শুক্রবার এক সাংবাদিক জানতে চান, নয় মাসের এই মিশন কি বেশি দীর্ঘ হয়ে গেছে? জবাবে প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘এটি যথেষ্ট দীর্ঘ হয়নি।’ ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই যুক্ত থাকা লিংকনের বদলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী নতুন একটি বিমানবাহী রণতরি পাঠাচ্ছে বলে যে প্রতিবেদন এসেছে, তার সত্যতাও ট্রাম্প নিশ্চিত করেছেন বলে মনে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘সেই জাহাজটি এখনই বা খুব শিগগিরই সরে যাচ্ছে। এবং এর জায়গায় খুব অনুরূপ আরেকটি জাহাজ আসছে।’
সেবা সদস্যদের পরিবার লিংকনে থাকা পরিবেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন—এই কথা জানানো হলে ট্রাম্প বলেন, ‘না, তারা উদ্বিগ্ন নয়।’
এই সপ্তাহের শুরুতে সিনেটের ডেমোক্র্যাটদের একটি দল প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং ভারপ্রাপ্ত নৌবাহিনী সচিব হাং কাওয়ের কাছে একটি চিঠি পাঠিয়ে লিংকনের প্রায় ৫ হাজার নাবিক ও মেরিনের অবস্থা সম্পর্কে জবাব চেয়েছেন। সিনেটের আর্মড সার্ভিসেস কমিটির সদস্য এবং কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল ওই চিঠিতে লেখেন, ‘লিংকনের নারী-পুরুষরা তাদের দেশের সেবা করার আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন। বিভাগটি তাদের কাছে শুধু এই মিশনের সময় পর্যাপ্ত সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ ও সহায়তারই ঋণী নয়, বরং একটি টেকসই বাহিনী গঠন মডেলেরও ঋণী; যা বারবার নাবিক ও জাহাজের মিশনের সময়সীমা বাড়িয়ে ধারাবাহিক পরিচালনার চাহিদা মেটানোর ওপর নির্ভর করবে না।’
বৃহস্পতিবার হেগসেথ বলেছেন, লিংকনে অপ্রতুল অবস্থার প্রতিবেদনগুলো ‘সম্পূর্ণ বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।’ তবে জাহাজে অপর্যাপ্ত খাবার ও দূষিত পানিসহ সরবরাহের ঘাটতির অভিযোগ তিনি সরাসরি খণ্ডন করেননি। সাংবাদিকদের হেগসেথ বলেন, ‘আমরা নিশ্চিত করছি যে প্রতিটি জাহাজ, প্রতিটি ক্রু ও প্রতিটি ক্যাপ্টেন প্রতিটি মুহূর্তে যা কিছু আমরা দিতে পারি তা যেন পায়। কিছু মিশন অন্যগুলোর চেয়ে দীর্ঘ হয়। এবং ওই নাবিকদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা অন্য যেকোনো ব্যক্তির চেয়ে বেশি। তারা কম বন্দর যাত্রার সঙ্গে অস্বাচ্ছন্দ্যকর অবস্থায় গভীর সমুদ্রে যা করে যাচ্ছে, তা অবিশ্বাস্য।’
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে ‘দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল’ জানিয়েছে, আগে থেকে নির্ধারিত রোটেশন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ‘ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটন’ গত সপ্তাহে ভিয়েতনামের বন্দর ছেড়ে মধ্যপ্রাচ্যের উদ্দেশে যাত্রা করেছে। তবে জাহাজটি কবে নাগাদ লিংকনের স্থলাভিষিক্ত হবে, সে বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট তারিখ জানানো হয়নি।
রেকর্ড গড়া মিশন
‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ একটি নিমিটজ-শ্রেণির বিমানবাহী রণতরি। এই ধরনের বেশ কয়েকটি জাহাজকে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ’ হিসেবে অভিহিত করে। গত নভেম্বরে সান দিয়েগোর ঘাঁটি থেকে যাত্রা শুরু করা জাহাজটিকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে জানুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হয়। এরপর থেকে জাহাজটি তেহরানের ওপর মার্কিন হামলায় সহায়তা করে যাচ্ছে।
লিংকনের এই ৯ মাসের মিশনে ২৫০ দিনের বেশি সময় জাহাজটি একবারও কোনো বন্দরে থামেনি, যেখানে ক্রুরা স্থলে যেতে পারতেন। আধুনিক যুদ্ধজাহাজের সমুদ্রে টানা থাকার এটি একটি রেকর্ড। সাধারণত মোতায়েন থাকা বিমানবাহী রণতরিগুলো ৩০ থেকে ৪৫ দিন পরপর বন্দরে থামে। এতে ‘জাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত ও পুনরায় সরবরাহের সুযোগ পাওয়ার পাশাপাশি নাবিক ও মেরিনদের কাজের চাপ থেকে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিরতি পাওয়া যায়’, বলে জানিয়েছে সামরিক-কেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নাবিক এই সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, ‘আমরা মোতায়েনের পুরোটা সময় শুধু চক্কর দিচ্ছি আর জ্বলছি।’ জাহাজে থাকা এক নাবিকের মেয়ে ‘নেভি টাইমসকে’ জানিয়েছেন, তার মা ‘পাঁচ সপ্তাহ ধরে অবিরাম যুদ্ধ কার্যক্রম’ সহ্য করেছেন। ইরান একাধিকবার দাবি করেছে যে তাদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় জাহাজটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে নৌবাহিনী প্রতিটি প্রতিবেদনই খণ্ডন করেছে।
