কেন ভূমিকম্প হলে সবাই টের পান না?

ভূমিকম্প
ভূমিকম্প | ছবি: এখন টিভি
0

‘কখন ভূমিকম্প হলো কিছুই জানলাম না’, ‘ঘুম থেকে উঠে ফেসবুকে দেখছি দেশ কেঁপে গেছে, কিন্তু আমি তো কিছুই টের পাইনি!’ ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এমন অসংখ্য মন্তব্য প্রায়ই চোখে পড়ে। একই সময়ে, একই শহরে, এমনকি একই বাড়িতে থেকেও কেন একজন আতঙ্কে ঘর থেকে বের হয়ে যান, আর অন্যজন কিছুই টের পান না?

একই ভূমিকম্প সবাই টের না পাওয়ার প্রধান কারণ (Why some people don't feel earthquakes)

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একই কম্পন সবার সমভাবে অনুভব করতে না পারার পেছনে মূলত দুটি প্রধান কারণ কাজ করে: ব্যক্তির শারীরিক সংবেদনশীলতা এবং ভূমিকম্পের সময় তার অবস্থান।

আরও পড়ুন:

১. মোশন সেনসিটিভিটি বা গতির সংবেদনশীলতা (Motion sensitivity in humans)

মানুষের শরীরের উদ্দীপনা বা গতি গ্রহণের ক্ষমতা এক নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স ডিপার্টমেন্টের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. শাখাওয়াত হোসেন জানান, কিছু মানুষ মোশন বা গতির প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল (Highly sensitive to motion)। হালকা ঝাঁকুনিতেই তাদের শরীর প্রতিক্রিয়া দেখায়। অন্যদিকে অনেকের এই সংবেদনশীলতা কম থাকায় মৃদু বা মাঝারি কম্পন তাদের স্নায়ু সহজে ধরতে পারে না।

২. ভবনের উচ্চতা বা তলার পার্থক্য (Effect of building floor level)

আপনি ভবনের কত তলায় অবস্থান করছেন, তার ওপর ভূমিকম্পের তীব্রতা অনুভবের বিষয়টি অনেকাংশেই নির্ভর করে। বহুতল ভবনের যত ওপরের দিকে (Higher floors) থাকা যাবে, দুলুনি বা ঝাঁকুনি তত বেশি অনুভূত হবে। তুলনামূলকভাবে নিচতলায় বা মাটির কাছাকাছি থাকলে হালকা কম্পন টের পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক কম থাকে।

৩. তাৎক্ষণিক শারীরিক অবস্থা বা ব্যস্ততা (Physical activity during earthquake)

ভূমিকম্পের মুহূর্তে ব্যক্তি কী করছিলেন, তাও একটি বড় ফ্যাক্টর। যিনি চুপচাপ টেবিলে বসে কাজ করছেন বা বিছানায় বিশ্রাম নিচ্ছেন (Resting or sitting stationary), তার কম্পন টের পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। পক্ষান্তরে, যিনি হাঁটছেন, রান্না করছেন, সিঁড়ি দিয়ে নামছেন বা কোনো কায়িক শ্রমে ব্যস্ত আছেন, তার শরীর নিজস্ব গতির কারণে ভূ-কম্পনের বাহ্যিক গতিটি আলাদাভাবে অনুধাবন করতে পারে না।

আরও পড়ুন:

বাংলাদেশ কতটা ভূমিকম্প ঝুঁকিতে? (Earthquake vulnerability of Bangladesh)

ভৌগোলিক গঠনের কারণে বাংলাদেশ একটি অত্যন্ত ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চল (Earthquake-prone region)। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ফারজানা সুলতানা জানান, ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান এবং বার্মা—এই তিনটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে (Junction of three tectonic plates) বাংলাদেশের অবস্থান। এছাড়া দেশের ভেতরে ও সীমানার ঠিক বাইরে বড় বড় ফল্ট লাইন বা ভূ-ফাটল রয়েছে।

