ইরানের হামলায় ২০ মার্কিন সামরিক স্থাপনায় বড় ধরনের ক্ষতি: বিবিসির বিশ্লেষণ

সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটির স্যাটেলাইট চিত্র
সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমান ঘাঁটির স্যাটেলাইট চিত্র | ছবি: সংগৃহীত
0

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ২০ মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে ক্ষতিসাধন করেছে ইরান। বিবিসি ভেরিফাইয়ের বিশ্লেষণ করা স্যাটেলাইট চিত্র ও ভিডিওতে এমন তথ্যই উঠে এসেছে। এর মাধ্যমে ধারণা করা হচ্ছে যে, প্রকাশ্যে যতটুকু স্বীকার করা হয়েছে, বাস্তবে এসব হামলার মাত্রা তার চেয়েও অনেক বেশি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে মধ্যপ্রাচ্যের আটটি দেশে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে আসছে ইরান। এতে অত্যাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, জ্বালানি ভরার উড়োজাহাজ ও রাডারের মতো কোটি ডলারের সরঞ্জাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গত তিন মাসে ইরান ও লেবাননজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার প্রতিশোধ হিসেবে তেহরান এসব মার্কিন ঘাঁটি এবং যৌথ সামরিক স্থাপনাগুলোতে আঘাত হেনেছে। অন্যদিকে পেন্টাগন জানিয়েছে, ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরুর পর থেকে তারা ইরানে ১৩ হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে।

মার্কিন স্থাপনায় নিজেদের সামরিক বাহিনীর সফলতার বিষয়টি জোরালোভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি। সম্প্রতি এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্য এখন আর মার্কিন ঘাঁটির জন্য কোনো নিরাপদ জায়গা নয়।’

হোয়াইট হাউস বারবার দাবি করে আসছে যে, ইরানের সামরিক বাহিনীকে প্রায় ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, মার্কিন স্থাপনাগুলোতে যে মাত্রায় ক্ষতি দেখা গেছে, তাতে প্রমাণ হয় তেহরানের পাল্টা হামলাগুলো মার্কিন কর্মকর্তাদের আগের স্বীকারোক্তির চেয়ে অনেক বেশি ও ব্যাপক ছিল।

বিবিসি ভেরিফাইয়ের এসব তথ্যের বিষয়ে ‘অভিযানগত নিরাপত্তার কারণ’ দেখিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা।

স্যাটেলাইট চিত্রের মাধ্যমে এই সংঘাতের বিশ্লেষণ সীমিত করার উদ্যোগ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এর অংশ হিসেবে ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের বড় অংশের নতুন ছবি প্রকাশের ওপর ‘অনির্দিষ্টকালের’ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে শীর্ষ স্যাটেলাইট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান প্ল্যানেটকে অনুরোধ করেছে তারা। প্রতিষ্ঠানটিও এই পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেছে, তাদের ছবি ব্যবহার করে প্রতিপক্ষ যেন মিত্র, ন্যাটো সহযোগী ও বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন:

ইরানের হামলার ফলে হওয়া ক্ষতির মাত্রা ট্র্যাক করতে প্ল্যানেটের পুরোনো ছবির সঙ্গে অন্যান্য আন্তর্জাতিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করেছে বিবিসি ভেরিফাই। আক্রান্ত এসব মার্কিন স্থাপনা সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ইরাক, জর্ডান, বাহরাইন ও ওমানে অবস্থিত। তবে ক্ষতির প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে, অন্তত ২৮টি ঘাঁটিতে আঘাত হানা হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত মূল্যবান হার্ডওয়্যারগুলোর মধ্যে রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল রুয়াইস ও আল সাদর বিমানঘাঁটি এবং জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটিতে থাকা তিনটি অত্যাধুনিক অ্যান্টি-ব্যালিস্টিক মিসাইল ব্যাটারি ব্যবস্থা। সারা বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র আটটি ‘টার্মিনাল হাই অ্যালটিটিউড এরিয়া ডিফেন্স’ (থাড) ব্যাটারি রয়েছে বলে জানা যায়, যার প্রতিটি তৈরিতে প্রায় ১০০ কোটি ডলার খরচ হয়। এগুলো পরিচালনার জন্য প্রায় ১০০ সেনার প্রয়োজন হয় এবং এর প্রতিটি ইন্টারসেপ্টর বা প্রতিরোধক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়তে খরচ হয় প্রায় ১ কোটি ২৭ লাখ ডলার।

আয়ারল্যান্ডের প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাবেক প্রধান ভাইস-অ্যাডমিরাল মার্ক মেলেট বিবিসি ভেরিফাইকে বলেন, ‘এই ব্যাটারিগুলো অত্যন্ত জটিল আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে, যা দ্রুত বা সহজে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব নয়।’

স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা দেখিয়েছেন যে, সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সরবরাহকারী ও নজরদারি উড়োজাহাজেও ব্যাপকভাবে আঘাত হেনেছে ইরান। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত উড়োজাহাজ ও ধোঁয়াটে গর্ত স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। মায়ারের এক বিশ্লেষক ক্ষতিগ্রস্ত উড়োজাহাজগুলোর একটিকে ই-৩ সেন্ট্রি সার্ভিল্যান্স প্লেন হিসেবে শনাক্ত করেছেন। মার্কিন গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এটি প্রতিস্থাপন করতে প্রায় ৭০ কোটি ডলার খরচ হতে পারে।

