যেদিকেই চোখ যায় কেবল ধ্বংসযজ্ঞ। ধ্বংসস্তূপের নীচে আটকা পড়া মানুষের আর্তনাদ।
এক উদ্ধারকারী বলেন, ‘ধ্বংসস্তূপের নীচে কারো আওয়াজ শুনলেই সেখানে পৌঁছাতে কংক্রিট ভাঙা শুরু করে দিচ্ছি। তারা ভালো আছে। আমরা তাদের কাছে পানি ও কিছু খাবার দেওয়ার জন্য একটি গর্ত করার চেষ্টা করব। এছাড়া সারাক্ষণ তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করছি। যাতে তারা মনোবল না হারায়।’
আরেকজন বলেন, ‘ভূমিকম্পের কয়েক ঘণ্টা পর, লা গুয়াইরার একটি ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পথ করে এগোচ্ছিলাম। জায়গাটি একসময় একটা বাড়ি ছিল। ভবনটি পুরোপুরি ধসে পড়েছে। ভবনটির উপরে দুটি বাড়ি ভেঙে পড়েছে। তবে আমরা এখনও জীবিত মানুষ খুঁজে পাচ্ছি।’
ইট-কাঠ-কংক্রিট খুঁড়ে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে উদ্ধারকাজ চালিয়ে যাচ্ছেন ভূমিকম্পে বিপর্যস্ত ভেনেজুয়েলার উদ্ধারকর্মীরা। তাদের হাত ধরেই যেন নতুন জীবন পাচ্ছেন মৃত্যুর একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া নিখোঁজ মানুষগুলো।
এক অধিবাসী বলেন, ‘সেখানে এখনও মানুষ বেঁচে আছে। যদিও ধ্বংসস্তূপ সরানোর জন্য পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি,সরঞ্জাম নেই। আমি অনুরোধ করছি, দয়া করে আমাদের সাহায্য করতে পারে এমন লোক পাঠান। অনুসন্ধান কাজ যেন বন্ধ না হয়। এখনও আশা করি আমাদের প্রিয়জনেরা বেঁচে ফিরবে। দয়া করে অনুসন্ধান বন্ধ করবেন না।’
আরেকজন বলেন, ‘ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমরা সবরকম সাহায্য পাচ্ছি। মনে হচ্ছে, এখনও কিছু মানুষ বেঁচে আছে। ঈশ্বরের ওপর বিশ্বাস রেখে আমরা এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে পারবো। সবার জন্যই এটি একটি মর্মান্তিক ঘটনা।’
দুর্ঘটনার চারদিন পেরিয়ে যাওয়ায় নিখোঁজদের জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনাও ক্ষীণ হয়ে আসছে। স্বজনদের যেন খালি হাতে ফিরতে না হয়, সেলক্ষ্যে উদ্ধারকাজ পরিচালনায় সব বিকল্প মাথায় রেখেই কাজ করে যাচ্ছেন কর্মীরা। সবার একটিই প্রার্থনা, এই বুঝি উদ্ধার হলো আরও একটি প্রাণ।
কারাকাসের লা গুয়াইরা এলাকায় সম্পূর্ণ ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে দুর্ঘটনার ৪৮ ঘণ্টা পর একটি নবজাতককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তাকে জীবিত উদ্ধারের পর এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। যেন তাদের হাত ধরে পৃথিবীতে প্রাণ ফিরে পেলো আরও একটি শিশু। একইসময় বিভিন্ন বয়সী আরও কয়েকটি শিশুকেও ধ্বংসস্তূপ থেকে জীবিত বের করে আনতে সক্ষম হন উদ্ধারকর্মীরা।
কারাবালদায় তিনদিন পর হাত-পা ভাঙা ১১ বছরের একটি শিশুকে জীবিত উদ্ধার করেন কর্মীরা। ধ্বংসস্তূপের নীচে শিশুটি আঁকড়ে ধরে ছিল তার মা এবং বোনের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ। মেক্সিকো ও মার্কিন উদ্ধারকর্মীদের তৎপরতায় ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে তাকে নিরাপদে বের করে আনা হয়।
আরেক উদ্ধারকর্মী বলেন, ‘একজন জীবিত! ভবনটি ধসে পড়ার পর সেখানে ছোট একটি ফাঁকা জায়গা তৈরি হয়। সেখানেই শিশুটি আশ্রয় নেয়। ওর বয়স ১১ বছর হতে পারে। পাশেই বোন ও মায়ের মরদেহ রয়েছে। শিশুটির একটি হাত ভেঙে গেছে।’
এদিকে, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রের তাঁবুতে ঠাঁই মিলেছে ভূমিকম্পে গৃহহীন হয়ে পড়া পরিবারগুলোর। সেখানেও রয়েছে নানা মানবিক সংকট। প্রতিনিয়ত আফটারশকের আতঙ্কে নিজে ঘরবাড়িতে ফিরতে পারছেন না অনেকে। সহায় সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব এই পরিবারগুলো তাদের সন্তান নিয়ে কারাকাসের রাস্তায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
ভূমিকম্পে এখনও যারা নিখোঁজ তাদের ভাগ্যে কি ঘটেছে তা জানে না তাদের পরিবার। বেঁচে ফেরা অসংখ্য মানুষকেও ভয়াবহ সংকট আর চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে এ দুর্যোগ। তবে ধ্বংসের একেবারে শেষ বিন্দু থেকে ফিরিয়ে প্রকৃতিই হয়তো আবারও বাঁচতে শেখায়, বেঁচে থাকার অবলম্বনও তৈরি হয়।




