ইরানের বন্দরগুলোর ওপর গত ১৩ এপ্রিল থেকে এই অবরোধ আরোপ করেছে ওয়াশিংটন। শান্তিচুক্তির শর্ত মানতে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের জন্যই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই পদক্ষেপ। তেহরান এই পদক্ষেপকে অবৈধ হিসেবে অভিহিত করেছে এবং তাদের বন্দরের আশপাশে জাহাজ জব্দ করাকে ‘জলদস্যুতা’র শামিল বলেছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলা শুরুর পর ইরান অধিকাংশ দেশের জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। এর জবাবেই মার্কিন নৌ-অবরোধ শুরু হয়। এই সরু নৌপথটি উপসাগর থেকে উন্মুক্ত মহাসাগরে যাওয়ার প্রধান রুট, যা দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস সরবরাহ হয়ে থাকে।
এই সংকটের কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আকাশছোঁয়া হয় এবং সৌদি আরব, কুয়েত, ইরাক ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরের প্রধান উৎপাদক দেশগুলোর রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমে যায়।
তবে এই সময়ে ইরান নিজের তেল রপ্তানি অনেকটাই চালু রাখতে সক্ষম হয়েছিল। প্রণালি দিয়ে কম প্রতিযোগী জাহাজ চলাচল করায় মার্চ এবং এপ্রিলের একটি অংশজুড়ে ইরানের রপ্তানি শক্তিশালী ছিল। এর সঙ্গে বেড়ে যাওয়া তেলের দামও দেশটির রাজস্ব বাড়িয়েছিল।
নতুন তথ্য বলছে, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ-অবরোধ শুরুর পর থেকে এই চিত্র পাল্টে গেছে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি হওয়া তেল ইরানের মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ। সর্বশেষ জাহাজ চলাচলের তথ্য বলছে, এই অবরোধ ইরানের বিদেশে তেল বিক্রির পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে তাদের সবচেয়ে বড় ক্রেতা চীনের কাছে রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অবরোধ এখন ইরানের অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের আর্থিক চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, আর কতদিন ইরান এই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে।
যেভাবে প্রভাবিত হলো ইরানের তেল রপ্তানি
বাণিজ্য গোয়েন্দা সংস্থা ক্যাপলারের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেট রপ্তানি দিনে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল থেকে কমে মে মাসে ৩ লাখ ব্যারেলেরও নিচে নেমে এসেছে। অবরোধ শুরুর আগের ৪০ দিনের তথ্যের সঙ্গে তুলনা করে এই হিসাব দিয়েছে ক্যাপলার।
হরমুজ প্রণালিতে সৃষ্ট সংকটে শুরুতে ইরান কিছুটা লাভবান হলেও পরবর্তীতে এই ধস নেমে আসে। ইরানি অপরিশোধিত তেলের গ্রেডগুলো সাধারণত ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের বেশি দরে বিক্রি হয়েছে, কখনো কখনো ১০০ ডলারও ছাড়িয়েছে।
প্রতি ব্যারেলে রক্ষণশীল হিসেবে ৯০ ডলার ধরলে দৈনিক ৩ লাখ ব্যারেল রপ্তানি থেকে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ৭০ লাখ ডলার আয় হবে, যা মে মাসজুড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৮৩ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
এটি বছরের শুরুর তুলনায় বড় ধরনের পতন। মার্চ মাসে যখন রপ্তানি দৈনিক গড়ে ১৮ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল ছিল, তখন ইরানের দৈনিক আয় ছিল আনুমানিক ১৬ কোটি ৫৬ লাখ ডলার, যা পুরো মাসে দাঁড়ায় প্রায় ৫১৩ কোটি ডলার।
এপ্রিল মাসে গড় রপ্তানি ছিল দৈনিক ১৩ লাখ ৪০ হাজার ব্যারেল, যা দৈনিক প্রায় ১২ কোটি ৬ লাখ ডলার অর্থাৎ পুরো মাসে প্রায় ৩৬২ কোটি ডলার রাজস্ব এনে দিয়েছিল।
লয়েডস লিস্টের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে, মার্চের তুলনায় মে মাসে ইরানের তেল আয় প্রায় ৮৪ শতাংশ কম। ইরান যদি মার্চের মতো মাসিক আয়ের প্রত্যাশা করে থাকে, তাহলে এপ্রিল ও মে মাসে দেশটি প্রায় ৫৮০ কোটি ডলার হারিয়েছে।
ক্যাপলার আল-জাজিরাকে জানিয়েছে, তথ্য বলছে অবরোধের কারণে ইরান থেকে রপ্তানি ব্যাপকভাবে কমে গেছে। তবে ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানো সব ইরানি তেলের হিসাব এতে আসেনি, কারণ ইরানি জলসীমা ত্যাগের পর কিছু কার্গো মালয়েশিয়ার কাছাকাছি গিয়ে এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে স্থানান্তর করা হচ্ছে।
তেল উৎপাদন কি চলছে?
