বোমার চেয়ে নিষেধাজ্ঞাই বেশি চাপে ফেলবে ইরানকে: মার্কিন কর্মকর্তারা

ইরানের তেহরানের একটি রাস্তা
ইরানের তেহরানের একটি রাস্তা | ছবি : সংগৃহীত
0

বোমা হামলার চেয়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞাই তেহরানকে বেশি চাপে ফেলবে বলে মনে করছেন যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা। মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে মঙ্গলবার এই তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে ইরানের অভ্যন্তরে গভীর অর্থনৈতিক সংকটের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। মিডল ইস্ট মিররের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘ইরানিরা চায় তাদের ওপর যেন বোমা হামলা বন্ধ হয় এবং তারা অর্থ চায়। তবে তাদের অগ্রাধিকারের ক্রম এর উল্টো। তারা আসলে আগে অর্থ চায়।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার দাবি করেন, টানা ১৩ দিনের হামলার পর গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র হামলা স্থগিত করার পর ইরান একটি চুক্তির জন্য আলোচনার অনুরোধ করেছে। তবে ইরান এই দাবি অস্বীকার করেছে।

ওমান, কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীরা এই সাময়িক বিরতিকে স্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে রূপ দেয়ার চেষ্টা করছেন। প্রতিবেদন অনুযায়ী, একটি প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনায় ইরান ও ওমানকে ভূমিকা রাখার সুযোগ দেয়া হবে। প্রস্তাবটি মালাক্কা ও সিঙ্গাপুর প্রণালির ব্যবস্থাপনার আদলে তৈরি করা হয়েছে।

মার্কিন প্রশাসনের ওই জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘কিছু ইরানি এটি চাইছেন, আবার অনেকে চাইছেন না। এটাই সমস্যার একটি অংশ।’

ইরান ভবিষ্যতে মার্কিন হামলা বন্ধের নিশ্চয়তা, জব্দ করা সম্পদ ফেরত এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের নিশ্চয়তা চাইছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরানকে কোনো ধরনের ছাড় দেয়ার বিরোধী ট্রাম্প এবং তাদের অবশিষ্ট পারমাণবিক সামগ্রী হস্তান্তরের ব্যাপারে অনড় তিনি।

এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, বোমা হামলার চেয়ে ইরানকে চাপে ফেলতে নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের কাজে বেশি সময় লাগবে। এতে যুদ্ধ ও পেট্রোলের দাম বৃদ্ধি নিয়ে রিপাবলিকান দলের রাজনৈতিক ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

অর্থ পাওয়াই এখন প্রধান অগ্রাধিকার

মার্কিন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের গোয়েন্দা তথ্য বলছে, ইরানিরা অভিযোগ করছে যে তারা তাদের যোদ্ধাদের বেতন দিতে পারছে না। কেন? আর্থিক চাপের কারণে, ট্রেজারির (মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়) কারণে, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট যা করছেন সেই কারণে।’ ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘তাদের ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দিতে না পারার (ব্যাংক রান) মুখে পড়েছে। এই বিশাল তেলসমৃদ্ধ দেশে পেট্রোলের সংকট দেখা দিয়েছে। তারা পেন্টাগনের (মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর) চেয়ে ট্রেজারিকে বেশি ভয় পাচ্ছে।’

কর্মকর্তারা জানান, ইরান এর আগে মার্কিন মধ্যস্থতাকারী জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফকে জানিয়েছিল যে অর্থ পাওয়াই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। এক কর্মকর্তার দাবি, ‘তারা স্টিভ ও জ্যারেডের কাছে অর্থের জন্য কার্যত ভিক্ষা করছে। তারা অর্থের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।’

ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের তেল বাণিজ্য, আর্থিক নেটওয়ার্ক, অস্ত্র সংগ্রহ এবং শিপিং খাতকে লক্ষ্য করে নতুন করে ‘সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগের কর্মসূচির’ আওতায় ১ হাজারের বেশি ব্যক্তি, জাহাজ ও উড়োজাহাজের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।

সমালোচকরা যুক্তি দেখাচ্ছেন, ইরানকে ট্রাম্পের দাবি মেনে নিতে বাধ্য করতে সামরিক হামলা বা অর্থনৈতিক চাপ—কোনোটিই কাজে আসবে না। বিশ্লেষক ব্রেট এরিকসন জানান, ইরান চলতি বছরের প্রথমার্ধে তেল বিক্রি করে আনুমানিক ২ হাজার ৩০০ কোটি ডলার আয় করেছে, যা তাদের বাজেটে ধরা লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি। এক্সে (সাবেক টুইটার) দেয়া এক পোস্টে সোমবার এরিকসন লেখেন, ‘ইরান যুদ্ধে অর্থনৈতিক যুদ্ধ কৌশলটি একটি মৌলিকভাবে ভুল পন্থা।’

ট্রাম্প কূটনৈতিক সমাধানই চান

হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ট্রাম্প ‘কূটনৈতিক সমাধানই বেশি পছন্দ করেন। তবে ইরান হরমুজ প্রণালিতে বা মিত্রদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী তৎপরতা চালিয়ে গেলে তার হাতে সব ধরনের বিকল্প রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সফল নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিয়েছে। এর সঙ্গে তাদের বারবার আগ্রাসনের জবাবে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ১৩ দিনের টানা হামলা যুক্ত হয়েছে। এই অবস্থায় ইরানের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে একটি সমঝোতা চুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়া। তা না হলে কী হবে, সেটা তারা জানে।’

আরেক মার্কিন কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রেসিডেন্টের হাতে জিতে যাওয়ার মতো বিকল্প রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সামরিকভাবে চূড়ান্ত পর্যায়ে গিয়ে এই লড়াই চালিয়ে যেতে সক্ষম। একই সঙ্গে ইরানকে পঙ্গু করে দেয়ার মতো অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপেও সক্ষম যুক্তরাষ্ট্র।’

এএম