (Mercy, Forgiveness, and Salvation) রাত। এ রাতেই ফেরেশতারা পৃথিবীতে অবতীর্ণ হন এবং ইবাদতকারীদের জন্য দোয়া করতে থাকেন।
আরও পড়ুন:
শবে কদরের পূর্ণাঙ্গ মাহাত্ম্য ও ফজিলত
বৈশিষ্ট্য (Feature) বিবরণ (Details) শ্রেষ্ঠত্ব হাজার মাসের (প্রায় ৮৩ বছর ৪ মাস) চেয়েও উত্তম। প্রধান ঘটনা লওহে মাহফুজ থেকে দুনিয়ার আকাশে পবিত্র কুরআন নাজিল। বিশেষ ঘোষণা ইমান ও সওয়াবের আশায় ইবাদত করলে পূর্বের সব গুনাহ মাফ। ফেরেশতাদের আগমন জিবরাইল (আ.) সহ অসংখ্য ফেরেশতা পৃথিবীতে শান্তি বর্ষণ করেন। অনুসন্ধানের সময় রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাত (২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯)। নিয়ামত বান্দার ভাগ্য নির্ধারণ, দোয়া কবুল ও রহমত নাজিলের রাত।