ডাউকি ফল্ট (Dauki Fault): এটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বিপজ্জনক ফল্ট লাইন, যা শেরপুর থেকে শুরু হয়ে জাফলং হয়ে ভারতের করিমগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তৃত।

দূরবর্তী উৎপত্তিস্থলের প্রভাব (Impact of distant epicenters): বাংলাদেশে বড় ঝাঁকুনি তৈরি হওয়ার জন্য উৎপত্তিস্থল দেশের ভেতরেই হতে হবে এমন নয়। তিব্বতের শিগেৎসে (৬১৮ কিমি দূরে) কিংবা মায়ানমারের হোমালিনে (৪৮২ কিমি দূরে) হওয়া শক্তিশালী ভূমিকম্পের কম্পনও ঢাকার মানুষ তীব্রভাবে টের পায়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, মায়ানমার বা নেপালে ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প (7 magnitude earthquake) হলে তার বড় প্রভাব বাংলাদেশে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভৌগোলিক দিক থেকে বাংলাদেশ জাপানের মতো অতি-ঝুঁকিপূর্ণ না হলেও মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ (Moderately earthquake-prone country)। তবে আমাদের প্রধান সমস্যা হলো অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং সঠিক বিল্ডিং কোড (National Building Code) না মানা, যা বড় বিপর্যয়ের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

আরও পড়ুন:

যেভাবে মাপা হয় ভূমিকম্প: রিখটার স্কেল বনাম মোমেন্ট ম্যাগনিটিউড স্কেল (How earthquakes are measured)

ভূমিকম্পের তীব্রতা ও শক্তি পরিমাপের জন্য বর্তমানে মোমেন্ট ম্যাগনিটিউড স্কেল (Moment Magnitude Scale) ব্যবহার করা হয়, যা সনাতন রিখটার স্কেলকে (Richter scale) প্রতিস্থাপন করেছে। এই স্কেলের সংখ্যাগুলো নির্দেশ করে ভূ-অভ্যন্তরের ফল্ট লাইন কতটুকু সরেছে এবং তার পেছনে কত শক্তি কাজ করেছে।

১. ২.৫ বা তার কম (Micro Earthquakes)

এই মাত্রার ভূমিকম্পগুলো এতটাই মৃদু যে সাধারণত মানুষ টের পায় না (Detected only by seismograph)। তবে মাটির নিচে হওয়া এই মৃদু কম্পনগুলো সিসমোগ্রাফ যন্ত্রে নিখুঁতভাবে ধরা পড়ে। প্রতিদিন বিশ্বজুড়ে এমন হাজার হাজার ছোট কম্পন তৈরি হচ্ছে।

২. ৫.০ থেকে ৫.৭ মাত্রা (Moderate Earthquake)

এটিকে মাঝারি মাত্রার কম্পন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই মাত্রার ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল (Epicenter) যদি জনবসতির কাছাকাছি হয়, তবে বেশ ভালো ঝাঁকুনি অনুভূত হয়। এর ফলে কাঁচা বাড়িঘর, পুরোনো দেওয়াল বা দুর্বল অবকাঠামোর সামান্য ক্ষতি হতে পারে (Moderate damage to weak structures), তবে বড় কোনো বিপর্যয়ের আশঙ্কা সাধারণত থাকে না।

৩. ৭.৮ বা তার বেশি (Powerful and Severe Earthquake)

এটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রলয়ংকরী ভূমিকম্প। এই মাত্রার কম্পন আঘাত হানলে বহুতল ভবন ধসে পড়া সহ মারাত্মক ধরনের জাতীয় ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয় (Massive casualties and infrastructure collapse)। উৎপত্তিস্থল থেকে বহুদূর পর্যন্ত এর ধ্বংসলীলা ছড়িয়ে পড়তে পারে।

আরও পড়ুন:

৪. ৮.০ বা তার বেশি (Great/Mega Earthquake)

