ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন: যেভাবে কাজ করে দেশটির ক্ষমতা কাঠামো

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন পদ্ধতি
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন পদ্ধতি | ছবি : সংগৃহীত
0

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলায় (Joint US-Israel strike) ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশটির ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা (Religious governance system) এখন নতুন নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। প্রায় চার দশক ধরে কঠোর নিয়ন্ত্রণে দেশ পরিচালনা করা খামেনি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো উত্তরসূরি (Official successor) ঘোষণা করে যাননি।

নেতৃত্ব নির্বাচনে ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’-এর ভূমিকা

খামেনির মৃত্যুর ফলে ইরানে যে নেতৃত্ব শূন্যতা (Leadership vacuum) তৈরি হয়েছে, তা সংবিধান অনুযায়ী পূরণ করবে ৮৮ সদস্যের নির্বাচিত ধর্মীয় পরিষদ 'অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস' (Assembly of Experts)। এই পরিষদই পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা (Supreme Leader) নির্বাচন করার একক এখতিয়ার রাখে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনটি অতীতের তুলনায় অনেক বেশি জটিল হবে, কারণ পর্দার আড়াল থেকে বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক এলিটদের প্রভাব কাজ করবে।

শাসনতান্ত্রিক সংকট ও উত্তরণের পথ

ইরানের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থায় (Authoritarian rule) ক্ষমতার উৎস হলো সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পদ। খামেনি কোনো নির্দিষ্ট নাম রেখে না যাওয়ায় পরিষদের ভেতরে কট্টরপন্থী ও সমঝোতাকামী গ্রুপগুলোর মধ্যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। পরবর্তী নেতার ওপর নির্ভর করছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি (Nuclear program) এবং মধ্যপ্রাচ্যে দেশটির সামরিক কৌশলের ভবিষ্যৎ।

আরও পড়ুন:

যেভাবে নির্বাচিত হন সর্বোচ্চ নেতা (The Selection Process)

সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, এই পদে কে থাকবেন তা নির্ধারণ করেন বিশেষজ্ঞমণ্ডলী বা অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস (Assembly of Experts) নামে ৮৮ জন ধর্মীয় নেতার একটি পরিষদ। ইরানের ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের (Islamic Revolution) পর আয়াতোল্লা আলি খামেনেই দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পদে আসীন দ্বিতীয় ব্যক্তি।

এই মণ্ডলীর সদস্যদের নির্বাচন করা হয় প্রতি আট বছর অন্তর। কিন্তু কারা গোষ্ঠীর সদস্য পদের জন্য প্রার্থী হতে পারবেন তা নির্ভর করে দেশটির গার্ডিয়ান কাউন্সিল (Guardian Council) নামে একটি কমিটির অনুমোদনের ওপর। আর এই গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সদস্যদের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্বাচন করেন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা।

আরও পড়ুন:

খামেনির প্রভাব ও সাংবিধানিক জটিলতা

অর্থাৎ এই দুটি পরিষদ বা মণ্ডলীর ওপর সর্বোচ্চ নেতার বিশাল প্রভাব থাকে। গত তিন দশক ধরে আলী খামেনি নিশ্চিত করেছেন যে বিশেষজ্ঞ মণ্ডলীর নির্বাচিত সদস্যরা যেন রক্ষণশীল (Conservative) হয় - যারা তার উত্তরসূরি নির্বাচনের সময় তারই নির্দেশ মেনে চলবে। নির্বাচিত হবার পর, সর্বোচ্চ নেতা তার পদে আজীবন বহাল (Life term) থাকতে পারেন।

ইরানের সংবিধান (Constitution of Iran) অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা হতে হবে একজন আয়াতুল্লাহকে (Ayatollah), অর্থাৎ যিনি একজন শীর্ষস্থানীয় শিয়া ধর্মীয় নেতা। কিন্তু আলী খামেনিকে যখন নির্বাচন করা হয়েছিল, তিনি আয়াতুল্লাহ ছিলেন না। তখন তিনি যাতে এই দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন, তার জন্য আইন পরিবর্তন (Law amendment) করা হয়েছিল।

ইরানের নেতৃত্ব নির্বাচনের প্রধান অঙ্গসমূহ

পরিষদ/ব্যক্তি সদস্য সংখ্যা/পরিচয় মূল দায়িত্ব (Role)
অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস ৮৮ জন ধর্মীয় নেতা সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন ও তদারকি
গার্ডিয়ান কাউন্সিল ১২ জন সদস্য প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই ও অনুমোদন
সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি রাষ্ট্রের সকল বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দান

আরও পড়ুন:

ইরানের নেতৃত্ব ও ক্ষমতা কাঠামো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নোত্তর-FAQ

প্রশ্ন: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা (Supreme Leader) আসলে কে নির্বাচন করেন?

