আজ (বুধবার, ১৪ জুলাই) ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরএনএ-তে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, ‘আঞ্চলিক জ্বালানি রপ্তানির সুযোগ হয় সবাই পাবে, নয়তো কেউই পাবে না।’
বিশ্লেষকদের ধারণা, ইয়েমেনের হুতি মিত্রদের কাজে লাগিয়ে লোহিত সাগরের বাব-এল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে ইরান। এর মধ্য দিয়ে ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে নতুন একটি ফ্রন্ট খোলার পাশাপাশি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি জ্বালানি সরবরাহ পথ ঝুঁকিতে ফেলছে তারা। সরু এই জলপথ লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরকে যুক্ত করেছে, যার মধ্য দিয়ে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের বড় একটি অংশ পরিবাহিত হয়।
সোমবার হুতিদের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, সৌদি আরব যদি ইয়েমেনে হামলা অব্যাহত রাখে, তবে তারা বাব-এল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দিতে প্রস্তুত। এই পদক্ষেপের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ইরানের প্রেস টিভির প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
সোমবার নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা একটি বিমানবন্দরে বোমা হামলার অভিযোগ তুলে সৌদি আরবে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে হুতিরা। এর মধ্য দিয়ে দুই পক্ষের চার বছরের যুদ্ধবিরতি ভন্ডুল হয়ে যায়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে লোহিত সাগরে ইসরাইল-সংশ্লিষ্ট বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে আসছে ইরান-সমর্থিত এই গোষ্ঠী।
বৈশ্বিক জাহাজ চলাচলের ওপর এই নতুন হুমকির এক দিন আগেই মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলায় ব্যবহৃত ইরানের সক্ষমতা কমাতে তারা নতুন করে হামলা শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, গত সপ্তাহে ইরান অন্তত সাতটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছে, যার ফলে প্রায় এক ডজন নাবিক নিহত, নিখোঁজ বা আহত হয়েছেন।
আরও পড়ুন:
মঙ্গলবার রাতে হরমুজ প্রণালি ও ইরানের উপকূলীয় অঞ্চলে কয়েক ডজন সামরিক স্থাপনায় হামলার কথা জানিয়েছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই হামলা টানা সাত ঘণ্টা ধরে চলে।
বুধবার ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি জানান, দক্ষিণ ইরানে মার্কিন হামলায় সাম্প্রতিক দিনগুলোতে অন্তত ৩০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বাম্পুর সামরিক ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের এক রাতের হামলায় তাদের অন্তত সাতজন নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক সামরিক সদস্য নিহত হয়েছেন।
বুধবার আইআরজিসি জানিয়েছে, ‘যুক্তরাষ্ট্রের অপকর্মের অবসান’ না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো।
হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ হামলার জবাবে বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল, লজিস্টিকস, জ্বালানি ও সামরিক সরঞ্জামের স্থাপনায় হামলার দাবি করেছে তারা। এছাড়া কুয়েতের মিনা আবদুল্লাহতে একটি মার্কিন লজিস্টিক স্থাপনা ধ্বংস এবং জর্ডানের আজরাকে মার্কিন ঘাঁটির উড়োজাহাজের হ্যাঙ্গারে হামলার দাবি করেছে আইআরজিসি। তাদের দাবি, জর্ডানের ওই ঘাঁটি থেকে কিছু মার্কিন হামলা চালানো হয়েছিল।
আরও পড়ুন:
তবে কুয়েতের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, হামলায় শিকার একটি স্থাপনায় লাগা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। অন্যদিকে জর্ডানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বুধবার ভোরে ইরান থেকে আসা তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে।
গত জুন মাসে পৌঁছানো যুদ্ধবিরতি ভেঙে গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে পুনরায় বৈরিতা শুরু হয়, যার ফলে এরই মধ্যে হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
মঙ্গলবার ফক্স নিউজের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেছেন, তেহরান আলোচনা শুরু না করলে আগামী সপ্তাহে ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলোতে হামলা চালানো হবে। তিনি বলেন, ‘আমি জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে শেষের জন্য রেখে দিয়েছি, তবে শেষ পর্যন্ত আমরা সেখানে হামলা চালাব।’
মার্কিন মধ্যস্থতাকারীরা ইরানি পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর তাগিদ দিয়েছেন বলেও জানান ট্রাম্প। উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে সোমবার প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের ওপর ২০ শতাংশ ফি আরোপের কথা তুলেছিলেন তিনি। তবে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন পক্ষের সমালোচনার মুখে মঙ্গলবার তিনি সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে জানান, এর বদলে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে বিনিয়োগ চুক্তির চেষ্টা করবেন তিনি।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বুধবার বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়েছে। মঙ্গলবার তেলের দাম ২ শতাংশ বেড়ে এক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। টানা দ্বিতীয় সেশনে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১২ জুনের পর এবং ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দাম ১৫ জুনের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।





