চাবাহার বন্দরে টাওয়ার ধস; ইরানে সেতু-বিদ্যুৎ কেন্দ্রে মার্কিন হামলা তীব্র

একটি বিলবোর্ডের নিচে দাঁড়িয়ে ইরানের পতাকা ওড়াচ্ছেন এক ব্যক্তি
একটি বিলবোর্ডের নিচে দাঁড়িয়ে ইরানের পতাকা ওড়াচ্ছেন এক ব্যক্তি | ছবি: রয়টার্স
0

ইরানের বিরুদ্ধে বিমান হামলার পরিধি আরও বাড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আজ (শুক্রবার, ১৭ জুলাই) ভোরে আরও কয়েকটি সেতু ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে দেশটি। ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরের একটি টাওয়ারও এই হামলায় ধসে পড়েছে। হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার জন্য চাপ দিতে অবকাঠামোয় হামলার হুমকি দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তারই অংশ হিসেবে এই হামলা চালানো হয়েছে। অ্যাসোসিয়েট প্রেসের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

জবাবে যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। কুয়েতের একটি বিদ্যুৎ ও পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রেও ক্ষতিসাধন করেছে দেশটি। এই ছোট মরুভূমির দেশটির জন্য এই স্থাপনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গত মাসে সম্মত হওয়া অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়েছে। হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান কয়েক দিন ধরে পাল্টাপাল্টি হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইরানি কর্মকর্তারা বলছেন, মার্কিন হামলায় কয়েক ডজন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং শত শত মানুষ আহত হয়েছেন। শুক্রবারের হামলায় আরও হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর যুদ্ধ শুরুর পর কার্যত হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য বন্ধ করে দেয় তেহরান। এই পদক্ষেপে তেলের দাম বেড়ে যায় এবং আলোচনার টেবিলে ইরানের হাতে বড় ধরনের সুবিধা তৈরি হয়। মার্কিন জনগণের উদ্দেশে দেয়া প্রাইমটাইম ভাষণে ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, যুদ্ধ ভালোভাবেই এগোচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা একইভাবে ইরানেও বড় জয়ের পথে আছি এবং খুব শিগগিরই আপনারা সেই পরিশ্রমের ফল দেখতে পাবেন।’

ইরানে সেতু ও ‘বৈদ্যুতিক অবকাঠামোয়’ আঘাত
ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশে চালানো মার্কিন হামলায় সেতুগুলোতে আঘাত হানা হয়। এতে অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। হরমুজ প্রণালির তীরবর্তী বন্দর খামির শহরে এই হামলা চালানো হয়।

মহাসড়ক ও রেল সেতুতে চালানো এসব হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের প্রধান বন্দর বন্দর আব্বাসকে দেশটির কেন্দ্রীয় অঞ্চল এবং রাজধানী তেহরানের সংযোগ সড়ক থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও এখনো অন্যান্য পথ খোলা রয়েছে, তবে মার্কিন হামলা আরও বিস্তৃত হতে পারে। এতে সামরিক সরঞ্জাম এবং ইরানের ৯ কোটি মানুষের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন ব্যাহত হতে পারে।

শুক্রবার মার্কিন বিমান হামলার সময় প্রথমবারের মতো ‘বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলার’ কথা স্বীকার করেছে ইরান। দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয় দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোর মানুষদের বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানিয়েছে। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই এলাকাগুলো ‘বর্তমানে চরম তাপদাহ এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলার সম্মুখীন হচ্ছে।’ তবে বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সঞ্চালন লাইন নাকি অন্য কোনো সরঞ্জামে হামলা হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

কয়েক দিন ধরেই বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় এই ধরনের হামলার আশঙ্কা করা হচ্ছিল। মঙ্গলবার তেহরান নগরের কাউন্সিলর মেহেদি চামরান বিদ্যুৎ সমস্যা সম্পর্কে প্রশ্ন করা সাংবাদিকদের বলেন, ‘দেখুন তারা কতগুলো বিদ্যুৎ স্থাপনায় আঘাত হেনেছে... তাহলে আপনি এই প্রশ্ন করতেন না।’

মার্কিন হামলায় গুরুত্বপূর্ণ বন্দরের টাওয়ার ধসে পড়লো
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সর্বশেষ বিমান হামলায় তারা কয়েক ডজন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। টানা ষষ্ঠ রাতের এই মার্কিন হামলা শুক্রবার ভোরে শেষ হয়। রাষ্ট্র পরিচালিত সংবাদ সংস্থা ইরনার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওমান উপসাগরের তীরবর্তী ইরানের চাবাহার বন্দরের একটি টাওয়ারও এই হামলায় ধসে পড়েছে। স্থলবেষ্টিত প্রতিবেশী দেশ আফগানিস্তানের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক পথ।

