সৃষ্টির আদি পেশা কৃষির সঙ্গে নারীর নিবিড় সম্পর্ক। গ্রামীণ পরিবারের দিকে তাকালেই যা সহজেই বোঝা যায়।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশে কৃষির যে নীরব বিপ্লব, তাতে নারী শ্রমিকরা অন্যতম চালিকাশক্তি। পরিসংখ্যানে বলছে, সার্বিক কৃষির ২১টি কাজের মধ্যে নারীরা করে থাকেন ১৭টি। বীজ সংরক্ষণ, বীজতলা তৈরি, ধান সংরক্ষণ, মাড়াই, সেদ্ধ, রোদে শুকানোর মতো অধিকাংশ কাজই করে থাকেন নারীরা।
তবুও কৃষি ও এর উপখাতে ভূমিকা রাখা নারী শ্রমিকদের শ্রম অনেকটাই অদৃশ্য। নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা না থাকা, স্বল্প মজুরি, নানা বৈষম্য আর নিপীড়নে কোনঠাসা নারী শ্রমিকরা।
এ যেমন গাইবান্ধার সায়মা আক্তার। পুরুষের সঙ্গে অন্যের জমিতে শ্রম দিলেও মজুরি পান কম। শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশের কৃষি শ্রমশক্তির সঙ্গে জড়িত প্রায় ২ কোটির বেশি, ৫৮ শতাংশ নারীই মজুরি বৈষম্যের শিকার।
সায়মা আক্তার বলেন, ‘ভুট্টা তুলি, এ কচু ক্ষেতে, আবার পাট শাক উঠাই, পুঁই শাক তুলি। ৫০০ টাকা করি রোজ দেয়, দৈনিক দিন। দুপুর বেলা খাবার দেয়। পুরুষের থেকে বেশি কাজ করি। ওদের তিন বেলা খাবার দেয়।’
অন্য একজন নারী শ্রমিক বলেন, ‘বাড়ির কাজ করি, ধানের কাজ করি, যাবতীয় কাজ করা লাগে সবই করি।’
আরও পড়ুন:
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো বলছে, কৃষিখাতে দৈনিক একবেলা খাবারসহ পুরুষ শ্রমিকরা যেখানে পান সর্বোচ্চ ৫৭৭ টাকা সেখানে নারীদের ভাগে জুটছে সর্বোচ্চ ৪১৬ টাকা। আর খাবার ছাড়া পুরুষের দৈনিক মজুরি ৬২১ টাকার বিপরীতে নারী শ্রমিকের মজুরি ৪৬১ টাকা।
একজন নারী শ্রমিক বলেন, ‘পুরুষের সমান মূল্য কীভাবে পাবো আমরা? আমরা সারা দিন ডাল তুললে চার ভাগার মধ্যে এক ভাগা ডাল নেয়। এক ভাগা ডালে কত কেজি হয়? এক কেজি ডালই হয় না। তো সেই সমান অধিকার কেমনে হবে?’
কৃষিতে নারী শ্রমিকের হার দৃশ্যমান বিভাজনে অনেক সুবিধা থেকে বঞ্চিত তারা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কৃষক হিসেবে নারীদের স্বীকৃতি ও তথ্য হালনাগাদ না থাকায় বৈষম্য বাড়ছে। জাতীয় অর্থনীতিতে নারী কৃষি শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করার তাগিদ তাদের।
কৃষিবিদ ড. কাশফিয়া আহমেদ বলেন, ‘কৃষক কার্ড দেয়া হচ্ছে, এখানে নারীদের জন্য যদি আলাদা করে—নারী কৃষকদের তাহলে ভালো হবে। আমাদের নারী কৃষকদের সেভাবে আমরা আইডেন্টিফাই করি না, এখন পর্যন্ত আমরা জানিই না দেশে কত পার্সেন্ট নারী কৃষক আছে? ওইটাকে যদি আইডেন্টিফাই করা যেতো যে আমাদের ২ কোটি ২৫ লাখ কৃষকের মধ্যে আসলে কতজন নারী কৃষক, ওনাদের জন্য আলাদা করে কিছু করা যায় কি না।’
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, কৃষিখাতে প্রযুক্তিগত ও সামাজিক বাধার কারণে নারী শ্রমিকরা পিছিয়ে আছেন। শ্রমবৈষম্য কাটাতে নারীবান্ধব কৃষি প্রযুক্তিতে যুক্ত করার পাশাপাশি এ খাতের শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবি।
কৃষি অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. রিপন কুমার মন্ডল বলেন, ‘নারীদের পারিশ্রমিক কম, সেটিকে কীভাবে আমরা একটু ডেভেলপ করতে পারি, তাহলে আমার জানাও দরকার কোনো জায়গায় এর বাধা রয়েছে। সে বাধার ক্ষেত্রে যেমনটি আমরা প্রথমেই বলবো যে নারীবান্ধব প্রযুক্তির একটি অভাব আছে। প্রযুক্তিগুলো যেন নারীবান্ধব হয়, সেই পরিবেশটা তৈরি করা দরকার, প্রযুক্তিগুলোকে সেভাবে ডেভেলপ করা দরকার।’
কৃষিতে নারীর শ্রম গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করছে। আর তাই প্রথা ভেঙে নারী শ্রমিকদের কৃষক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়াই এখন বড় লড়াই।




