ইসরাইল-ইরান সংঘাতে বন্ধ হরমুজ প্রণালি; বৈশ্বিক কী প্রভাব পড়তে পারে

হরমুজ প্রণালি
হরমুজ প্রণালি | ছবি: সংগৃহীত
0

ইরানের দক্ষিণ সীমান্তের হরমুজ প্রণালি, যা পারসিয়ান উপসাগরকে ওমান উপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করে, গতকাল (শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি) দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সংঘাতের পর থেকে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ৭০ শতাংশের বেশি কমে গেছে বলে জানা যায়। এদিকে আজ (রোববার, ১ মার্চ) ওমানের মুসানদাম এলাকা থেকে প্রায় ৫ নটিক্যাল মাইল দূরে ‘স্কাইলাইট’ নামের একটি তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার ঘটনা ঘটেছে। আল জাজিরা ও দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

হরমুজ প্রণালি

হরমুজ প্রণালি মধ্যপ্রাচ্যের ওমান উপসাগর এবং পারস্য উপসাগরের মধ্যে একটি সরু জলপথ। এটি প্রায় ৫৬ কিলোমিটার চওড়া এবং বিশ্বের প্রধান তেল রপ্তানির পথ হিসেবে পরিচিত। প্রণালির একপাশে ইরান, অন্যপাশে ওমান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। এই প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে এবং ইরানকে আরব উপদ্বীপ থেকে আলাদা করেছে। 

প্রতিবেদনের শিল্প বিশেষজ্ঞ ও মেরিন ট্র্যাফিকের তথ্য বিশ্লেষণ করে উল্লেখ করা হয়, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল গত শুক্রবার রাতে থেকে হঠাৎ কমে গেছে। এদিকে রিস্ক ও কমপ্লায়েন্স বিশ্লেষক ডিমিত্রিস অ্যাম্পাটজিডিস জানান, বেশিরভাগ জাহাজ ইউ-টার্ন নিয়েছে, বিকল্প রুটে মোড় নিয়েছে বা ওমান উপসাগরে অপেক্ষা করছে।

তিনি আরও জানান, সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে, কারণ তাদের অধিকাংশ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস হরমুজের মধ্য দিয়ে যেয়ে থাকে। 

আরও পড়ুন:

প্রতিবেদনে হরমুজ প্রণালি বন্ধের প্রসঙ্গে বলা হয়, ইরানি ইসলামি বিপ্লবী গার্ডস (আইআরজিসি) শনিবার জাহাজগুলোকে সতর্ক করে ও পরে বন্ধ করে ঘোষণা দেয়। তবে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কোনো সামরিক অবরোধের প্রমাণ নেই।

কেন হরমুজ প্রণালি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ 

হরমুজ প্রণালি  কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাসে বহুবার শক্তিশালী দেশগুলো এই প্রণালি  নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছে। কারণ এটি সামরিক ও বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণে থাকলে বিশ্বের অর্থনীতি এবং জ্বালানি সরবরাহ সরাসরি প্রভাবিত হতে পারে।

হরমুজ প্রণালি  বন্ধের প্রভাব যা দেখা যেতে পারে

তেলের দাম বৃদ্ধি: প্রণালি  বন্ধ হলে বিশ্ব বাজারে তেলের সরবরাহ কমে দাম বেড়ে যেতে পারে।

আর্থিক ও বাণিজ্যিক প্রভাব: বিশেষ করে এশিয়া, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি সংক্রান্ত শিল্প ও পরিবহন খাতে বড় প্রভাব পড়তে পারে।

সামরিক উত্তেজনা: এই প্রণালি বন্ধ থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে।

আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ: বিশ্ববাজার ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো কূটনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারে।

প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করা ইরানের জন্য কঠিন

তবে পূর্ণভাবে এই প্রণালি বন্ধ করা ইরানের জন্য কঠিন, কারণ এটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি দাবি করে এবং অন্যান্য অপারেশনকে সীমিত করে। ইতিহাসে দেখা গেছে, জাহাজকে হয়রানি, কিছু নির্বাচিত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত বা অধিকার গ্রাস করা হয়েছে, কিন্ত পুরোপুরি এটি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।

ট্যাংকার ট্র্যাকারস ডটকমের অনুযায়ী, ইরানি জলসীমায় ৫৫টি তেল ট্যাঙ্কার রয়েছে—১৮টি কাঁচা তেল ভর্তি এবং ৩৭টি ফাঁকা। প্রণালির এই সংকট বিশ্ব তেলের সরবরাহ এবং ইরানের নিজস্ব রপ্তানি ঝুঁকিতে ফেলেছে।

আরও পড়ুন:

শুধু তাই নয়, দুই বড় শিপিং কোম্পানি শনিবার উপসাগরে চলাচল স্থগিত করেছে। ফ্রান্সের মার্সেইভিত্তিক বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম কন্টেইনার শিপিং কোম্পানি কোম্পানি মেরিটাইম দ্য আফ্রেতমঁ ও কোম্পানি জেনেরাল মেরিটাইম জানিয়েছে, তাদের সব জাহাজকে “শেল্টারে” থাকার নির্দেশ দেয়া হয়েছে এবং সুয়েজ খাল পারাপারও স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে শিপিং কোম্পানি হা-পাগ লয়েড হরমুজ প্রণালিতে সব ট্রানজিট স্থগিত করেছে। ড্যানিশ জাহাজ সংস্থা এ.পি. মোলার-মার্স্ক গ্রাহকদের ডেলিভারি দেরি হওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে সতর্ক করেছে।

মার্কিন কর্মকর্তারা জাহাজগুলোকে উপসাগর থেকে দূরে থাকার জন্য সতর্ক করেছেন। ইউরোপীয় নৌবাহিনীর মিশন নিশ্চিত করেছে, আইআরজিসির পক্ষ থেকে রেডিও বার্তা এসেছে যে প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ।

কমার্শিয়াল জাহাজগুলো, বিশেষ করে ইসরাইলি ও যুক্তরাষ্ট্রে সঙ্গে যুক্ত জাহাজগুলো, লক্ষ্যবস্তু হতে পারে বলে সতর্ক করেছে শিপিং অ্যাসোসিয়েশন বিআইএমসিকো। ইউএস এনার্জি ইনফোরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রশনের দেয়া তথ্যানুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এই প্রণালির মধ্য দিয়ে যায়।

এএম