Recent event

উত্তর কোরিয়ায় ক্ষমতার পারিবারিক লড়াই; আরও একবার সহিংসতার শঙ্কা

উত্তর কোরিয়ায় ক্ষমতার পারিবারিক লড়াইয়ে সহিংসতার শঙ্কা বাড়ছে
উত্তর কোরিয়ায় ক্ষমতার পারিবারিক লড়াইয়ে সহিংসতার শঙ্কা বাড়ছে | ছবি: সংগৃহীত
0

ক্ষমতার লড়াই ঘনীয়ে আসছে উত্তর কোরিয়ার ওপর। প্রতিদ্বন্দ্বী, সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের কিশোরী কন্যা এবং ৪০ ছুঁইছুঁই বোন। মাত্র ১৩ বছরের কিম জু আয় পাবে পারমাণবিক উত্তরাধিকার আর দেশের নেতৃত্বভার, এমনটা কিছুতেই মানতে পারছেন না ফুপু কিম ইও জং। সিংহাসনের উত্তরসূরীর লড়াইয়ে নতি স্বীকারে নারাজ ইও জং আর ভাতিজি জু আয়ের দ্বন্দ্ব রক্তাক্ত স্বৈরাচারী ইতিহাসের দেশটিকে আরও একবার ঠেলে দেবে সহিংসতার দিকে—বাড়ছে এমন শঙ্কা।

সর্বগ্রাসী একনায়কতন্ত্রের দেশ উত্তর কোরিয়া। ১৯৪৮ সাল থেকে বংশ পরম্পরায় দেশটি শাসন করে আসছে নিজেদের ঈশ্বরের সমতুল্য করে রাখা কিম পরিবার। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য মতে, বিশ্বের সবচেয়ে করুণ মানবাধিকার পরিস্থিতির দেশ এটি।

বাপ-দাদার পর বর্তমানে তৃতীয় প্রজন্মের কর্ণধার হিসেবে, ১৫ বছর ধরে উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা ৪২ বছর বয়সী কিম জং উন। চলছে চতুর্থ প্রজন্মের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা। বিষয়টিকে ঘিরে তীব্র হচ্ছে পারিবারিক উত্তেজনা, ভীষণ গোপনীয়তা সত্ত্বেও একটু একটু করে উত্তাপের আঁচ ছড়িয়ে পড়ছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও।

প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা এনআইএসের দাবি, উত্তর কোরিয়ার পরবর্তী প্রধান হিসেবে মেয়ে কিম জু আয়ের নাম ঘোষণা করবেন কিম জং উন। বিষয়টিতে ক্ষুব্ধ তার বোন কিম ইও জং। শঙ্কা বাড়ছে, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব ভাতিজির বিরুদ্ধে সহিংস লড়াইয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে প্রভাবশালী ফুপুকে।

ধারণা করা হয়, মাত্র ১৩ বছর বয়স কিম জু আয়ের। ২০২২ সালের নভেম্বরে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পরীক্ষার সময় প্রথমবার, এরপর বারবার বাবার সাথে প্রকাশ্যে দেখা যায় তাকে। দেশের নিজস্ব উদ্ভাবিত অস্ত্র পরীক্ষা, সামরিক কুচকাওয়াজ, কারখানা পরিদর্শন থেকে শুরু করে গেলো সেপ্টেম্বরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে বেইজিংয়ে কিম জং উনের বৈঠকেও উপস্থিত ছিল জু আয়ে।

বিশ্বের অন্যতম পারমাণবিক শক্তিধর দেশগুলোর একটি উত্তর কোরিয়া। ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশটির ভাণ্ডারে ৫০টি পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র এবং আনুমানিক ৭০ থেকে ৯০টি পারমাণবিক অস্ত্রের উপকরণ ছিল বলে ধারণা করা হয়। এছাড়া উন্নত রাসায়নিক ও জৈব অস্ত্র কর্মসূচি আর নিষিদ্ধ ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষারও গতি বাড়িয়েছে দেশটি।

