যুদ্ধ ও নৌ-অবরোধে বিপাকে ইরান, তবুও সচল ‘প্রতিরোধের অর্থনীতি’

তেহরানের একটি রাস্তা
তেহরানের একটি রাস্তা | ছবি: সংগৃহীত
0

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সম্মিলিত সামরিক অভিযান এবং নজিরবিহীন নৌ-অবরোধে ইরানের অর্থনীতি চরম সংকটের মুখে পড়লেও তা এখনো পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি, আকাশচুম্বী মূল্যস্ফীতি আর মুদ্রার মানের পতনের মধ্যেও তেহরান যেভাবে টিকে আছে, তাকে বিস্ময়কর মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। মূলত কয়েক দশকের নিষেধাজ্ঞা আর যুদ্ধের অভিজ্ঞতা ইরানকে এক ধরনের ‘সহনশীলতা’ জুগিয়েছে। স্ট্রেইট টাইমসে প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

যুদ্ধের আগের ও পরের চিত্র

যুদ্ধের আগেই ইরান উচ্চ মূল্যস্ফীতির সঙ্গে লড়াই করছিল। ডিম, আলু বা মাংসের মতো নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় অনেকেই খাদ্যাভ্যাস বদলে সয়া মিলের মতো সস্তা বিকল্প বেছে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে পুনরায় আরোপিত নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের তেল রপ্তানি আয় কমে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে রিয়াল বা স্থানীয় মুদ্রার ওপর। ২০২৫ সালে ইরানের প্রবৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ শতাংশ সংকুচিত হয়।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। আবাসন, হাসপাতাল, স্কুল থেকে শুরু করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও জ্বালানি মজুত কেন্দ্রে ইসরাইলি হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির আগে মাত্র ছয় সপ্তাহের হামলায় ইরানের প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, যা দেশটির ২০২৬ সালের সম্ভাব্য জিডিপির প্রায় সমান। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, এ বছর ইরানের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ১ শতাংশ কমতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, দেশটিতে মূল্যস্ফীতি এখন ৭৭ শতাংশে পৌঁছেছে।

বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের কশাঘাত

যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে দেশটির হাজার হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেছে। মে মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, সংঘাত শুরুর পর থেকে অন্তত ১০ লাখ মানুষ কাজ হারিয়েছেন। বেকারভাতার জন্য আবেদনকারীর সংখ্যাও রেকর্ড ছাড়িয়েছে। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) মতে, নতুন করে আরও ৪১ লাখ মানুষ আন্তর্জাতিক দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যেতে পারে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫ শতাংশ।

নৌ-অবরোধ ও ইন্টারনেটে ব্ল্যাকআউট

হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির অংশ হিসেবে এপ্রিলে মার্কিন নৌবাহিনী দেশটির দক্ষিণ উপকূলের বন্দরগুলোতে অবরোধ আরোপ করে। এর ফলে পারস্য উপসাগর দিয়ে তেল ও শিল্পজাত পণ্য রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে টান পড়েছে। অন্যদিকে, দেশজুড়ে ইন্টারনেট শাটডাউন বা ব্ল্যাকআউটের কারণে ইরানি ব্যবসায়ীদের প্রতিদিন ৩ কোটি থেকে ৪ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে।

কেন এখনো ধসে পড়েনি অর্থনীতি?

নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ইরানকে টিকে থাকতে সাহায্য করছে। তারা ছদ্মনামী কোম্পানি এবং তথাকথিত ‘ডার্ক ফ্লিট’ বা নামহীন ট্যাংকারের মাধ্যমে গোপনে তেল রপ্তানি চালিয়ে আসছে। যুদ্ধের আগেই চড়া দামে তেল বিক্রি করে ইরান যে বাড়তি আয় করেছিল, তা বর্তমানে বাফার বা আপৎকালীন তহবিল হিসেবে কাজ করছে।

এছাড়া ইরান সরকার অভ্যন্তরীণ বাজার রক্ষায় খাদ্য ও ইস্পাতসহ প্রয়োজনীয় পণ্য রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে। আমদানির বিকল্প হিসেবে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর যে ‘প্রতিরোধের অর্থনীতি’র ডাক দেশটির সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি দিয়েছিলেন, তার সুফলও এখন তেহরান পাচ্ছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে পাকিস্তান, আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়া ও রাশিয়ার সঙ্গে রেল ও উত্তর উপকূলীয় সমুদ্রপথে বাণিজ্য বাড়িয়েছে ইরান।

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ ও রাজনৈতিক ঝুঁকি

দেশ পুনর্গঠন হবে ইরানের জন্য এক ব্যয়বহুল ও দীর্ঘ প্রক্রিয়া। শান্তি আলোচনায় ইরান প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দাবি করলেও যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি তা দিতে রাজি নয়। তবে বিকল্প হিসেবে একটি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ তহবিল গঠনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে।

ব্লুমবার্গ ইকোনমিকসের এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক ক্ষোভ থেকে ইরানে আবারও গণবিক্ষোভের আশঙ্কা প্রবল। তবে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) ক্ষমতার ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখায় শাসনব্যবস্থার পতনের ঝুঁকি আপাতত মাঝারি পর্যায়ে রয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ব্যাপক বোমা হামলার ফলে ইরানিদের মধ্যে দেশপ্রেম চাঙ্গা হয়েছে, যা সরকারের প্রতি অভ্যন্তরীণ অসন্তোষকে সাময়িকভাবে কমিয়ে দিতে পারে।

এএম