এদিকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ অবসান নিয়ে নতুন আলোচনার জন্য ইরানি আলোচকদের সঙ্গে দেখা করতে সুইজারল্যান্ড পৌঁছেছেন।
ওয়াশিংটন থেকে এএফপি জানায়, ইউরোপগামী ফ্লাইটে ওঠার আগে ভ্যান্স সাংবাদিকদের জানান, তিনি আশা করেন ‘পারমাণবিক ইস্যুতে অগ্রগতি হবে, লেবানন যুদ্ধবিরতি ইস্যুতেও অগ্রগতি হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, এই দুটিই প্রধান বিষয়, যার ওপর আমরা মনোযোগ দেবো।’
শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে পরবর্তী আলোচনার পরিকল্পনা করা হয়েছিলো, কিন্তু যুদ্ধে চারজন ইসরাইলি সৈন্য নিহত হওয়ার পর লেবাননে ইসরাইল প্রাণঘাতী হামলা চালালে শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত করা হয়।
পরে ওয়াশিংটন সেখানে নতুন করে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে—যা ইরানের সঙ্গে তাদের প্রাথমিক চুক্তির একটি শর্ত ছিলো—কিন্তু শনিবার (২০ জুন) ইসরাইলি সেনারা হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সঙ্গে আবারও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এবং উভয় পক্ষই একে অপরকে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের জন্য অভিযুক্ত করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘চুক্তি লঙ্ঘন’ এবং ‘দক্ষিণ লেবাননে ক্রমাগত ও নিরলসভাবে জায়নবাদী রজিমের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের’ কথা উল্লেখ করে ইরানের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড বলেছে, ‘হরমুজ প্রণালি নৌচলাচলের জন্য বন্ধ করে দেয়া হবে।’
তেল ও গ্যাস পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজকে যুদ্ধের বেশিরভাগ সময় ধরে ইরান অবরোধ করে রেখেছিলো, যা বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজারে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তার ইরানি প্রতিপক্ষ মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যে স্বাক্ষরিত প্রাথমিক চুক্তির অধীনে তেহরান এটি পুনরায় চালু করতে সম্মত হয়েছিলো এবং জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হতে শুরু করেছিলো।
ইরানের ঘোষণার পর মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড বলেছে যে, আন্তর্জাতিক জলপথে নিরাপদ চলাচল ‘অক্ষুণ্ন রয়েছে’ এবং মার্কিন বাহিনী ‘উপস্থিত ও সতর্ক’ রয়েছে।
ট্রাম্প পরে সতর্ক করে দেন যে, আলোচকরা চুক্তিটি সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হলে ওয়াশিংটন হরমুজে নিজস্ব শুল্ক আরোপ করতে পারে।
ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘যদি না তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক এবং তার জন্য আরোপ করা হয়’, তাহলে কোনো টোল থাকবে না।
সুইজারল্যান্ডের চাপ
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও সুইস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবার গভীর রাতে একটি ইরানি প্রতিনিধিদল সুইজারল্যান্ডে পৌঁছেছে।
ইরানের সরকারি সম্প্রচার মাধ্যম জানিয়েছে, এতে সংসদীয় স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি বলেছেন, প্রতিনিধিদলটি চুক্তির অধীনে অপর পক্ষের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবি জানাবে। সরকারি সংবাদ সংস্থা ইরনাকে তিনি বলেন, ‘অন্যথায় পুরো বোঝাপড়াটাই সমস্যায় পড়বে।’
আলোচনায় যোগ দিতে ভ্যান্স বিকেলের ফ্লাইটে ওয়াশিংটন ত্যাগ করেন এবং জানান যে, তিনি মাত্র ‘এক বা দুই দিন’ থাকতে পারবেন।
মার্কিন আলোচক জ্যারেড কুশনার এবং স্টিভ উইটকফ এরই মধ্যে সেখানে কিছু কারিগরি দিক সামলাচ্ছেন এবং জানিয়েছেন যে, ‘সবকিছু ভালোভাবে এগোচ্ছে’, শনিবার সকালে ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স এ কথা জানান।
মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান—যার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শনিবার কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের জন্য ইরানে ছিলেন বলে জানা গেছে। এছাড়া আরও জানা যায়, রোববার সুইজারল্যান্ডের বার্গেনস্টকে ‘কারগরি পর্যায়ে আলোচনা’ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে পাকিস্তানি ও কাতারি মধ্যস্থতাকারীরা যোগ দেবেন।’
এই আলোচনার উদ্দেশ্য হলো প্রাথমিক চুক্তিতে অমীমাংসিত থাকা বিষয়গুলো, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দুই মাসব্যাপী একটি আলোচনা পর্ব শুরু করা।
লেবাননের যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাচ্ছে
দক্ষিণ লেবাননে লড়াই অব্যাহত থাকায় শনিবারও ইসরাইল ও হিজবুল্লাহ একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে গেছে।
ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, লড়াইয়ে তাদের একজন সৈন্য নিহত হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি স্বাক্ষরের পর এ ধরনের পঞ্চম প্রাণহানি।
পরে ইসরইলি সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা বলেন, ‘দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে যুদ্ধবিরতির আদেশ পেয়েছে সামরিক বাহিনী।’ তিনি আরও বলেন, ‘সৈন্যরা “কোনো সক্রিয় হামলা চালাচ্ছিলো না” বরং একটি নিরাপত্তা অঞ্চলের ভেতরে আত্মরক্ষামূলকভাবে কাজ করছিলো।’
এর আগে, একজন ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তা বলেছিলেন, হিজবুল্লাহ গত রাতে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর ৫০টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করার পর নতুন করে হামলা শুরু হয়েছে।
হিজবুল্লাহ ইসরাইলকে যুদ্ধবিরতির আড়ালে নাবাতিয়ার ওপর নজর রাখা কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ এলাকা আলি তাহের পাহাড়ের দিকে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালানোর জন্য অভিযুক্ত করেছে এবং বলেছে যে তাদের যোদ্ধারা উপযুক্ত অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে এর জবাব দিয়েছে।
লেবাননের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, প্রায় ২০টি স্থানে ইসরাইলি বিমান হামলা চালানো হয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ ৩০ জনেরও বেশি নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, লেবাননে চলমান লড়াইয়ে মোট মৃতের সংখ্যা ৪ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
হিজবুল্লাহর আইনপ্রণেতা হাসান ফদলাল্লাহ বলেন, ‘এই শত্রু যখন আমাদের ওপর হামলা করবে, তখন তার মোকাবিলা করার পূর্ণ অধিকার আমাদের রয়েছে।’
ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লাইটার দাবি করেছেন, হিজবুল্লাহই যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করেছে এবং বলেছেন, ইসরাইল ‘সন্ত্রাসী হামলার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা করছিলো’। কিন্তু হিজবুল্লাহ বলেছে, এর ‘সম্পূর্ণ দায়’ ইসরাইলের।
দক্ষিণ লেবাননের তাইর দেব্বা শহর থেকে পালিয়ে আসা ফাদি জায়াত এএফপিকে বলেছেন যে, দক্ষিণে ‘ভয়ই প্রাধান্য বিস্তার করে আছে’।
৫৩ বছর বয়সী ওই ব্যক্তি বলেন, ‘আমরা কয়েকদিন আগে গ্রামে ফিরেছি, কিন্তু আমাদের ব্যাগপত্র আবার পালানোর জন্য প্রস্তুত।’
মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়ার প্রতিশোধ হিসেবে হিজবুল্লাহ মার্চের শুরুতে ইসরাইলের দিকে রকেট নিক্ষেপ করে লেবাননকে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে জড়িয়ে ফেলে।
লেবাননে এপ্রিলে কার্যকর হওয়ার কথা থাকা পূর্ববর্তী যুদ্ধবিরতি কখনোই মানা হয়নি এবং উভয় পক্ষই অপর পক্ষের কথিত লঙ্ঘনের কথা উল্লেখ করে নিজেদের হামলার ন্যায্যতা প্রমাণ করেছে।—বাসস





