নির্দেশনার প্রথম দিনেই বিপত্তি
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৫ জুন থেকে সারা দেশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জন্য অনলাইন হাজিরা কার্যক্রম বাধ্যতামূলক করেছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিদিন সকাল ৯টার মধ্যে বিদ্যালয়ে উপস্থিত হয়ে হাজিরা খাতার ছবি তুলে তাৎক্ষণিকভাবে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে পাঠাতে হবে।
নির্দেশনার প্রথম দিনেই রাঙামাটির বাঘাইছড়ির দুর্গম পাগয্যাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আবু তাহের ফোর-জি ‘নেটওয়ার্কের অভাবে’ ছবি পাঠাতে ব্যর্থ হন। বিদ্যালয়টি মূলত দুটি পাহাড়ের মাঝখানের নিচু উপত্যকায় অবস্থিত হওয়ায় সেখানে কোনো মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। বাধ্য হয়ে তিনি হাজিরা নিশ্চিত করতে বিদ্যালয় থেকে প্রায় ৩০০-৪০০ ফুট উঁচু পাহাড়ে ওঠেন। সেখানেও নেটওয়ার্ক না পেয়ে শেষ পর্যন্ত পাশে থাকা একটি আমগাছের মগডালে চড়ে ছবি পাঠানোর চেষ্টা করেন।
প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আবু তাহের এখন টিভিকে জানান, বিদ্যালয়ের ভেতরে বা ছাদে কোথাও ফোর-জি নেটওয়ার্ক নেই। পাহাড়ে উঠেও সিগন্যাল না পেয়ে তিনি গাছে ওঠার চেষ্টা করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত গাছে উঠেও হোয়াটসঅ্যাপে ছবি পাঠানো সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে তিনি বাঘাইছড়ি উপজেলা শিক্ষা অফিসারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে মুঠোফোনে সাধারণ এসএমএসের মাধ্যমে হাজিরা দেয়ার অনুমতি পান।
আরও পড়ুন:
প্রধান শিক্ষকের বর্ণনায় পার্বত্য অঞ্চলের বাস্তবতা
দুর্গম অঞ্চলের বাস্তবতার কথা তুলে ধরে প্রধান শিক্ষক এখন টিভিকে বলেন, ‘সমতল আর পার্বত্য অঞ্চলের বাস্তবতায় অনেক তফাত রয়েছে। রাজধানীর মতো উন্নত নেটওয়ার্ক ও যোগাযোগব্যবস্থা এখানে পৌঁছাতে হয়তো আরও ৫০ বছর লেগে যেতে পারে। প্রতিটি বিদ্যালয়ে আগে নেটওয়ার্ক ও অবকাঠামো নিশ্চিত না করে এই নিয়ম চাপানো (অনলাইন হাজিরা) কতটুকু যৌক্তিক, তা ভাবা দরকার।’
তিনি নিজের প্রতিদিনের যাতায়াতের বিবরণ দিয়ে এখন টিভিকে বলেন, ‘প্রতিদিন সকাল ৮টায় বাসা থেকে মোটরসাইকেলে ১০ কিলোমিটার কাদা ও মেঠো পথ পাড়ি দিয়ে মূল সড়কের ধারে গাড়ি রাখতে হয়। সেখান থেকে দুই-আড়াই কিলোমিটার খাড়া পাহাড় ও জঙ্গল বেয়ে পায়ে হেঁটে নোংরা হয়ে স্কুলে পৌঁছাতে হয়। তিন শিক্ষকের এই বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৩৫ জন শিক্ষার্থী রয়েছে।’
বাঘাইছড়ি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) সঞ্চয়ন চাকমা জানান, উপজেলার মোট ১১৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে প্রথম দিনে ৮৮টি বিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা অনলাইনে হাজিরা দিতে পেরেছেন। ফোর-জি নেটওয়ার্ক না থাকায় বাকি ২৮টি বিদ্যালয়ের ৮৩ জন শিক্ষকের অনলাইন হাজিরা পাওয়া যায়নি। তবে তাদের ক্ষেত্রে বিকল্প উপায়ে (সাধারণ এসএমএস বা কল) তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
উঁচুতে উঠলে সত্যিই বাড়ে ইন্টারনেট?
