সর্বশেষ ১ মার্চ ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি এক যৌথ মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় নিহত হয়েছেন। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে পরিচালিত ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’তে খামেনির বাসভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এতে ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও প্রভাবশালী আইআরজিসি কমান্ডারসহ একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন বলে দাবি করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল একটি সামরিক হামলা নয়; বরং ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব-পরবর্তী ৪৬ বছরের রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর সরাসরি আঘাত। খামেনির মৃত্যু ইরানে একটি বড় নেতৃত্ব শূন্যতা তৈরি করতে পারে; যার প্রভাব অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই থেকে শুরু করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
সাদ্দাম হোসেন: শাসক থেকে বন্দি
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ইরাক আক্রমণের পর সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন তিকরিতের একটি গোপন আস্তানা থেকে আটক হন। তিন বছর বিচার শেষে ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ভোরে তার ফাঁসি কার্যকর করা হয়।
সাদ্দামের পতন ইরাকে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং আইএসের উত্থানের পথ তৈরি করে; যা গোটা অঞ্চলকে অগ্নিগর্ভ করে তোলে।
মুয়াম্মার গাদ্দাফি: ড্রোন নজরদারি থেকে বিদ্রোহীদের হাতে মৃত্যু
২০১১ সালে লিবিয়ায় ন্যাটোর সামরিক হস্তক্ষেপের সময় দীর্ঘদিনের শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফি সির্ত শহর থেকে পালানোর সময় হামলার মুখে পড়েন। মার্কিন ড্রোন ও ফরাসি যুদ্ধবিমানের সহায়তায় তার গাড়িবহর থামিয়ে দেয়া হয়। পরে বিদ্রোহীদের হাতে ধরা পড়ে তিনি নিহত হন।
গাদ্দাফির পতনের পর লিবিয়া কার্যত ভেঙে পড়ে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলোর দখলযুদ্ধে, যা আজও পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়নি।
কাসেম সোলেইমানি: ড্রোন হামলার নতুন যুগ
২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরানের প্রভাবশালী জেনারেল কাসেম সোলেইমানি বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে মার্কিন ড্রোন হামলায় নিহত হন। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি এ অভিযানের অনুমোদন দেন।
এ হামলা মধ্যপ্রাচ্যে টার্গেটেড ড্রোন হত্যাকাণ্ডকে নতুন মাত্রা দেয় এবং ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা চরমে পৌঁছে যায়।
হাসান নাসরুল্লাহ: বাঙ্কারও রক্ষা দিতে পারেনি
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বৈরুতে হিজবুল্লাহ প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ মাটির গভীরে বৈঠকের সময় ইসরাইলি বিমান বাহিনীর ধারাবাহিক বাঙ্কার-বাস্টার বোমা হামলায় নিহত হন বলে দাবি করা হয়। ভূগর্ভস্থ সুরক্ষিত সদর দপ্তরও শেষ পর্যন্ত ধ্বংস হয়।
এটি দেখিয়ে দেয়, আধুনিক সামরিক প্রযুক্তি ভূগর্ভস্থ নিরাপত্তাকেও অকার্যকর করে দিতে সক্ষম।
ইসমাইল হানিয়াহ ও ইয়াহিয়া সিনওয়ার
হামাসের রাজনৈতিক নেতা ইসমাইল হানিয়াহ তেহরানে এক রহস্যজনক বিস্ফোরণে নিহত হন। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, পূর্ব-পরিকল্পিত বিস্ফোরক ডিভাইস দূর থেকে সক্রিয় করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, গাজার রাফাহতে আকস্মিক সংঘর্ষে নিহত হন হামাসের আরেক শীর্ষ নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার। তার মৃত্যুর ভিডিও বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তোলে।
আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অভিঘাত
এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলো প্রমাণ করে; মধ্যপ্রাচ্যে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা নেতৃত্ব অপসারণ কৌশল এখন আর কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের বিষয় নয়; এটি গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক, সাইবার নজরদারি এবং নিখুঁত অস্ত্র প্রযুক্তির সমন্বিত প্রয়োগ।
ইতিহাস বলছে, সাদ্দাম বা গাদ্দাফির পতনের পর স্থিতিশীলতা আসেনি দ্রুত; বরং নতুন সংকটের জন্ম হয়েছে। ফলে খামেনির পর ইরানের ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে; তা নির্ভর করবে নিরাপত্তা কাঠামোর ভাঙন, জনমত এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর কৌশলের ওপর।
মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক দাবার ছকে আরেকটি বড় চাল হয়ে রইলো এ ঘটনা; যার প্রতিক্রিয়া শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাতেও দীর্ঘ ছায়া ফেলতে পারে।





