গত মার্চ মাসে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন ইরানের খার্গ দ্বীপ দখলে নেয়ার পরিকল্পনা করছে বলে খবর রটেছিল। ইরানের মোট অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের ওপর দিয়ে যায়। গত ১৭ জুন দুই পক্ষের সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর সেই আলোচনা থিতিয়ে এলেও সম্প্রতি ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প বিষয়টি নাকচ করে না দেয়ায় নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে। দ্বীপ দখলের অভিযান নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু বলব না; বললে সেটা হবে বোকামি।’
বিশ্লেষকদের মতে, ‘সংকীর্ণ সামরিক দৃষ্টিতে’ ইরানের ছোট কোনো দ্বীপ দখল করার সামর্থ্য যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৫০ হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে। কিংস কলেজ লন্ডনের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগ আল-জাজিরাকে বলেন, পর্যাপ্ত আকাশ, নৌ ও উভচর শক্তি ব্যবহার করে ছোট কোনো দ্বীপ যুক্তরাষ্ট্র সহজেই দখল করতে পারবে। তবে এর সঙ্গে পাল্টা হামলার ঝুঁকিও নিতে হবে।
আরও পড়ুন:
জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক নাদের হাশেমি বলেন, কোনো দ্বীপ সাময়িকভাবে দখল করা আর সেটি দীর্ঘকাল ধরে রাখা এবং কৌশলগত সুবিধা আদায় করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বিশ্লেষক ক্রিগের মতে, কেশমের মতো বড় দ্বীপ দখল করা অনেক বেশি কঠিন হবে; কারণ এটি ইরানের মূল ভূখণ্ডের একেবারে কাছে অবস্থিত। অন্যদিকে হেনগামের মতো ছোট দ্বীপগুলো সহজে দখল করা গেলেও সেগুলো ইরানের কামান, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের আওতার মধ্যেই থাকবে। কেবল দ্বীপ দখল করলেই হরমুজ প্রণালিতে ইরানের তৎপরতা বন্ধ করা যাবে না। উল্টো সেখানে মার্কিন সেনারা ক্রমাগত হামলার মুখে পড়বে।
ক্রিগের হিসাব অনুযায়ী, এমন একটি সীমিত অভিযানের জন্য প্রাথমিকভাবে অন্তত ৫ থেকে ১০ হাজার সেনার প্রয়োজন হবে। এসব সেনাকে সরাসরি ইরানি মূল ভূখণ্ডের গোলার ঝুঁকির মধ্যে কাজ করতে হবে। রসদবাহী জাহাজ ও হেলিকপ্টারগুলোকে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও মাইনের মধ্য দিয়ে চলাচল করতে হবে। তাই জাহাজ চলাচল রক্ষার অভিযানটি শেষ পর্যন্ত অন্তহীন এক আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
নাদের হাশেমির মতে, ইরানের কোনো দ্বীপ, বিশেষ করে খার্গ দ্বীপ দখলের চেষ্টা যুক্তরাষ্ট্র করবে বলে মনে হয় না। কারণ এতে মার্কিন সেনাদের বড় ধরনের প্রাণহানি হতে পারে, যা ট্রাম্পের নিজ জনসমর্থন বা ‘মাগা’ ভিত্তির মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। এই পরিস্থিতি তখন ইরাক যুদ্ধের স্মৃতি মনে করিয়ে দেবে।
আরও পড়ুন:
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সক্ষমতা পুরোপুরি বন্ধ করতে হলে কেবল দ্বীপ নয়, বরং দেশটির দক্ষিণ উপকূলের বিশাল এলাকা দখল করতে হবে। এর মধ্যে অনেক রাডার ব্যবস্থা, উপকূলীয় ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি, ড্রোন কেন্দ্র ও আইআরজিসির কমান্ড সেন্টার মূল ভূখণ্ডের ভেতরেই অবস্থিত। যুক্তরাষ্ট্রের কোনো দ্বীপ দখল ইরানকে বিশাল উস্কানি হিসেবে গণ্য করবে। এর ফলে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের মাইন পাতা এবং জাহাজ ও উপসাগরীয় জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার ঘটনা বেড়ে যাবে।
শেষ পর্যন্ত দ্বীপ দখলের বিষয়টি কেবল তাত্ত্বিক আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকার সম্ভাবনা বেশি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ক্রিগের ভাষায়, এমন উদ্যোগ হয়তো নাটকীয় সামরিক দৃশ্য তৈরি করবে। কিন্তু এটি নৌ চলাচলের স্বাধীনতা রক্ষার লড়াইকে একটি বড় আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে সেই বৃহৎ স্থলযুদ্ধের দিকেই টেনে নেবে, যা তারা এড়িয়ে চলতে চাইছে।





