মহানবী (সা.) কেন শাবান মাসে বেশি রোজা রাখতেন? জেনে নিন এই মাসের বিশেষ ফজিলত ও আমল

শাবান মাসের আমল ও ফজিলত
শাবান মাসের আমল ও ফজিলত | ছবি: এখন টিভি
0

শুরু হয়েছে পবিত্র শাবান মাস (Shaban Month)। ইসলামি সংস্কৃতিতে এই মাসটি মূলত রমজানের আগাম বার্তা (Message of Ramadan) নিয়ে আসে। প্রখ্যাত আলেমদের মতে, রজব হলো বীজ বপনের সময়, শাবান হলো পানি সেচের মাধ্যমে চারা বড় করার সময় এবং রমজান হলো ইবাদতের ফসল কাটার মাস।

শাবান মাসের গুরুত্বপূর্ণ আমলসমূহ (একনজরে)

আমলের ধরনবিস্তারিত বর্ণনাবিশেষ সওয়াব/ফজিলত
নফল রোজাসোম, বৃহস্পতিবার ও আইয়ামে বিজের রোজারমজানের প্রস্তুতি ও নবীজির সুন্নাহ অনুসরণ
কোরআন তেলাওয়াতপ্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ তিলাওয়াত বাড়ানোরমজানে পূর্ণাঙ্গ খতমের সহজ প্রস্তুতি
দান-সদকাসামর্থ্য অনুযায়ী অভাবীকে সাহায্য করাপাপ মোচন ও রিজিকে বরকত লাভ
কাজা রোজা আদায়গত রমজানের বাকি রোজাগুলো শেষ করাফরয আদায়ের দায়মুক্ত হওয়া
ইস্তিগফারবেশি বেশি 'আস্তাগফিরুল্লাহ' পাঠ করাআমলনামা পেশের আগে গুনাহ থেকে মুক্তি

আরও পড়ুন:

অধিক হারে নফল রোজা ও নবীজির সুন্নাহ (Excessive Nafl Fasting)

শাবান মাসে আল্লাহর রাসুল (সা.) বছরের অন্য যেকোনো মাসের তুলনায় বেশি নফল রোজা রাখতেন। এটি ছিল রমজানের দীর্ঘ সিয়াম সাধনার একটি আগাম অনুশীলন (Pre-Ramadan Practice)। আম্মাজান আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন, নবীজি শাবানের অল্প কয়েক দিন ছাড়া প্রায় পুরো মাসই রোজা রাখতেন।

বার্ষিক আমলনামা পেশের মাস (Annual Deeds Presentation)

হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, শাবান মাসে মহান আল্লাহর দরবারে বান্দার পুরো বছরের আমলনামা (Annual Record of Deeds) উপস্থাপন করা হয়। ওসামা ইবনে জায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি বলেছেন— “আমি চাই আমার আমলনামা যখন আল্লাহর কাছে পেশ করা হবে, তখন যেন আমি রোজা অবস্থায় থাকি।”

কোরআন তেলাওয়াত ও দান-সদকা (Quran Recitation and Charity)

পূর্ব যুগের আলেমগণ শাবান মাসকে ‘কোরআন পাঠের মাস’ (Month of Quran Reciters) হিসেবে গণ্য করতেন। রমজানে যারা বেশি খতম দিতে চান, তারা এই মাস থেকেই প্রস্তুতি শুরু করেন। এছাড়া অভাবী মানুষরা যেন শান্তিতে রমজান পালন করতে পারে, সেজন্য অনেক আলেম এই মাসেই তাঁদের যাকাত (Zakat Calculation and Payment) আদায় করে দিতেন।

আরও পড়ুন:

কাজা রোজা ও ইস্তিগফার (Qaza Fasting and Repentance)

যাদের আগের বছরের রমজানের কাজা রোজা (Makeup Fasts) বাকি আছে, তাঁদের জন্য শাবান মাস হলো তা আদায়ের শেষ সুযোগ। এছাড়া আমলনামা পেশের আগে বেশি বেশি তওবা ও ইস্তিগফার (Seeking Forgiveness/Istighfar) করার মাধ্যমে গুনাহমুক্ত হওয়া জরুরি।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শাবান মাসের গুরুত্ব অনুধাবনের তাওফিক দিন। আমিন।

শাবান মাসের গুরুত্বপূর্ণ দিনসমূহ: ২০২৬ (Shaban 2026 Key Dates)