আরও পড়ুন:

রক্ষণশীল আর পুরুষশাসিত নেতৃত্বের রেকর্ড ভেঙে মেয়েকে প্রধান করবে উত্তর কোরিয়া— এমনটা ছিল কল্পনাতীত। কিন্তু পর্দার আড়ালে থাকার পারিবারিক প্রথার বিপরীতে ঘন ঘন জনসম্মুখে কিম জু আয়ের উপস্থিতি, বিশেষ করে চীন সফর, পাল্টে দিচ্ছে অনেক সমীকরণ। এমন পরিস্থিতিতেই নেতৃত্বের প্রশ্নে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারেন ৩৮ বছর বয়সী বোন কিম ইও জং।

কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল ইউনিফিকেশনের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো হং মিন বলেন, ‘১৪ বছর বয়স না হতেই স্বাভাবিকভাবে কেউ দলে যোগ দিতে পারার কথা নয়, তা সে সর্বোচ্চ নেতার যতো প্রিয় মেয়েই হোক না কেন বা তাকে যতোই আইন বহির্ভূত সুবিধা দেয়া হোক না কেন। দলীয় নীতি ও শীর্ষ নেতাদের উপেক্ষা করে একটা শিশুকে ক্ষমতা অর্পণের ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। এতে সর্বোচ্চ নেতার কর্তৃত্বই ক্ষতির মুখে পড়বে।’

কিম জং উনের পর উত্তর কোরিয়ার দ্বিতীয় সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে দেখা হয় কিম ইও জংকে। তার পক্ষে রয়েছে শক্ত রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থন। বর্তমানে কোরিয়া ওয়ার্কার্স পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির উচ্চপদে অধিষ্ঠিত কিম ইও জং ভাইয়ের ওপরেও আধিপত্য খাটিয়ে থাকেন বলে ধারণা করা হয়।

নিউ ইয়র্ক পোস্ট ও টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশ শাসনের সুযোগ আছে বলে কিম ইও জং বিশ্বাস করলে, উত্তর কোরিয়ায় ক্ষমতার লড়াই অবশ্যম্ভাবী। দেশের ভেতরে ও বাইরে নিজের বেশ ভীতিকর ভাবমূর্তি তৈরি করেছেন তিনি। তীক্ষ্ণ মন্তব্যের জন্য পরিচিত এবং নিয়মিতভাবে স্বনামে বিবৃতি দেন।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক ট্যাংক স্টিমসন সেন্টারের ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হঠাৎ কিম জং উনের মৃত্যু হলে টালমাটাল পরিস্থিতিতে পড়বে উত্তর কোরিয়া। কিম জং উন আর তার সম্ভাব্য উত্তরসূরীদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াইয়ের শঙ্কা জোরালো হয়ে উঠে আসে বিশ্লেষণে।

বিশ্লেষণে বলা হয়, কিম জং-উনের আকস্মিক মৃত্যু বা গুরুতর অসুস্থতায় তাৎক্ষণিকভাবে কিম ইও জংয়ের মতো রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত প্রার্থীদের নেতৃত্বের সম্ভাবনা বেশি। বিপরীতে কিম জু আয়ে ও তার ভাইবোন, জানা যায় দুই ভাই বয়সে অনেক ছোট এবং আগামী পাঁচ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে তাদের ক্ষমতায় বসা বেশ অবাস্তব।

চলতি মাসেই দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে উত্তর কোরিয়া। ধারণা করা হচ্ছে, সেখানেই ঘোষণা আসতে পারে দেশের ভবিষ্যৎ কর্ণধারের বিষয়ে। ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসার পর, ২০১৩ সালে নিজের চাচা ও পরামর্শদাতা জ্যাং সং থায়েককেই ফায়ারিং স্কোয়াডে দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন কিম জং উন। সৎ ভাই কিম জং নামকেও হত্যার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এসএইচ