এটি ভূমিকম্পের মহাবিপর্যয়কারী বা সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ। ৮ বা তার বেশি মাত্রার কম্পন শুরু হলে মুহূর্তের মধ্যে পৃথিবীর রূপ বদলে যেতে পারে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ কেন্দ্রের আশেপাশের সমস্ত অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস (Complete destruction of infrastructure) হয়ে যেতে পারে। রাস্তাঘাট ফেটে যাওয়া, নদী বা সমুদ্রের গতিপথ পরিবর্তন এবং সুনামি সৃষ্টির মতো ভয়ানক দুর্যোগের জন্ম দেয় এই মাত্রার ভূমিকম্প।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া যেহেতু এখনো সম্ভব নয়, তাই যেকোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে একমাত্র উপায় হলো সচেতনতা। ভবন নির্মাণে সঠিক কোড (Building Code) মেনে চলা এবং কম্পনের সময় 'ড্রপ, কভার অ্যান্ড হোল্ড অন' (Drop, Cover, and Hold on) পদ্ধতি অনুসরণ করার মাধ্যমে বহু মানুষের প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। দুটি টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থল বা সাবডাকশন জোনে (Subduction zone) সাধারণত বড় আকারের দুটি ভূমিকম্পের মাঝখানে সময়ের ব্যবধান থাকে ৮০০ থেকে ৯০০ বছর। তাই যেকোনো সময়ের বড় ধাক্কা সামলাতে এখন থেকেই সচেতনতা এবং নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করা জরুরি।

আরও পড়ুন:

একনজরে ভূমিকম্পের অনুভূতি ও বাংলাদেশের সার্বিক ঝুঁকি (Earthquake Feelings & Bangladesh Risk Profile at a Glance)

কেন একই ভূমিকম্প সবাই টের পান না? জানুন বৈজ্ঞানিক কারণ ও বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকি।

মূল বিষয়াবলী
(Key Topics)
বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা ও ঝুঁকির বিবরণ
(Scientific Explanation & Risk Details)
প্রভাব ও মাত্রা
(Impact & Scale)
অনুভূতির তারতম্য
(Vibration Feeling)
ব্যক্তির নিজস্ব মোশন সেনসিটিভিটি বা গতির সংবেদনশীলতা কম থাকা। এছাড়া ব্যক্তি যদি হাঁটাচলা বা কায়িক শ্রমে ব্যস্ত থাকেন তবে কম্পন টের পান না। শারীরিক সংবেদনশীলতা
অবস্থানের প্রভাব
(Floor Location)
ভবনের যত ওপরের তলায় মানুষ অবস্থান করবে, দুলুনি বা ঝাঁকুনি তত বেশি তীব্র হবে। গ্রাউন্ড ফ্লোর বা নিচতলায় ঝাঁকুনি অনেক সময় বোঝাই যায় না। ওপরের তলায় বেশি অনুভূত
প্লেট বা ফল্ট লাইন
(Tectonic Plates)
বাংলাদেশ ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মা এই তিনটি প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। দেশের প্রধান ফল্ট লাইনটি হলো 'ডাউকি ফল্ট' যা শেরপুর থেকে জাফলং হয়ে ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত। ৩টি প্লেটের সংযোগস্থল
বাংলাদেশের ঝুঁকি
(Bangladesh Risk)
ভৌগোলিকভাবে দেশ মাঝারি ভূমিকম্পপ্রবণ (Moderately earthquake-prone)। তবে অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ ও বিল্ডিং কোড না মানার কারণে এখানে জানমালের ঝুঁকি অত্যন্ত তীব্র। মাঝারি থেকে উচ্চ ঝুঁকি
তীব্রতা পরিমাপ
(Measurement Scale)
ভূমিকম্প মাপতে আধুনিক 'মোমেন্ট ম্যাগনিটিউড স্কেল' ব্যবহৃত হয়। ৫ মাত্রায় হালকা ক্ষতি হলেও ৭.৮ বা তার বেশি মাত্রার কম্পন অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে পারে। মোমেন্ট ম্যাগনিটিউড স্কেল

আরও পড়ুন:


এসআর