গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানে হামলার আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও তেলজাত পণ্য হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো, যা বৈশ্বিক ব্যবহারের এক-পঞ্চমাংশ। ফলে ইরান যখন প্রণালিটি বন্ধ করে দেয়, তখন অনেকেই বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের তেল ধাক্কা লাগার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। বিশেষ করে এশিয়ার জন্য এই আশঙ্কা ছিল বেশি। কারণ এই তেলের একটা বড় অংশ এই অঞ্চলেই আসত।
তবে গত এপ্রিলের শেষ দিকে ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলার ছোঁয়ার পর তেলের দাম দ্রুত নিচে নেমে আসে। জুলাইয়ের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী শান্তি চুক্তির পর যুদ্ধ যখন থামার পথে ছিল, তখন ব্রেন্ট ফিউচারসের দাম যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ের প্রায় ৭০ ডলারে নেমে আসে। জ্বালানির দাম আকাশচুম্বী হওয়ার সেই ভয়ংকর পরিস্থিতি বাস্তবে ঘটেনি। এরপর আবার সংঘাত শুরু হয়।
জুলাইয়ের শুরু থেকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে আসছে। অন্যদিকে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলা চালিয়েছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করেছে। গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ পুনর্বহাল করলে সংকট আরও ঘনীভূত হয়। ব্রেন্ট ফিউচারসের দাম ৮০ ডলারের ওপরে উঠেছে। তবে এটি এখনো ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার বা তার বেশি হওয়ার পূর্বাভাসের কাছাকাছি নেই।
বাফার আর কতদিন টিকবে?
মার্চ থেকে প্রণালি হয়ে তেল সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। তবে গত কয়েক মাসে এর প্রভাব কমিয়ে রাখতে বেশ কিছু বাফার সহায়তা করেছে। এখন প্রশ্ন হলো, এগুলো আর কতদিন টিকবে?
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ১৫ জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক দিন আগে দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেলের উদ্বৃত্ত ছিল, যা একটি ‘সূচনালগ্নের সুবিধা’ দিয়েছিল।
বিশ্বের শীর্ষ অপরিশোধিত তেল আমদানিকারক চীনের বৈশ্বিক তেলের দাম নিয়ন্ত্রণে বড় ভূমিকা রয়েছে। ২০২৬ সালের মার্চ থেকে দেশটি তেল কেনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে, যা বৈশ্বিক চাহিদা কমাতে ভূমিকা রাখছে। জুনে চীনের অপরিশোধিত তেল আমদানি কমে দৈনিক প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেলে দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। ২০২৫ সালে যা ছিল রেকর্ড ১ কোটি ১৬ লাখ ব্যারেল।
বিশ্লেষকদের মতে, বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি, বিশাল মজুতের ব্যবহার এবং বিকল্প জ্বালানি উৎসের বিকাশের কারণে এই আমদানি কমেছে। এর মধ্যে রয়েছে রাসায়নিক উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার বৃদ্ধি। আইএমএফ জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে উপসাগরের বাইরে উৎপাদন ২০২৫ সালের চেয়ে দৈনিক প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল বেড়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো জরুরি মজুত থেকে ব্যাপকভাবে তেল সরবরাহ করেছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (আইইএ) সমন্বিতভাবে ৪০ কোটি ব্যারেল পেট্রোলিয়াম ছেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের কৌশলগত মজুত থেকে লাখ লাখ ব্যারেল সরবরাহ করেছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলার পরিধি বাড়ায় বেশ কিছু বিশ্লেষক আবারও সতর্কবার্তা দিচ্ছেন। আইএমএফের সতর্কবার্তা, ওপরের কারণগুলো প্রাথমিক ধাক্কা কমাতে সাহায্য করলেও ‘সেই সুযোগের বড় অংশই এখন শেষ হয়ে গেছে।’ আগের ও এখনকার সময়ের মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য হলো, বাড়তি সক্ষমতা শেষ হয়ে গেছে। এখন যুদ্ধ শুরুর সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক কৌশলগত ও বাণিজ্যিক মজুতের পরিমাণও অনেক কম।