আপাতত হ্যাঁ, তবে যা বিক্রি করতে পারছে না, সেই তেল মজুত রাখতে বাধ্য হচ্ছে তেহরান।
জ্বালানি নীতি বিষয়ক গবেষক ও পরামর্শক মার্ক আইউব আল-জাজিরাকে বলেন, ‘ইরান তার অবশিষ্ট মজুত ক্ষমতাকে কৌশলগতভাবে ব্যবহার করছে। তথ্য বলছে অবরোধ কাজ করছে, কিন্তু আসল চাপ আসবে যখন এই মজুত শেষ হতে শুরু করবে।’
এসব মজুতের একটি বড় অংশ ভাসমান অবস্থায় রয়েছে ট্যাঙ্কারে। ক্যাপলারের তথ্য অনুযায়ী, ভাসমান অবস্থায় বর্তমানে ১৪ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল ইরানি অপরিশোধিত তেল ও কনডেনসেট মজুত রাখা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬ কোটি ৭০ লাখ ব্যারেল উপসাগর ও ওমান উপসাগরের ভেতরে আটকা পড়ে আছে, যা মার্কিন অবরোধের সীমানা পার হতে পারছে না।
কীভাবে কিছু রপ্তানি এখনো হচ্ছে
মে মাসে দৈনিক প্রায় ৩ লাখ ব্যারেল তেল মার্কিন অবরোধ এড়িয়ে বের হচ্ছিল। আইউব বলেন, ‘অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকেও কিছু জাহাজ সামুদ্রিক সীমা অতিক্রম করেছে। ইরান কিছু বিধিনিষেধ এড়ানোর উপায় খুঁজে পেয়েছে, যে কারণে কম পরিমাণে হলেও রপ্তানি চলছে।’
আইউবের মতে, অবরোধের তাৎক্ষণিক প্রভাব উৎপাদন বন্ধ করা নয়, বরং তেল বিক্রি থেকে আসা অর্থপ্রবাহকে—বিশেষ করে চীনের কাছ থেকে আসা অর্থ—বাধাগ্রস্ত করা। তিনি বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে এটি বেদনাদায়ক, তবে তাৎক্ষণিকভাবে এটি কোনো অর্থনৈতিক ধাক্কা তৈরি করছে না।’
হরমুজ ও মালাক্কা প্রণালির মতো সামুদ্রিক চোকপয়েন্টগুলোর ওপর নির্ভরতা কমাতে ইরান ও চীন বছরের পর বছর ধরে স্থলপথে বাণিজ্য রুট গড়ে তুলেছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের তেল রপ্তানির জন্য রেল পরিবহন কোনো অর্থবহ বিকল্প হতে পারবে না। চীন ও ইরানের মধ্যে চলাচলকারী অধিকাংশ মালবাহী ট্রেনে অপরিশোধিত তেলের পরিবর্তে শিল্পপণ্য ও ভোগ্যপণ্য বহন করা হয়।
এতে বড় ধরনের সরবরাহজনিত চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ইরানের অধিকাংশ তেলক্ষেত্র দেশটির দক্ষিণে অবস্থিত, যেখানে ইরানি অপরিশোধিত তেল পরিশোধনের অধিকাংশ চীনা সক্ষমতা পূর্ব উপকূলে কেন্দ্রীভূত, যা মধ্য এশিয়ার রেল করিডর থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে।
রেলপথে সাধারণত একটি তেলের চালান ৬০ থেকে ৭০ হাজার ব্যারেল বহন করে। ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার দরে ৭০ হাজার ব্যারেলের একটি চালানের মূল্য হবে প্রায় ৬৩ লাখ ডলার। তুলনায়, একটি প্রচলিত তেল ট্যাঙ্কার ৬ লাখ ব্যারেলেরও বেশি অপরিশোধিত তেল বহন করতে পারে। আর ‘ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার’ (ভিএলসিসি) এক যাত্রায় ২০ লাখ ব্যারেলের বেশি বহন করতে পারে। অর্থাৎ একটি ট্যাঙ্কারের সমান পরিমাণ তেল বহন করতে কয়েক ডজন ট্রেনের চালান প্রয়োজন।
এই ধাক্কা সামলাতে পারবে ইরান?
বিশ্লেষকরা বলছেন, কোন পক্ষ অর্থনৈতিক যন্ত্রণা বেশি সময় ধরে সহ্য করতে পারে—এই অবরোধ মূলত এ ধরনের একটি প্রতিযোগিতা। তেল রাজস্ব কমলে তা ইরানের সামরিক অভিযান পরিচালনা ও যুদ্ধকালীন অর্থনীতি সচল রাখার সক্ষমতাকে ধীরে ধীরে দুর্বল করবে। তবে এর খরচ কেবল ইরানই বহন করছে না।
হরমুজ প্রণালির অচলাবস্থা উপসাগরের প্রধান উৎপাদক দেশগুলোকেও স্বাভাবিক রপ্তানিতে বাধা দিচ্ছে। ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানির দাম বাড়ছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে চাপ বাড়ছে, যা মার্কিন বাজারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
আইউব বলেন, ‘ইরানে এখন চাপ শুরু হয়েছে। প্রশ্ন হলো—এই চাপ যেন কাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলে, ততদিন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বৃহত্তর অর্থনৈতিক পরিণতিগুলো বহন করে যেতে পারবে কি না।’ তিনি আরও বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত যে চুক্তিই হোক না কেন, মূল প্রশ্ন থেকে যাবে—কে এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ পাবে। হয় ইরান কোনো না কোনোভাবে এর ওপর প্রভাব ধরে রাখবে, নয়তো এই সংঘাত আরও কয়েক মাস ধরে চলবে।’