এর বাইরে কুয়েতের আলী আল সালেম বিমানঘাঁটি এবং ক্যাম্প আরিফজানেও হামলা চালিয়েছে ইরান। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, এই সংঘাত চলাকালে আলী আল সালেম ঘাঁটিতে কয়েক দফা আঘাত হানা হয়েছে। মায়ারের বিশ্লেষকেরা সেখানে জ্বালানি মজুত করার বাঙ্কার, উড়োজাহাজের হ্যাঙ্গার ও সেনাদের থাকার জায়গা ধ্বংস হওয়ার বিষয়টি শনাক্ত করেছেন। এছাড়া ক্যাম্প আরিফজানে স্যাটেলাইট যোগাযোগের হার্ডওয়্যারের ব্যাপক ক্ষতির কথা জানিয়েছে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা জেনস।

মার্কিন স্থাপনাগুলোর ক্ষতির সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন। তবে মে মাসে পেন্টাগনের এক হিসাবে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ২ হাজার ৯০০ কোটি ডলার। এর বড় অংশই সংঘাতে ধ্বংস হওয়া সরঞ্জামের মেরামত বা প্রতিস্থাপনে ব্যয় হওয়ার কথা। তবে মার্কিন ডেমোক্র্যাটদের দাবি, এই ক্ষতির পরিমাণ সম্ভবত অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও দেখা গেছে, ফেব্রুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত অন্তত ৪২টি উড়োজাহাজ ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে এফ-১৫ ও এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান, ২৪টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন এবং একটি এ-১০ অ্যাটাক প্লেন।

আরও পড়ুন:

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ব্যবহৃত ব্যয়বহুল হার্ডওয়্যারের তুলনায় ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে তাদের হামলায় সস্তা ও সহজে প্রতিস্থাপনযোগ্য ড্রোন ব্যবহার করেছে বলে জানা গেছে।

বিবিসি ভেরিফাইয়ের কাছে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, যুদ্ধের সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ইরানের কৌশলও পরিবর্তিত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে শহর ও ঘাঁটিগুলোতে এলোপাতাড়ি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বদলে তারা এখন অনেক বেশি নিখুঁত ও লক্ষ্যভিত্তিক হামলা চালাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক স্টিমসন সেন্টারের বিশ্লেষক ড. কেলি গ্রিকো বলেন, ‘ইরানের প্রাথমিক হামলাগুলো বড় পরিসরে হয়েছিল—বিপুল সংখ্যার মাধ্যমে আকাশ ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে পরাস্ত করাই ছিল এর মূল লক্ষ্য। তবে কয়েক দিনের মধ্যেই তারা ছোট ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর দিকে সরে আসে। তারা অবশিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলো নির্দিষ্ট ও মূল্যবান লক্ষ্যবস্তুর জন্য সংরক্ষণ করছে এবং এমন জায়গায় আঘাত হানছে, যেখানে লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেও বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে।’

মায়ারের এক বিশ্লেষক বিবিসি ভেরিফাইকে বলেন, ‘তেহরানের কৌশল বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের উড়োজাহাজগুলোকে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার বাইরে সরিয়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছে।’ এটিকে তিনি যুদ্ধের শুরুর দিকের ‘কিছুটা আত্মতুষ্টি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে উড়োজাহাজগুলো ধ্বংস হওয়ার আগেই ওই স্থাপনায় একবার হামলা হয়েছিল।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মুজতবা খামেনি প্রতিজ্ঞা করে বলেন, ‘এই অঞ্চলের দেশ ও ভূমিগুলো আর কখনো মার্কিন ঘাঁটির ঢাল হিসেবে কাজ করবে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই অঞ্চলে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন ও অপকর্ম করার কোনো নিরাপদ জায়গা আর থাকবে না এবং দিন দিন তারা তাদের আগের অবস্থান থেকে আরও দূরে সরে যাবে।’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি নতুন করে সংকটে পড়ার ঠিক কয়েক দিন আগেই তিনি এসব কথা বললেন। বৃহস্পতিবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনার গার্ড কর্পস জানিয়েছে, দক্ষিণ ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে হামলার পর তারা এই অঞ্চলে একটি মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

ড. গ্রিকো সতর্ক করে বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি যদি ভেস্তে যায় এবং লড়াই আবার শুরু হয়, তবে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর বর্তমান ক্ষতির মাত্রা এটাই ইঙ্গিত দেয় যে উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে থাকা স্থাপনাগুলো বেশ ঝুঁকির মুখে পড়বে।’ তিনি বলেন, ‘বর্তমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের অংশীদারদের আকাশ প্রতিরক্ষা মজুত উল্লেখযোগ্য হারে শেষ হয়ে গেছে। এগুলো দ্রুত পূরণের কোনো উপায় নেই। এর অর্থ হলো, ইরান যদি নতুন করে হামলা চালায়, তবে সংঘাত শুরুর সময়ের তুলনায় মাত্র সামান্য কিছু ইন্টারসেপ্টর দিয়েই তাদের মোকাবিলা করতে হবে।

এএম