প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানে হামলার কারণে তেল ও গ্যাস উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ এ অঞ্চল থেকে সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। এ বিঘ্ন যদি সাময়িকও হয়, তবুও বিশ্বজুড়ে জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া প্রায় নিশ্চিত।
তবে দাম ঠিক কতটা বাড়বে এবং তা কতদিন স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং ইরানের প্রতিক্রিয়ার ওপর।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম এ বছর এরইমধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছে। সবশেষ গত শুক্রবার তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ৭৩ ডলারের কাছাকাছি ছিল। রোববার তা সাময়িকভাবে ৮২ ডলার অতিক্রম করে আবার কিছুটা কমেছে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, জ্বালানি বাণিজ্য যত দীর্ঘকাল ব্যাহত হবে, সাধারণ মানুষের ওপর চাপ তত বাড়বে। শুধু পেট্রোল পাম্পে নয়, বরং নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ বা 'ব্লোব্যাক' তৈরি করতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের জেরে সোমবার এশিয়ার বাজারে তেলের দাম হু হু করে বেড়েছে। অন্যদিকে ধস নেমেছে শেয়ারবাজারে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। একাধিক জাহাজে হামলার খবরও পাওয়া গেছে। টোকিও থেকে এএফপি এ খবর জানিয়েছে।
দিনের শুরুতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম শুক্রবারের ৭২ দশমিক ৮৭ ডলার থেকে বেড়ে ব্যারেল প্রতি ৮০ ডলারের কিছু ওপরে উঠে যায়। পরে তা সামান্য কমে ৭৯ ডলারের নিচে নামে।
শেয়ারবাজারে জাপানের নিক্কেই সূচক ২ দশমিক ২ শতাংশ পড়ে যায়। সিডনিতেও সূচক ০ দশমিক ৫ শতাংশ কমে যায়। নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে পরিচিত স্বর্ণের দাম বেড়েছে ২ শতাংশ।
আরও পড়ুন:
গত শনিবার শুরু হওয়া হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। এর পরই এ সব পণ্যের দাম আরও বাড়তে থাকে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাধারণ ইরানিদের সরকার বিরোধী আন্দোলনের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, যুদ্ধ চার সপ্তাহ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলে চার জন নিহত ও বহু মানুষ আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পাঠানো হয়।
যদিও ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেয়নি। তবে দেশটির রেভোলিউশনারি বা বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এ পথ দিয়ে চলাচল না করার ব্যাপারে সতর্কবার্তা দিয়েছে।
রোববার ওমান উপকূলে একটি জাহাজ এবং আমিরাতের কাছে আরেকটি জাহাজে হামলা হয়েছে বলে দাবী করেছে ব্রিটিশ সামুদ্রিক নিরাপত্তা সংস্থা ইউকেএমটিও।
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন দাবি করেছে, একটি তেলবাহী ট্যাংকার প্রণালি দিয়ে ‘অবৈধভাবে’ যাওয়ার চেষ্টা করলে, সেটিতে হামলা চালানো হয় এবং নৌযানটিকে ডুবে যেতে দেখা যায়।
বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের মধ্যপ্রাচ্য ও ওপেক প্লাস গবেষণা প্রধান আমেনা বকর বলেন, এমন পরিস্থিতিতে বীমা খরচ আকাশ ছোঁয়া হবে।
তার মতে, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে তেলের দাম ৯০ ডলারেও পৌঁছাতে পারে। বড় বড় শিপিং কোম্পানিগুলো ইতোমধ্যেই ওই পথ দিয়ে জাহাজ চলাচল সাময়িকভাবে স্থগিত করার ঘোষণা দিয়েছে।
রিস্ট্যাড এনার্জির বিশ্লেষক জর্জ লিওন বলেছেন, হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলে প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ ঘাটতি তৈরি হবে।
তেল আমদানিকারক দেশগুলোর ৯০ দিনের তেল মজুত রাখার বাধ্যবাধকতা আছে। তবুও দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যাওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আমেনা বকর বলেন, প্রণালিতে অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে, কৌশলগত মজুত দিয়েও সেই ঘাটতি পূরণ সম্ভব হবে না। কেপলারের আরেক বিশ্লেষক মিশেল ব্রুহার্ড তেলের দাম বাড়াকে ট্রাম্পের ‘অ্যাকিলিস হিল’ বলে মন্তব্য করেছেন।
তিনি মনে করেন, ইরান দাম বাড়িয়ে বিক্রি করতে চাইবে, যাতে ট্রাম্প চাপের মুখে পড়েন। কারণ তিনি মার্কিন জনগণকে কম দামে পণ্য সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন কড়া নাড়বে বছর শেষে।
এদিকে, বিশ্ববাজারে গ্যাসের দামও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কাতার বিশ্বে তরল প্রাকৃতিক গ্যাসের অন্যতম বড় রপ্তানিকারক দেশ।
গ্যাসের এই দাম বৃদ্ধিতে মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুতে সর্বশেষ তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়েছিল। তখন গ্যাসের দামও লাফিয়ে বাড়ে। পরবর্তীতে যা দীর্ঘমেয়াদি মূল্যবৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখে।
পেট্রোলের দাম, জ্বালানি ব্যয় ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধির বিপরীতে বিমান খাতে আয় কমে যাওয়া, সব মিলিয়ে প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন প্যারিসের আইইএসইজি স্কুল অব ম্যানেজমেন্টের অর্থনীতিবিদ এরিক ডর।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি তিন দিনের মধ্যে সীমিত থাকলে, বড় ঝুঁকি নেই। তবে দীর্ঘস্থায়ী হলে অতিরিক্ত মন্দার চাপ তৈরি হবে।
শেয়ারবাজারে সোমবার কয়েকটি খাত লাভজনক অবস্থানে থাকতে পারে। যার মধ্যে একটি হলো, প্রতিরক্ষা খাত। তবে ডরের মতে, সামগ্রিকভাবে শেয়ারের দাম কমার আশঙ্কাই বেশি। এর মধ্যে বিমান পরিবহন, সামুদ্রিক পরিবহন ও পর্যটন খাতের শেয়ারে বড় ধস নামার শঙ্কা রয়েছে।





