বিশ্লেষকরা বলছেন, শনাক্ত না হয়ে চলতে চেষ্টা করা পারমাণবিক অস্ত্র বহনকারী সাবমেরিনগুলোর নির্দেশ প্রদান, নিয়ন্ত্রণ ও যোগাযোগের বিষয়টি বিরাট চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব বিষয়টি বিশেষভাবে অনুধাবন করেছে। কারণ, দলটির কাছে সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক আনুগত্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সিঙ্গাপুরের এস রাজারত্নম স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষক কলিন কোহ বলেন, ‘ক্ষেপণাস্ত্র ও সাবমেরিনের প্রকৃত কারিগরি সক্ষমতা যাচাইয়ের পাশাপাশি এই দিকটিও অবশ্যই খুব ভালোভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘সামনে এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ আছে। তবে মনে হচ্ছে তারা এখানে অপারেশনাল স্ট্রাইক সক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছে। তারা সম্ভবত এটাই দেখাতে চাইছে যে, মহাদেশীয় যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে না পারলেও তারা গুয়াম ও হাওয়াইকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে পারবে।’
ডামি ওয়ারহেড লাগানো এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করায় আঞ্চলিক শক্তিগুলো চীনের সমালোচনা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, এটি একটি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র যা দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে গিয়ে পড়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও কর্মকর্তারা এই পরীক্ষাকে ‘নিয়মিত’ সামরিক মহড়া হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাদের ভাষ্য, এটি কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু বা দেশকে উদ্দেশ্য করে করা হয়নি এবং পেশাদারিত্বের সঙ্গে পরিচালিত হয়েছে।
কিছু প্রতিবেদনকে ‘বিশুদ্ধ বিকৃতি ও অতিরঞ্জন’ বলে অভিহিত করে আজ (শুক্রবার, ১০ জুলাই) রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন ও প্রচলিত রীতি মেনেই এই পরীক্ষা করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘এটি বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলা উচিত যে, নিজের পারমাণবিক বাহিনীকে আধুনিকায়নের চীনা প্রচেষ্টার লক্ষ্য হলো জাতীয় কৌশলগত নিরাপত্তা রক্ষা এবং বৈশ্বিক কৌশলগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।’
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের পর এটিই চীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা। ওই সময় পিপলস লিবারেশন আর্মি দক্ষিণ চীন সাগরের হাইনান দ্বীপ থেকে একটি মোবাইল লঞ্চার ব্যবহার করে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল।
পারমাণবিক কৌশলে চীনের সাবমেরিনের ভূমিকা
বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদদের মতে, সোমবারের ক্ষেপণাস্ত্রটি চীনের ছয়টি টাইপ-০৯৪ পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিনের মধ্যে একটি থেকে ছোঁড়া হয়েছিল। এই ধরনের সাবমেরিনকে বলা হয় এসএসবিএন। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, এটি একটি কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্রবাহী সাবমেরিন (এসএসবিএন) ছিল। তবে এর শ্রেণির কথা উল্লেখ করা হয়নি। এসএসবিএন হচ্ছে পারমাণবিক অস্ত্রবাহী আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের জন্য নকশা করা বড় আকারের পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন।
আঞ্চলিক সামরিক অ্যাটাশে ও বিশ্লেষকরা বলছেন, হাইনান দ্বীপ থেকে পরিচালিত চীনের এসএসবিএন কার্যক্রম দেশটির চলমান সামরিক আধুনিকায়নের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা উপাদানগুলোর একটি। কারণ, চীনের পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার ‘সেকেন্ড-স্ট্রাইক’ সক্ষমতা নিশ্চিত করতে এগুলোর গুরুত্ব অপরিসীম।
