মৃত সন্তানের পাশে তিন দিন পাহারা; হাতি দম্পতির নিঃশব্দ শোক

বাচ্চা হাতির মরদেহ পাহারা
বাচ্চা হাতির মরদেহ পাহারা | ছবি: এখন টিভি
0

বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সোনাইছড়ি ইউনিয়নের মারাগ্য পাড়া এলাকায় এক হৃদয়স্পর্শী দৃশ্যের সাক্ষী হয়েছেন স্থানীয়রা। একটি মৃত বাচ্চা হাতিকে ঘিরে টানা তিন দিন ধরে পাহারা দিয়েছে একটি হাতি দম্পতি, যা এলাকাজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, গত মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সকালে একটি মাছের প্রজেক্ট এলাকায় বাচ্চা হাতিটির মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়। সেই সময় থেকেই দুটি পরিণত হাতি মরদেহটির পাশে অবস্থান নেয় এবং কাউকে কাছে ঘেঁষতে দেয়নি। ধারণা করা হচ্ছে, মৃত বাচ্চাটি ওই হাতি দম্পতিরই সন্তান।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হাতি দু’টি প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে মৃত শাবকটির পাশে অবস্থান করেছে, যেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাকে রক্ষা করার চেষ্টা করছে। এই বিরল আচরণ স্থানীয়দের মধ্যে একদিকে যেমন বিস্ময় সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে গভীর আবেগও ছুঁয়ে গেছে অনেককে।

টানা তিন দিন পাহারা দেয়ার পর বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সকালে হাতি দুটি ধীরে ধীরে গভীর জঙ্গলে চলে যায়। পরে বন বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে পৌঁছে মৃত বাচ্চা হাতিটির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করে যথাযথভাবে মাটি চাপা দেন।

স্থানীয়রা জানায়, কয়েকদিন ধরে একটি হাতির পাল লোকালয়ে ঢুকে পড়েছিল। মানুষের তাড়া খেয়ে পালটি গহীন পাহাড়ে ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। গত মঙ্গলবার হাতির পালটি ফিরে যাওয়ার সময় সোনাইছড়ির মারাগ্য পাড়ার পশ্চিম পাশে মংবেছা মেম্বারের গোদার পাড় এলাকায় একটি মাছের প্রজেক্টে পড়ে যায়।

তবে মা হাতি আশপাশে অবস্থান করায় ভয়ে কেউ উদ্ধার কাজে এগিয়ে যেতে পারেনি। পরে স্থানীয়রা বনবিভাগের মানুষকে খবর দিলে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে মৃত বাচ্চা হাতিকে ঘিরে দু’টি হাতিকে পাহারা দিতে দেখে কাছে যেতে না পেরে ফিরে যায়।

বুধবার সকালে গিয়েও একই অবস্থা দেখে চলে আসে পরে বৃহস্পতিবার সকালে গিয়ে হাতি দু’টিকে না দেখে মৃত বাচ্চা হাতিটির ময়না তদন্ত করে মাটি চাপা দিয়ে দেন।

আরও পড়ুন:

সোনাইছড়ি ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দা ডাক্তার ছ্যালা থোয়াই মার্মা বলেন, ‘গত কয়েকদিন ধরে হাতির পালটি লোকালয়ে ঘোরাফেরা করছিল। মানুষের চাপে তারা দিকভ্রান্ত হয়ে পড়ে। গর্তে পড়ে যাওয়ার পরও মা হাতির উপস্থিতির কারণে কেউ এগোতে পারেনি। পরে বাচ্চাটি মারা গেলে মৃত বাচ্চা হাতিটির পাহারায় হাতি দম্পতি পাশে দাড়িয়ে থাকে। বনবিভাগের মানুষদের খবর দিলে তারা এসে পরিস্থিতি দেখে যায়।’

এ বিষয়ে নাইক্ষ্যংছড়ি বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা তানভীর হোসেন বলেন, ‘খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলাম কিন্তু দুইটি হাতি পাহারায় থাকায় আমরা ফিরে আসি। পরে কক্সবাজার দক্ষিণ বনাঞ্চলের কর্মকর্তাদের খবর দিলে বৃহস্পতিবার তারাসহ গিয়ে ময়নাতদন্ত করে মাটি চাপা দিয়ে দেই। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়া গেলে মৃত্যুর কারণ জানা যাবে। যদি কেউ আক্রমণ করে মেরে থাকে তাহলে আমরা আসামি খুঁজে মামলা দায়ের করবো।’

উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় কেটে বনভূমি উজাড় করার ফলে হাতির স্বাভাবিক আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। খাদ্যের অভাবে হাতির পাল লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে, যার ফলে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে সংঘাত বাড়ছে।

এসএস