ইভেন্ট / আমলতারিখ (চাঁদ দেখার ওপর নির্ভরশীল)বার
আইয়ামে বিজের রোজা-১০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬সোমবার
আইয়ামে বিজের রোজা-২০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬মঙ্গলবার
আইয়ামে বিজের রোজা-৩০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬বুধবার
পবিত্র শবে বরাত০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (দিবাগত রাত)মঙ্গলবার দিবাগত রাত

আরও পড়ুন:

শুরু হলো বরকতময় শাবান মাস; রমজানের পূর্ণ সওয়াব পেতে এখনই শুরু করুন এই ৫টি আমল

শাবান মাসের আমল একনজরে (Table)

আমলের নামধরণহাদিসের রেফারেন্স (সংক্ষিপ্ত)
নফল রোজাসুন্নাহসহিহ বুখারি: ১৯৬৯
কোরআন তেলাওয়াতনফল ইবাদতলাতাইফুল মাআরিফ
কাজা রোজা আদায়আবশ্যিক (যাদের বাকি আছে)সহিহ বুখারি: ১৯৫০
দান-সদকাসামাজিক ও ধর্মীয়সুনানে তিরমিজি: ২৬১৬
তওবা-ইস্তিগফারআত্মশুদ্ধিসুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৮১৮

আরও পড়ুন:

১. অধিক হারে নফল রোজা রাখা (Frequent Nafl Fasting)

শাবান মাসে নবীজি (সা.)-এর সবচেয়ে প্রিয় আমল ছিল নফল রোজা। আম্মাজান আয়েশা (রা.) বলেন, রমজান ছাড়া অন্য কোনো মাসে তিনি শাবানের মতো এত বেশি রোজা রাখতেন না। এটি দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার জন্য শরীর ও মনকে প্রস্তুত করে। অন্তত প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবার অথবা মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ (আইয়ামে বিজ) রোজা রাখার চেষ্টা করুন।

২. নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত (Regular Quran Recitation)

পূর্ববর্তী অনেক আলেম শাবান মাস শুরু হলে অন্য সব কাজ কমিয়ে দিয়ে কোরআন তেলাওয়াত বাড়িয়ে দিতেন। তারা এই মাসকে ‘কোরআন পাঠকদের মাস’ বলতেন। যারা রমজানে অন্তত একবার কোরআন খতম দিতে চান, তারা এই মাস থেকেই পড়ার গতি বাড়ালে রমজানে লক্ষ্য পূরণ সহজ হবে।

৩. কাজা রোজা দ্রুত আদায় করা (Completing Qaza Fasts)

আপনার যদি গত বছরের কোনো রমজানের রোজা কাজা থেকে থাকে, তবে শাবান মাসই হলো তা আদায়ের শেষ সুযোগ। বিশেষ করে মা-বোনদের জন্য এই আমলটি অত্যন্ত জরুরি। ফরয ইবাদতের ঋণ কাঁধে নিয়ে পরবর্তী রমজানে প্রবেশ করা অনুচিত। শাবান মাস পার হওয়ার আগেই পুরোনো কাজা রোজা শেষ করুন।

৪. দান-সদকা ও যাকাত প্রদান (Charity and Zakat)

অনেকে রমজানের অপেক্ষা না করে শাবান মাসেই যাকাত বা দান-সদকা করে দেন। মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, সদকা পাপ মিটিয়ে দেয় যেভাবে পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়। শাবান মাসে দান করলে অভাবী মানুষরা রমজানের সওদা বা সাহরি-ইফতারের জন্য প্রয়োজনীয় খরচ আগেভাগে গুছিয়ে নিতে পারে। এতে তারা নিশ্চিন্তে ইবাদত করতে পারে।

৫. তওবা ও ইস্তিগফার করা (Repentance and Seeking Forgiveness)

শাবান মাসে মানুষের সারা বছরের আমলনামা আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। তাই নিজের ভুলত্রুটির জন্য বেশি বেশি 'আস্তাগফিরুল্লাহ' পাঠ করা উচিত। আমলনামা যখন আল্লাহর কাছে উপস্থাপিত হবে, তখন যেন সেটি তওবা ও পবিত্র অবস্থায় থাকে। এছাড়া মন পবিত্র না হলে রমজানের ইবাদতে পূর্ণ স্বাদ পাওয়া যায় না।

আরও পড়ুন:

এসআর