উত্তর: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা কোনো সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত হন না। তাকে নির্বাচন করে ৮৮ জন বিশিষ্ট আলেমের সমন্বয়ে গঠিত 'অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস' (Assembly of Experts) বা বিশেষজ্ঞ পরিষদ।

প্রশ্ন: বিশেষজ্ঞ পরিষদের (Assembly of Experts) সদস্যদের কারা নির্বাচন করে?

উত্তর: বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্যরা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন। তবে শর্ত হলো, কারা প্রার্থী হতে পারবেন তা আগে থেকে 'গার্ডিয়ান কাউন্সিল' (Guardian Council) কর্তৃক অনুমোদিত হতে হয়।

প্রশ্ন: ইরানের গার্ডিয়ান কাউন্সিল (Guardian Council) কতটা ক্ষমতাধর?

উত্তর: এটি ১২ সদস্যের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী কমিটি। এর কাজ হলো নির্বাচনের প্রার্থীদের যোগ্যতা যাচাই করা এবং সংসদের আইনগুলো ইসলামি বিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না তা দেখা। এই কাউন্সিলের ওপর সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার প্রভাব থাকে।

প্রশ্ন: আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি কি আজীবন ক্ষমতায় থাকবেন?

উত্তর: হ্যাঁ, ইরানের আইন অনুযায়ী একবার সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করা পর্যন্ত নিজ পদে বহাল থাকতে পারেন।

প্রশ্ন: সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার জন্য কি 'আয়াতুল্লাহ' হওয়া বাধ্যতামূলক?

উত্তর: ইরানের মূল সংবিধানে 'আয়াতুল্লাহ' (শীর্ষ শিয়া আলেম) হওয়া বাধ্যতামূলক ছিল। তবে ১৯৮৯ সালে আলী খামেনিকে সুযোগ করে দিতে সংবিধানে সংশোধনী আনা হয়েছিল, যাতে যোগ্য মনে করলে কম পদমর্যাদার আলেমও নেতা হতে পারেন।

প্রশ্ন: ইরানের প্রেসিডেন্ট ও সর্বোচ্চ নেতার মধ্যে ক্ষমতার পার্থক্য কী?

উত্তর: প্রেসিডেন্ট হলেন সরকারের প্রধান (Head of Government), যিনি প্রশাসনিক কাজ তদারকি করেন। আর সর্বোচ্চ নেতা হলেন রাষ্ট্রের প্রধান (Head of State), যার হাতে সামরিক বাহিনী, বিচার বিভাগ এবং পররাষ্ট্রনীতির চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ থাকে।

প্রশ্ন: খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি কি পরবর্তী নেতা হতে পারেন?

উত্তর: এটি নিয়ে ব্যাপক জল্পনা রয়েছে। মোজতবা খামেনি পর্দার আড়াল থেকে অত্যন্ত ক্ষমতাধর এবং সামরিক বাহিনীর (IRGC) সাথে তাঁর সুসম্পর্ক রয়েছে। তবে ইরানে বংশগত উত্তরাধিকারের কোনো আনুষ্ঠানিক নিয়ম নেই।

প্রশ্ন: ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যুতে উত্তরসূরি নির্বাচনে কী প্রভাব পড়েছে?

উত্তর: ইব্রাহিম রাইসিকে খামেনির সবচেয়ে বিশ্বস্ত উত্তরসূরি মনে করা হতো। তাঁর মৃত্যুতে এখন মোজতবা খামেনি বা আলী রেজা আরাফির মতো ব্যক্তিদের নাম সামনের সারিতে চলে এসেছে, যা রাজনৈতিক সমীকরণকে বদলে দিয়েছে।

প্রশ্ন: ইরানের জনগণ কি সরাসরি সর্বোচ্চ নেতাকে ভোট দিতে পারে?

উত্তর: না, সাধারণ জনগণ সরাসরি সর্বোচ্চ নেতাকে ভোট দিতে পারে না। তারা শুধু বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্যদের ভোট দেয়, যারা পরবর্তীতে সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করেন।

প্রশ্ন: ইরানের বিপ্লবী গার্ড (IRGC) কি নেতা নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করে?

উত্তর: আনুষ্ঠানিকভাবে নয়, তবে বাস্তবে আইআরজিসি ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি। বিশেষজ্ঞ পরিষদের সদস্যদের ওপর তাদের বিশাল প্রভাব থাকে, তাই তাদের সমর্থন ছাড়া কেউ সর্বোচ্চ নেতা হওয়া প্রায় অসম্ভব।

এসআর