ভারতের সহায়তায় ইরান পরিচালিত চাবাহার বন্দর মার্কিন বিমান হামলার বারবার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম বন্দরটিতে তৃতীয় দফায় হামলার কথা স্বীকার করলেও টাওয়ার ধসের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু জানায়নি। ইরানের বর্ণনা অনুযায়ী, বন্দরের বাণিজ্যিক চলাচল তদারকির দায়িত্বে ছিল ওই টাওয়ার। তবে ইরানের আধা সামরিক বাহিনী রেভল্যুশনারি গার্ডসও দেশটির বিভিন্ন বন্দরে কার্যক্রম পরিচালনা করে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হোসেইন কারমানপুর জানান, শুক্রবার ভোর ৬টা পর্যন্ত ইরানে মার্কিন হামলায় অন্তত ৩৮ জন নিহত এবং ৪০০-র বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

মধ্যস্থতাকারী কাতারকে লক্ষ্যবস্তু করে ইরানের প্রতিশোধ
শুক্রবার ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের ঝাঁক কাতারকে লক্ষ্য করে ছোড়া হয়। এ সময় জনগণকে দুবার আশ্রয় নেয়ার সতর্কবার্তা দেয় দেশটি। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হলে আকাশে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। কাতারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ধ্বংসাবশেষ পড়ে একটি শিশু আহত হয়েছে। পাকিস্তানের সঙ্গে কাতার ইরান যুদ্ধ শেষ করার মূল মধ্যস্থতাকারী। তবে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনা ভেঙে পড়েছে।

শুক্রবার ভোরে বাহরাইন ও কুয়েতেও হামলা চালিয়েছে ইরান। কুয়েতের কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, একটি বিদ্যুৎ ও পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে ইরান, যাতে স্থাপনাটির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কুয়েতের প্রায় ৯০ শতাংশ পানীয় জল আসে বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র থেকে। ফলে যেকোনো ধরনের বিঘ্ন জনজীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। কুয়েত জানিয়েছে, তারা আগুন নেভাতে সক্ষম হয়েছে এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ ও স্থাপনাটি পুনরায় চালু করার চেষ্টা করছে। জর্ডানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, শুক্রবার সকালে ইরানের ছোড়া তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র তারা প্রতিহত করেছে।

শুক্রবার সকালে উত্তর ইরাকের আধা স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলের ইরবিল ও সুলাইমানিয়াহ শহরেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এ সময় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রকে লক্ষ্য করে সক্রিয় হয়। নিরাপত্তাজনিত কারণে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এই হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানি কুর্দি ভিন্নমতাবলম্বী গোষ্ঠী কোমালা। এতে অন্তত নয়জন নিহত এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন। ইরান তাৎক্ষণিকভাবে এই হামলার দায় স্বীকার করেনি, তবে অতীতে তারা কোমালাকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।

এদিন হরমুজ প্রণালিতে ওমানের কাছাকাছি পথ ধরে যাওয়া একটি ট্যাংকারে হামলার কথাও জানিয়েছে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী।ইউনাইটেড কিংডম মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) সেন্টারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাহাজটির সামান্য ক্ষতি হয়েছে। তবে ক্রুদের কেউ আহত হননি। ইরান ওমানের কাছাকাছি পথে চলাচলকারী ট্যাংকারগুলোতে হামলা চালিয়ে আসছে, তবে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হামলার দায় স্বীকার করেনি।

হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব
হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার জন্য দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি সাম্প্রতিক দিনগুলোতে আবারও তুলে ধরেছেন ট্রাম্প। শান্তির সময়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়েই পরিবহন করা হতো। ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানি বন্ধ করতে দেশটির বন্দরগুলোতে পুনরায় নৌ অবরোধ আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

সামুদ্রিক তথ্য সংস্থা লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের মতে, চলতি মাসের শুরুতে হরমুজ প্রণালি দিয়ে সাপ্তাহিক পণ্য পরিবহন প্রায় এক-চতুর্থাংশ কমেছে। সাম্প্রতিক সহিংসতা বাড়ার আগেই এমন অবস্থা ছিল।

লয়েডস বৃহস্পতিবার জানায়, ঝুঁকির কারণে কিছু তেলবাহী জাহাজ তাদের অবস্থান নির্ণয়ের যন্ত্র বন্ধ রেখে প্রণালি পার হচ্ছে। তবে অনেকেই আটকে রয়েছে। এই অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান পরিমাণ জ্বালানি পাইপলাইনের মাধ্যমে পাঠানো হচ্ছে। তবে প্রণালি দিয়ে পরিবহনের এই ঘাটতি পূরণ করার মতো যথেষ্ট নয়।

এএম