দেশে এখন

মাদারীপুর-শরীয়তপুরবাসীর ইউরোপযাত্রা না আত্মহুতি!

ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইতালি প্রবেশের চেষ্টা ইউরোপে গাঢ় করছে অভিবাসন সংকট। গেল ৬ বছরে এভাবে ইতালিতে যাওয়ার স্বপ্নের অপমৃত্যু হয়েছে ২শ'র বেশি মাদারীপুর ও শরীয়তপুরবাসীর। বিদেশের মাটিতে নির্মম নির্যাতন সইতে না পেরে সহায়সম্বল হারিয়ে দেশে ফেরত আসার সংখ্যাও নেহায়াত কম নয়।

ভূমধ্যসাগর হয়ে ইতালি উপকূলে বিপদজনক সমুদ্রযাত্রা। যেটি বাংলাদেশের কিছু জেলার অভিবাসন প্রত্যাশীদের কাছে গেম নামে পরিচিত। যা শুরু হয় ভাসমান নৌকা দিয়ে। মাদারীপুর, শরিয়তপুর থেকে যেতে হবে ইতালি। উপায় গেম হাউস। শব্দ গুলোর সাথে পরিচিত হতে এখন টিভির যাত্রা শরিয়তপুরের পথে।

একজন ভুক্তভোগীর মা বলেন, 'তিন শতক জায়গা আমি ৬ লাখ টাকা বিক্রি করেছি। বেঁচার পর ছেলেরে ৫ লাখ টাকা দিলাম। যেদিন দিয়েছি তার পরের দিন বললো ছেলেদের শিপে উঠে দেবে। দালালের সাথে কথা বলার পর দালাল বলে গেম দিতে ৮ লাখ টাকা লাগবে।'

উন্নত জীবনের জন্য ঝুঁকি নিয়ে অবৈধ পন্থায় কষ্ট করে বিদেশে যাত্রা করেছেন এ অঞ্চলে এমন মানুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। সোহেল সরদার নামের এক ভুক্তোভোগী তার বর্ননাও দিলেন। অভাবে তাদের বসবাসের স্থান যেমন নুয়ে পড়েছে তেমনি শোকে ভেঙেছে বুকের পাঁজরও।

সোহেল বলেন, 'ঔ দেশে ঠিকমতো খাবার দেয়নি। কয়দিন পর দেশে পাঠাবে বলে আবারও জেলে পাঠাইছে। জেলে নেওয়ার পর আবারও টাকা লাগছে ২ লাখ করে। দুবাই থেকে আমাদের মিশর নিয়ে ১ দিন রাখে। সেখান থেকে লিবিয়ায় নিয়েছিল। সাগরে কিছুদূর যাওয়ার পরই বোট ফেটে গেছিলো। তারপরও অনেক কষ্ট করে আমরা ইতালি গেছিলাম।'

শরিয়তপুর ও মাদারীপুরের নানা স্থানে ইতালি শব্দটি লিখা আছে। এতে সহজে অনুমান আর আন্দাজ করা যায় যে, সে দেশ থেকে এই জেলাগুলোতে বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক আয় বা রেমিট্যান্স আসে। পাশাপাশি ইতালিতে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য ভূমধ্যসাগরে গেমে যুক্ত হয়ে অবৈধ পন্থা অবলম্বন বা ডানকি পদ্ধতিতে দালাল দ্বৈরথে যে হারে মানুষ মারা যাচ্ছে তাতে করে এই অঞ্চলের জনপদের মানুষের চোখেমুখে চিন্তার ভাজ পরেছে বিপদ রেকার মতো।

এমন খবর খবরের কাগজেও শিরোনাম হয় বারবার। কিভাবে মানুষ মরে যায়, সাগরে ডুবে যায় স্বপ্ন গুলোকে বাঁচাতে।

এলাকাবাসী জানান, গেমে সফল হলে ইতালিতে একটি নিশ্চিত জীবন পায় এ এলাকার বাসিন্দারা। আর ব্যর্থ হওয়ার মানে হলো করুন মৃত্যু।

স্থানীয়রা জানান, দুর্ঘটনায় প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটলেও অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার প্রবনতা কমেনি অল্প বয়সী তরুণ ও যুবকদের মধ্যে।

স্থানীয় একজন বলেন, '২০০০ সালের পর থেকে এই এলাকার লোকগুলো আবার অন্য পথ বেছে নিয়েছে, নদী পথ। যেটা হচ্ছে লিবিয়া দিয়ে।'

২০১৫ সালের পর থেকে মাদারীপুরে ৩৪০টি বেশি মানবপাচারের মামলা হয়েছে। পাশাপাশি বিচার হয়েছে এমন সংখ্যা খুবই কম। জেলা পুলিশ সুপার বলছেন,পাচার রোধে কাজ করছে পুলিশ।

শরীয়তপুরের পুলিশ সুপার মো. মাহবুবুল আলম পিপিএম বলেন, 'এতো ভিক্টিম এই পথে ধরা পরার পরও লোকজন কিন্তু থেমে নেই। অবৈধ পথে তারা যাচ্ছে। বৈধ যেসব দেশে ভিসা দেয়, সেসব দেশে বৈধ পথেই যেতে হবে তা না হলে এই নির্যাতনগুলো থেমে থাকবে না। যে মামলাগুলো আছে তা তদন্ত করছি। আবার কিছু মামলা হবে বলে আমরা জানি। কারণ এই অপরাধগুলো একেবারে থেমে গেছে বিষয়টা এমন না।'

আর মন্ত্রী বললেন, কালো তালিকা হচ্ছে এজেন্সির ব্যাপারে।

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী বলেন, 'সঠিক তথ্য নিয়ে এবং এই ব্যাপারে আমরা তথ্য নেওয়ার চেষ্টা করছি। যেখানেই সমস্যা হবে সেই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে আমরা কাজ করবো।'

ব্রাকের কর্মকর্তা বলছেন, যুবকরা মৃত্যুর মুখে পড়ে যাচ্ছে। আর এই পথে সারাবছরই একটা শক্তিশালী সিন্ডিকেট তাদের উৎসাহিত করে।

ব্র্যাকের হেড অব মাইগ্রেশন শরিফুল ইসলাম বলেন, 'আপনারা শুনলে অবাক হবেন শরীয়তপুরের একটা গ্রামের নাম ইতালি পাড়া। তারা লোকদের প্রলুব্ধ করে যে ওমুক দিন আমাদের একটা নৌকা ছাড়বে। মারা যে যায় বা প্রাণহানির ঘটনা ঘটে সেগুলো তা আসলে কেউ দেখে না।'

শুধু একটু বেশি উপার্যনের জন্য দেশের মানুষ ইতালি যেতে চান। তবে দক্ষিণ অঞ্চলের জেলার তরুণরা বলেছেন, তারা অবৈধভাবে লিবিয়া হয়ে ইতালি যেতে আগ্রহী নন। প্রাথমিকভাবে পৃষ্ঠপোষক এবং সিজনাল ভিসার মাধ্যমে আইনি উপায়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে চান। এমন মানসিকতা গড়ে উঠলে কমে আসতে পারে ভূমধ্যসাগরের নির্মম প্রাণহানি।

এমএসআরএস

এই সম্পর্কিত অন্যান্য খবর