সব যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি শুধু মানবিক সংকট বা হতাহতের সংখ্যায় মাপা যায় না। তেমনি করে ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে।
ইরান যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক মন্দা শুরু হয়েছে। জ্বালানির দাম বেড়েছে, রপ্তানি প্রক্রিয়া মারাত্মক ব্যাহত হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে রাশিয়া-চীনের জন্য নতুন কৌশলগত সুযোগ তৈরি হয়েছে। সরাসরি যুদ্ধে না জড়ালেও চীন তেহরানকে কৌশলগত সহায়তা দিয়ে বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন এনেছে। প্রশ্ন উঠেছে এসব জটিল ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির সমাধান কীসে? আদৌ সমাধান আছে কি?
ইরান যাতে পারমাণবিক পরাশক্তি না হতে পারে এ উদ্দেশ্যে যুক্ত্ররাষ্ট্র সরাসরি দেশটির সঙ্গে যুদ্ধে জড়ায়। এতে ইরানি শাসনব্যবস্থাকে ভাঙার মার্কিন উদ্দেশ্য চরিতার্থ না হলেও পুরো পশ্চিমা জোটকেই এক নতুন বাস্তবতার সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে তেহরান। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়। সংঘাতের মূল্য দিতে হয়েছে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মার্কিন সহযোগীদেরও।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালি। এছাড়াও মতবিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে, তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, এবং আটকে থাকা ইরানি সম্পদ ছাড়ের মতো বিষয়গুলো।
আঞ্চলিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, দু’দেশের বেশিরভাগ সমস্যাগুলো এখনও অমীমাংসীত। নির্দিষ্ট কিছু ছাড় দিয়ে তারা কেবল একটি অস্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছেছে। এই সংকটের পরবর্তী অধ্যায় ভবিষ্যতে আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আরও পড়ুন:
যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট দাবি, অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে হলে ইরানকে কেবল পরমাণু কার্যক্রম সীমিত করলেই চলবে না, তাদের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থনের নীতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। পাশাপাশি ইরান হরমুজে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ও টোল আদায়ের বিষয়ে অনড়, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও গ্রহণযোগ্য নয়। শান্তি প্রতিষ্ঠায় আঞ্চলিক দেশগুলোর ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা নিয়েও মতপার্থক্য রয়েছে।
স্থায়ী বা চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে দু’পক্ষকেই অনেক বেশি কৌশলগত ছাড় দিতে হবে। সেক্ষেত্রে নিজেদের তুরুপের তাস হরমুজ নিয়ে সবসময়ই দরষাকষিতে এগিয়ে থাকবে ইরান। পাশাপাশি গত কয়েক দশক ইরান নিজেদের পারমানবিক স্থাপণা ছাড়াও অন্যান্য ভূগর্ভস্থ অস্ত্রভাণ্ডার এমনভাবে সুরক্ষিত করেছে তাতে একাধিক পারমাণবিক হামলা চালিয়েও দেশটির মূল শক্তিমত্তা সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় করা অত্যন্ত কঠিন। দেশটির বেশিরভাগ সামরিক অবকাঠামো জাদরোস পর্বতশ্রেণীর অত্যন্ত গভীরে ভূগর্ভস্থ টানেল নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের রয়েছে গভীর প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও ভূ-রাজনৈতিক বিকল্প শক্তি।
বিপরীতে যুদ্ধের শুরুতে নিজেদের হতাহত এবং যুদ্ধের অকল্পনীয় ব্যয়ের দিক মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না যুক্তরাষ্ট্র- ইসরাইল। বিপরীতে ইরান দেখিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিতে তারা প্রস্তুত। হাজার হাজার বেসামরিক হতাহত, কয়েক ডজন বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মৃত্যুও তাদের সংকল্প ভাঙতে পারেনি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক গণমাধ্যম নেটওয়ার্কের তৈরি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সাময়িকভাবে অস্থিতিশীল করলেও ইরানের প্রতিরোধের মনোবল ভাঙতে পারেনি।
এই যুদ্ধ উদাহরণ তৈরি করেছে, যুদ্ধ শুরু করার চেয়ে তা থেকে বেরিয়ে আসা বেশি কঠিন। সামরিক অভিযান শুরু করা সহজ, কিন্তু তা শেষ করা অনেক বেশি কঠিন। বিশেষ করে যখন তার মূল উদ্দেশ্যগুলো অনর্জিত থেকে যায়। ইরানকে গুঁড়িয়ে দেয়ার প্রচেষ্টা বারবার ব্যর্থ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র এই পরিস্থিতিরই সম্মুখীন হয়েছে।
পিছু হটা বা আপোসের চড়া মূল্য রয়েছে। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক তা ঝুঁকিও বয়ে আনে। এরকম আলোচনাকে জনগণ, রাজনৈতিক বিরোধীরা দুর্বলতা হিসেবে দেখে। যুক্তরাষ্ট্র দেখিয়েছে, যুদ্ধে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলেও তা যদি খুব বেশি ব্যয়বহুল হয় তবে তারা পিছু হটতে বাধ্য।
এমন প্রেক্ষাপটে সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন একটি কূটনীতি ও প্রযুক্তিগত চ্যালেঞ্জ। কেননা এরই মধ্যে প্রমাণ হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানকে দমনে ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু দেশটি এখনও দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ এড়িয়ে নিজ অবস্থানে অটল।