চীনের পারমাণবিক অস্ত্রবাহী সাবমেরিনগুলো যদি শনাক্ত না হয়ে চলতে পারে, তাহলে প্রতিপক্ষের প্রথম হামলায় দেশটির বৃহৎ ভূমি-ভিত্তিক অস্ত্র ধ্বংস হয়ে গেলেও চীন পাল্টা আঘাত হানতে পারবে। এটি বেইজিংয়ের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। কারণ, চীন এখনো এই আনুষ্ঠানিক নীতি বহাল রেখেছে যে, কোনো সংঘাতে তারা প্রথম পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে না।
সামরিক অ্যাটাশে ও বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা মাঝেমধ্যে চীনা সাবমেরিনগুলো নৌযান, গুরুত্বপূর্ণ চোকপয়েন্টে পানির নিচে সেন্সর নেটওয়ার্ক এবং উন্নত সামুদ্রিক নজরদারি যন্ত্র সজ্জিত পি-৮ পোসেইডন বিমানের সাহায্যে অনুসরণ করার চেষ্টা করে। চীনের সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব অভিযান বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
পেন্টাগনের ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীন তাদের এসএসবিএন দিয়ে প্রায় ধারাবাহিক প্রতিরোধ টহল কার্যক্রম শুরু করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ফ্রান্স ও ব্রিটেন কয়েক দশক ধরেই নিয়মিতভাবে এমন পারমাণবিক হামলার সক্ষমতা মোতায়েন রাখে। ভারতও এখন নিজস্ব এসএসবিএন তৈরি করছে।
শিকাগোভিত্তিক গবেষণা সংস্থা বুলেটিন অব দ্য অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস এই সপ্তাহে চীনের পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে একটি সমীক্ষা প্রকাশ করেছে। এতে বলা হয়েছে, মার্কিন কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে না বললেও, ব্যক্তিগতভাবে কেউ কেউ প্রতিবেদনের লেখকদের জানিয়েছেন যে এমন টহলে চীনের এসএসবিএনগুলোতে সত্যিই পারমাণবিক অস্ত্র ভর্তি করা ছিল।
আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণের অভাবের কথা উল্লেখ করে সমীক্ষায় বলা হয়েছে, ‘পিপলস লিবারেশন আর্মির রকেট বাহিনীর নেতৃবৃন্দসহ সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের শুদ্ধি অভিযান দেখে মনে হচ্ছে যে স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে সামরিক বাহিনীর হাতে পারমাণবিক ওয়ারহেড হস্তান্তর করা হবে না।’
চীনের ‘নিউক্লিয়ার ট্রায়াড’
আগামী সোমবারের সাবমেরিন ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের সঠিক স্থান এবং ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্রটি এখনো নিশ্চিত করা হয়নি। তবে নিজের উপকূলের বাইরে শনাক্ত না হয়ে কৌশলে চলাচল করার চীনের এসএসবিএনগুলোর সক্ষমতাও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা জানিয়েছেন, বর্তমানে উন্নয়নাধীন আরও অত্যাধুনিক ও নিঃশব্দ সংস্করণ দিয়ে টাইপ-০৯৪ সাবমেরিনকে প্রতিস্থাপন করা হবে।
সবচেয়ে অত্যাধুনিক সাবমেরিন ক্ষেপণাস্ত্র জেএল-৩ নিয়ে মহাদেশীয় যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে হলে সাবমেরিনকে দক্ষিণ চীন সাগর ছাড়িয়ে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে যেতে হবে। এতে প্রতিদ্বন্দ্বী নৌবাহিনীর কাছে ধরা পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বেইজিংয়ের সামরিক প্যারেডে প্রদর্শিত জেএল-৩ ক্ষেপণাস্ত্রে একাধিক ওয়ারহেড ব্যবহারের সক্ষমতা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। এর পাল্লা ১০ হাজার কিলোমিটার (৬ হাজার ২১৪ মাইল)।
অজানা বিষয় থাকলেও চীনের ‘গ্লোবাল টাইমস’ পত্রিকা বলেছে, এই ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ দেখিয়েছে যে চীন কীভাবে ক্রমাগত তাদের কৌশলগত বাহিনীর ‘নিউক্লিয়ার ট্রায়াড’ শক্তিশালী করছে। এই ট্রায়াড বলতে ভূমি, নৌ ও আকাশ থেকে পারমাণবিক অস্ত্র ছোঁড়ার সক্ষমতাকে বোঝানো হয়েছে।
গ্লোবাল টাইমসের সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, ‘এটি বহিঃশক্তি ও তাদের অনুসারীদের সর্বোচ্চ সামরিক চাপ বা প্রাথমিক হামলার মাধ্যমে চীনকে ছাড় দিতে বাধ্য করার প্রচেষ্টা পরিত্যাগ করতে বাধ্য করবে। এর মাধ্যমে বড় আকারের সংঘাতের ঝুঁকি মৌলিকভাবে কমে যাবে।’