মোবাইল নেটওয়ার্কের সিগন্যাল বার যখন শূন্যে নেমে আসে, তখন একটু ভালো সংযোগের আশায় সাধারণ মানুষের উঁচুতে ওঠার প্রবণতা দেখা যায়। তবে পদার্থবিজ্ঞান এবং রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তথ্যসূত্র বলছে, নেটওয়ার্ক খোঁজার জন্য গাছের চেয়ে উন্মুক্ত পাহাড়ে চড়া বহুগুণ বেশি কার্যকর ও বৈজ্ঞানিক।
লাইন অব সাইট: মোবাইল সিগন্যাল মূলত সোজা লাইনে যাতায়াত করে। সমতলে ঘরবাড়ি, গাছপালা বা মাটির উপরিভাগের বিভিন্ন ভৌগোলিক বাধায় এই তরঙ্গ আটকে যায়। পাহাড়ে উঠলে চারপাশের এই দৃশ্যমান বাধা এবং পৃথিবীর বক্রতার চেয়ে উঁচুতে চলে যাওয়া যায়। ফলে মাইলের পর মাইল দূরবর্তী মোবাইল টাওয়ারের সঙ্গে ফোনের সরাসরি সংযোগ বা ‘লাইন অব সাইট’ তৈরি হয়, যা সমতলে অসম্ভব ছিল।
গাছের পাতা ও পানির বাধা: নেটওয়ার্কের আশায় গাছে চড়ার হিসাবটা বৈজ্ঞানিকভাবে একেবারেই ভিন্ন ও ক্ষতিকর। গাছ সামান্য উচ্চতা দিলেও এর পাতা এবং রসে প্রচুর পরিমাণে পানি থাকে। পানি মোবাইল সিগন্যালের মতো উচ্চ-ফ্রিকোয়েন্সির রেডিও তরঙ্গকে শুষে নেয়। ফলে গাছের নিচে বা ডালপালার ভেতরে নেটওয়ার্ক আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি থাকে। তবে কেউ যদি ঘন পাতা পেরিয়ে একদম মগডালে খোলা আকাশের নিচে পৌঁছাতে পারেন, কেবল তখনই চারপাশের ছোটখাটো বাধা দূর হয়ে কিছুটা সিগন্যাল মিলতে পারে। তাই বিজ্ঞান বলছে, নেটওয়ার্কের খোঁজে গাছের পাতায় ঢাকা ডালপালার চেয়ে উন্মুক্ত উঁচু পাহাড়ই ‘ভালো সমাধান’।
স্থিরচিত্র পাঠাতে কেমন ইন্টারনেট প্রয়োজন?
স্মার্টফোনের হোয়াটসঅ্যাপ বা ফেসবুক মেসেঞ্জারে যেকোনো ছবি, অডিও বা ডকুমেন্ট ফাইল পাঠানোর জন্য মোবাইল সেল টাওয়ারের সংকেত এবং সচল ইন্টারনেট দুটিই অপরিহার্য।
প্রযুক্তি ও যোগাযোগের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো সাধারণ টেক্সট মেসেজ বা ছোট ফাইল আদান-প্রদানের জন্য নূন্যতম ২জি ইন্টারনেট সংযোগই যথেষ্ট। ২জি নেটওয়ার্কের ডেটা ট্রান্সফার গতি অত্যন্ত ধীর (কেবিপিএস) হলেও; এটি ফাইলকে ডিজিটাল প্যাকেটে রূপান্তর করে ধীরগতিতে গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারে। তবে ফাইলের আকার বড় হলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই নিরবচ্ছিন্ন ও দ্রুত ছবি বা ফাইল পাঠানোর স্বস্তিদায়ক অভিজ্ঞতার জন্য বর্তমানে উচ্চ ব্যান্ডউইথসম্পন্ন ৩জি বা ৪জি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা সবচেয়ে শ্রেয়।