অবস্থার অবনতি
সংঘাত এলাকায় লিংকনের দীর্ঘ উপস্থিতি জাহাজটিকে পুরোপুরি সরবরাহ ও নির্বিঘ্নে পরিচালনা কঠিন করে তুলেছে। জাহাজে অপর্যাপ্ত সরবরাহের প্রথম প্রতিবেদনগুলো এপ্রিলে সামনে আসতে শুরু করে। ‘ইউএসএ টুডে’ ক্রুদের পরিবেশনের কথিত একটি ছবি প্রকাশ করে। এতে দেখা যায়, ছোট এক মুঠো গাজর, বান ছাড়া হ্যামবার্গার প্যাটি এবং অজ্ঞাত ধরনের মাংসের এক টুকরো ছিল।
এর প্রতিক্রিয়ায় নৌবাহিনী এক বিবৃতিতে জানায়, লিংকন এবং এই অঞ্চলের আরেকটি বিমানবাহী রণতরিতে ‘তাদের ক্রুদের স্বাস্থ্যকর বিকল্পসহ পরিবেশনের জন্য যথেষ্ট খাবার রয়েছে।’ পরিবারের সদস্যরা ‘ইউএসএ টুডেকে’ বলেছেন, মেইল সেবায় বিঘ্ন ঘটায় তারা প্রিয়জনদের কাছে দীর্ঘ মিশনের সময় সহায়ক হতে পারে এমন সরঞ্জাম পাঠাতে পারছেন না।
সামরিক কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো চিঠিতে ব্লুমেনথালও অপর্যাপ্ত পানি সরবরাহ, ভাঙা টয়লেট, ছত্রাক এবং অন্যান্য ‘অবনতিশীল বাসযোগ্য পরিবেশের’ প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করেছেন।
অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেয়া বিবৃতিতে নৌবাহিনী জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধ ‘একটি অত্যন্ত বিতর্কিত পরিবেশ তৈরি করেছে; যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের প্রথাগত সরবরাহ কেন্দ্রগুলো যুদ্ধ কর্মকাণ্ডের কারণে ব্যাহত হয়েছে।’ এতে আরও বলা হয়েছে, এই সংঘাত নেতৃত্বকে ‘মিশনের জন্য জরুরি সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য করেছে। প্রথমে খাবার, তারপর হাইজিন সামগ্রী এবং এরপর মেইল।’
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ
ক্রু সদস্যদের পরিবার বারবার এই দীর্ঘ মিশনের কারণে জাহাজে থাকা সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর পড়া প্রভাবের কথা তুলে ধরেছে। এক নাবিক গত মাসে ‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপসের’ সঙ্গে ভাগ করা এক চিঠিতে পরিবারের সদস্যদের লিখেছেন, ‘আমাদের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্য বিপদের মধ্যে রয়েছে। আমাদের সাহায্য দরকার।’
‘স্টারস অ্যান্ড স্ট্রাইপস’ ও ‘নেভি টাইমস’ এই সপ্তাহে জানিয়েছে যে জাহাজ থেকে ঝাঁপ দেয়ার চেষ্টা করেছেন এমন একাধিক ক্রু সদস্য রয়েছেন। এই ক্রু সদস্যদের একজনের স্ত্রী আনাবেল লোমা ‘নেভি টাইমসকে’ জানিয়েছেন, তার স্বামীর মানসিক সংকট তার ক্যারিয়ারকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। তিনি বলেন, ‘সে ভীত। তার মনে হচ্ছে সে ‘ডিসঅনারেবল ডিসচার্জ’ পাবে। শুধু ক্লান্তির কারণে তার ১৩ বছরের ক্যারিয়ার এভাবে শেষ হয়ে যাবে। এটি ন্যায্য নয়, এটি সঠিক নয়। এই মুহূর্তে এটি নিয়ে তার চিন্তিত থাকার কথা নয়।’
সিএনএনকে বৃহস্পতিবার এক সরকারি কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন, গত জুলাইয়ে অন্তত একজন ক্রু সদস্য জাহাজ থেকে সাগরে পড়েন। তবে দ্রুত তাকে উদ্ধার করা হয়েছে। অন্য নাবিকদের ঝাঁপ দেয়া থেকে বাঁচাতে ক্রু সদস্যদের হস্তক্ষেপের একাধিক বিবরণসহ অন্যান্য প্রতিবেদনের সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নৌবাহিনী জানিয়েছে, লিংকনে মানসিক স্বাস্থ্যের পরিস্থিতির ওপর তারা নিবিড়ভাবে নজর রাখছে এবং প্রয়োজনে ক্রু সদস্যদের পেশাদার সহায়তা দিচ্ছে। বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বাহিনীটি বলেছে, ‘আমরা জাহাজে আত্মহত্যাচেষ্টার প্রবণতা বা চিন্তার কোনো বৃদ্ধি লক্ষ্য করিনি। আমরা প্রতিটি সেবা সদস্যের সুস্থতাকে গুরুত্বের সঙ্গে নিই এবং যেকোনো উদ্বেগ যাচাই ও তা সমাধানের জন্য ধর্মীয়, চিকিৎসা ও মানসিক স্বাস্থ্য পেশাদারদের প্রস্তুত রেখেছি।’





