এক গরিব ঘরের ছেলে থেকে শীর্ষ ধর্মীয় নেতা হয়ে ওঠা (Early Life and Religious Education)
আলী খামেনি ১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল ইরানের মাশহাদে (Mashhad) জন্মগ্রহণ করেন, এক ধর্মপ্রাণ শিয়া পরিবারে যেখানে বাবা ছিলেন অতিগরিব ধর্মতাত্ত্বিক শিক্ষক। শৈশব থেকেই দারিদ্র্য, ধর্মীয় চিন্তা ও গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের মধ্যে বেড়ে ওঠা এই ছেলে পরবর্তীতে নাজাফ (ইরাক) ও কোম (ইরান)-এর শীর্ষ শিয়া আলেমদের কাছে শিক্ষা নিয়ে একজন আলিম হিসেবে গড়ে উঠেন।
১৯৬০–৭০ দশকে শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভীর (Shah Mohammad Reza Pahlavi) শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিরোধে জড়িয়ে পড়েন তিনি; বিভিন্ন সময়ে ছয় বারেরও বেশি গ্রেপ্তার হোন ও নির্বাসন জীবন (Exile life) তার প্রতিরোধের চিহ্ন হয়ে থাকে। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবে (Islamic Revolution 1979) তিনি ইমাম খোমেনির পাশে থেকে ইরান ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ সংগঠকদের একজন হিসেবে পরিচিত হন।
আরও পড়ুন:
রাষ্ট্রপতি থেকে সর্বোচ্চ নেতা (President to Supreme Leader)
১৯৮১ সালে আলী খামেনি ইরানের রাষ্ট্রপতি (President of Iran) নির্বাচিত হন এবং দুই মেয়াদে এই পদে থাকেন। সেই বছরই এক বোমা হামলায় (Assassination attempt) তার ডান বাহু পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়, তারপর থেকে ডান হাত ব্যবহার করতে পারেন না; এই হামলা ইরানের রাজনীতিতে “খামেনি নির্বাসন ও নিরাপত্তা” বিতর্কের একটি কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে।
১৯৮৯ সালে ইমাম খোমেনির মৃত্যুর পর ধর্মীয় পরিষদ (Assembly of Experts) আলী খামেনিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে। তখন তার “আয়াতুল্লাহ” (Ayatollah) উপাধি না থাকায় কিছু আলেম ও রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক হয়, কিন্তু সংবিধান সংশোধনের (Constitutional Amendment) মাধ্যমে তাকে এই পদে উন্নীত করে দেয়া হয়।
চূড়ান্ত ক্ষমতার আসনে (Supreme Power and Military Control)
সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে খামেনি ইরানের সশস্ত্র বাহিনী (Armed Forces), রেভোলিউশনারি গার্ডস (IRGC), বিচার ব্যবস্থা, পররাষ্ট্রনীতি ও মূল গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর চূড়ান্ত অনুমোদনকর্তা হয়ে দাঁড়ান। তাঁর নেতৃত্বে ইরান সিরিয়া, ইরাক, লেবানন, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিনে শিয়া ও প্রতিরোধ-মুখী গোষ্ঠীগুলোর (Resistance groups) সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক উন্নীত করে, যা ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের (Israel and USA) কাছে আপত্তিকর হয়ে ওঠে।
২০২২ সালে মাহসা আমিনির (Mahsa Amini) মৃত্যুর পর ইরানে ব্যাপক হিজাব বিরোধী আন্দোলন (Hijab protest) ও খামেনির পদত্যাগের দাবি দেখা যায়; তিনি এসব আন্দোলনকে “বাইরের ষড়যন্ত্র” বলে উপেক্ষা করে প্রশাসনিক নিষ্পত্তির মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখেন।
আরও পড়ুন:
মৃত্যু ও তার প্রভাব (Death and its Aftermath)
