১৯৯১ সালের এই দিনে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ভয়াবহ জলোচ্ছ্বাস নিয়ে আঘাত হানে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে। বিশেষ করে কক্সবাজার, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, টেকনাফ ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে নেমে আসে এক ভয়ংকর মানবিক বিপর্যয়। সরকারি ও বিভিন্ন বেসরকারি সূত্র মতে, এই দুর্যোগে প্রায় এক লাখ ৩৮ হাজারেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারান। হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ হন, যাদের অনেকের মরদেহও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। অসংখ্য পরিবার মুহূর্তেই হারিয়ে ফেলে তাদের প্রিয়জন, ঘরবাড়ি ও জীবিকার অবলম্বন।
সেই রাতে পাঁচ থেকে আট মিটার উচ্চতার জলোচ্ছ্বাস উপকূলীয় জনপদকে গ্রাস করে নেয়। উত্তাল সাগরের ঢেউ মুহূর্তের মধ্যে তলিয়ে দেয় গ্রামের পর গ্রাম। কক্সবাজার উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে চলে যায়। ধ্বংস হয়ে যায় হাজার হাজার ঘরবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট, বেড়িবাঁধ ও অন্যান্য অবকাঠামো। প্রায় এক কোটি মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়ে। লক্ষাধিক গবাদিপশু মারা যায়। ফসলের মাঠ, লবণ চাষ ও চিংড়ি ঘের ধ্বংস হওয়ায় উপকূলজুড়ে নেমে আসে চরম খাদ্য ও অর্থনৈতিক সংকট।
আরও পড়ুন:
৩৫ বছর পরও সেই বিভীষিকাময় রাতের স্মৃতি ভুলতে পারেননি উপকূলের মানুষ। এখনো অনেক পরিবার স্বজন হারানোর বেদনা বয়ে বেড়াচ্ছে। প্রতি বছর ২৯ এপ্রিল এলেই নতুন করে জেগে ওঠে আতঙ্ক আর শোকের স্মৃতি। অনেক প্রবীণ মানুষ এখনো সেই রাতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। কেউ হারিয়েছেন সন্তান, কেউ বাবা-মা, আবার কেউ পুরো পরিবার।
এদিকে এত বছর পেরিয়ে গেলেও উপকূলীয় অঞ্চলে টেকসই ও কার্যকর বেড়িবাঁধ নির্মাণ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। ফলে সামান্য ঘূর্ণিঝড় বা জলোচ্ছ্বাসের আশঙ্কা দেখা দিলেই আতঙ্কে দিন কাটাতে হয় উপকূলবাসীকে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি ও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বাড়ায় ঝুঁকিও বাড়ছে প্রতিনিয়ত।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নূরুল ইসলাম জানিয়েছেন, জেলায় বর্তমানে মোট ৩৮০ দশমিক ২৯৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এর মধ্যে টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলায় সম্প্রতি ৬০ দশমিক ৭৩০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। তবে কুতুবদিয়া ও মাতারবাড়ী এলাকায় প্রায় ৪০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ এখনো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। দ্রুত সংস্কার না করলে যেকোনো দুর্যোগে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। এসব এলাকায় শত শত পরিবার চরম ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে।
আরও পড়ুন:
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, শুধু অস্থায়ী সংস্কার নয়, উপকূল রক্ষায় প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শক্তিশালী বেড়িবাঁধ নির্মাণ, পর্যাপ্ত সাইক্লোন শেল্টার, দ্রুত উদ্ধার ব্যবস্থা এবং কার্যকর আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। পাশাপাশি উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষায় বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তারা।
উপকূলবাসীর মতে, ১৯৯১ সালের সেই ভয়াল রাত শুধু একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না, ছিল হাজারো মানুষের জীবনের অপূরণীয় ক্ষতির ইতিহাস। তাই ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয় মোকাবিলায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আরও বড় মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা থেকে যাবে।
এদিকে ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে নিহতদের স্মরণে বুধবার বিকেল ৪টায় কক্সবাজার জেলা পরিষদ সম্মেলন কক্ষে কুতুবদিয়া সমিতি কক্সবাজারের উদ্যোগে স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করা হবে এবং উপকূল রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানানো হবে।