সংবাদমাধ্যমে বর্ণিত হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযানের (Joint Military Operation) লক্ষ্য হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির অবস্থান, এবং সেই হামলার ফল হিসেবে তিনি নিহত হয়েছেন বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তাসনিম (Tasnim), ফার্স (Fars) ও আইআরআইবি (IRIB) ঘোষণা করেছে। চলতি বছরের ১ মার্চ থেকে ইরানে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক (40 days of national mourning) ঘোষণা করা হয়েছে।
মৃত্যুর পর ইরানে শূন্যস্থান পূরণের জন্য অনুষ্ঠিত হবে শীর্ষ শিয়া আলেমদের নির্বাচিত পরিষদের বৈঠক, যেখান থেকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হবে। এরই মধ্যে বেশ কিছু নাম (যেমন ইব্রাহিম রাইসি, মোহাম্মদ ইমামি, সৈয়দ আলী হামানে) প্রেস ডেস্কে ঘোষিত হয়েছে, তবে কতটা নির্ভরযোগ্য তা নিয়ে এখনও বিতর্ক রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল দৃষ্টিকোণ ও ইরানের প্রতিক্রিয়া (US-Israel Perspective and Iran's Reaction)
আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর ঘটনাটি যেভাবে ঘটেছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক দিগন্ত (Political landscape of Middle East) পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে। বিশ্ব মিডিয়া জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল জোটের সামরিক ও গোয়েন্দা অভিযানে (Intelligence operation) খামেনির নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেদ করে নিয়ন্ত্রিত ক্ষেপণাস্ত্র বা বিমান হামলায় (Airstrike) তাঁর অবস্থান আঘাত করা হয়; এর পরেই তার মৃত্যুর বিষয়টি ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ঘোষণা করে।
এই ঘটনার পর ইরানে শুরু হয়েছে রাষ্ট্রীয় শোক ও প্রতিরোধের প্রতীকী সমাবেশ; তেহরান, মাশহাদ, কোম ও অন্যান্য বড় শহরে শত হাজার মানুষ শেরওয়ানি, ফতিহা ও ইসলামি রাইফেলসহ রাস্তায় নেমে এসে খামেনির “শাহাদাত” ও “প্রতিশোধ” (Revenge) নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। সরকারি বক্তব্যে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় নেতাকে হত্যা করে শুধু শক্তি দেখাননি, বরং মুসলিম বিশ্বের ক্ষুব্ধ মন জাগিয়ে দিয়েছে।
অন্যদিকে, পশ্চিমা রাষ্ট্র ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের (Security analysts) কাছে এই হত্যাকে ইরানের অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র কৌশলের সূক্ষ্ম নিয়ন্ত্রণ ও ভবিষ্যৎ প্রতিরোধ কাঠামো ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাঁরা যুক্তি দেখাচ্ছে যে খামেনি ছিলেন ইরানের সর্বাধিক ক্ষমতাধর ব্যক্তি; তার মৃত্যুর পর সংকট বা অন্তর্গত বিশৃঙ্খলা (Internal chaos) হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, আলী খামেনির মৃত্যু শুধু ইরানের ভেতরের শক্তির ভারসাম্য (Balance of power) পরিবর্তন করবে না, বরং সিরিয়া, ইরাক, লেবানন, ইয়েমেন ও ফিলিস্তিনে ইরানের প্রতিরোধ মুখী গোষ্ঠীগুলোর কৌশলমূলক নির্দেশনা কীভাবে গঠিত হবে তার গতির ওপর তিনি দীর্ঘ সময় ধরে ছায়া ফেলে রেখেছিলেন। তার জীবন ছিল দারিদ্র্য, ধর্মীয় অধ্যয়ন, নির্বাসন, সশস্ত্র বিপ্লব ও শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত রাজনৈতিক ক্ষমতার মিশ্রণ; আর এখন তাঁর মৃত্যু ইরানের “খামেনি যুগ”কে (Khamenei era) ঐতিহাসিক অধ্যায় বানিয়ে রেখে গেছে।
আরও পড়ুন:
ঘটনা (Events) সময়কাল/বিবরণ জন্মস্থান ও শৈশব মাশহাদ, ইরান (১৯৩৯) ইসলামি বিপ্লবে ভুমিকা ১৯৭৯ সালের প্রধান সংগঠক প্রেসিডেন্টকাল ১৯৮১ - ১৯৮৯ (২ মেয়াদ) সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে আসীন ১৯৮৯ - ২০২৬ (৩৭ বছর) মৃত্যুর কারণ যৌথ সামরিক হামলা (১ মার্চ ২০২৬ ঘোষণা)





