ইরাক থেকে ভেনেজুয়েলা; মার্কিন ‘তেল রাজনীতির’ পুরনো ছক

যুক্তরাষ্ট্র তেল নিয়ন্ত্রণের রাজনীতির সমালোচক দেশের নেতারা
যুক্তরাষ্ট্র তেল নিয়ন্ত্রণের রাজনীতির সমালোচক দেশের নেতারা | ছবি: এখন টিভি
0

জ্বালানি তেলের বাজারে আধিপত্য ধরে রাখতে যুক্তরাষ্ট্র যা খুশি তাই করতে পারে বলে বহু বছর আগেই সতর্ক করেছিলেন পুরনো শত্রুরা। বিশ্ব মোড়ল হিসেবে টিকে থাকতে যুক্তরাষ্ট্র ইরাককে ধ্বংস করে তেলের নিয়ন্ত্রণ চায়— এমন মন্তব্য করায় সাদ্দাম হোসেনের শেষ পরিণতি মৃত্যুদণ্ড হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নিকোলাস মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের বন্দি হওয়ার পর বিশ্ববাসীর নজর এখন ভেনেজুয়েলায়। মাদক-সন্ত্রাস মামলায় স্ত্রীসহ ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে গ্রেপ্তারের কথা বলা হলেও, এর পেছনে ট্রাম্প-প্রশাসনের মূল মোটিভ নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। অনেকেই বলছেন. কারাকাসের তেল ভাণ্ডার কব্জায় নিতেই এ নাটক সাজিয়েছে ওয়াশিংটন। কারণ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অপরিশোধিত তেলের মজুত আছে দেশটিতে। যা সৌদি আরব ও ইরানের চেয়েও বেশি।

এমন পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলা থেকে প্রথম ধাপে ৫ কোটি ব্যারেল পর্যন্ত তেল নেয়ার ঘোষণা দিয়ে সমালোচনা আরও উস্কে দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমনকি রাশিয়া, চীন, ইরান ও কিউবার সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্ক ছিন্ন না করলে ভেনেজুয়েলাকে নতুন করে তেল উত্তোলন করতে দেয়া হবে না বলে হুমকিও দিয়েছে হোয়াইট হাউজ।

এর অর্থ হলো ভেনেজুয়েলার সব তেলই চায় যুক্তরাষ্ট্র। নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের দায়ে বেশ কয়েকদিন ধাওয়ার পর বুধবার (৭, জানুয়ারি) আটলান্টিক মহাসাগর থেকে রুশ পতাকাবাহী তেলের ট্যাঙ্কার জব্দ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এতে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে চলমান উত্তেজনা মোড় নিয়েছে ওয়াশিংটন-মস্কো উত্তেজনায়। এমনকি ভেনেজুয়েলা থেকে অন্য দেশে তেল সরবরাহে বাধা দেয়ায় ক্ষোভ ঝাড়ছে চীনও।

চীনের মুখপাত্র পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মাও নিং বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ভেনেজুয়েলার তেল খাতে অবৈধভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে। সম্প্রতি এর জন্য ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে নির্লজ্জভাবে সামরিক শক্তিও প্রয়োগ করেছে। যা দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক শৃঙ্খলার ওপর মারাত্মক আঘাত। এছাড়া বৈশ্বিক তেল উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।’ 

এ অবস্থায় এখন প্রশ্ন ওঠেছে ভেনেজুয়েলাকে নিয়ে উত্তেজনা কোনো ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনায় মোড় নিচ্ছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রে লাভই বা কী? এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব মোড়ল হয়ে ওঠার পেছনে রয়েছে, জ্বালানি তেলের বাজারে আধিপত্য ধরে রাখার লম্বা ইতিহাস। তেল খাতের নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে যারাই বাধা হয়ে ওঠেছিলো,তাদের সন্ত্রাসী তকমা দেয়ার অভিযোগও আছে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে। মাদুরোর আগে এ তালিকায় ছিলেন, ভেনেজুয়েলার সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজও।

২০০৬ সালে ভেনেজুয়েলা সাবেক প্রেসিডেন্ট, হুগো শ্যাভেজ বলেছিলেন, ‘মার্কিন সরকার শান্তি চায় না। তারা যুদ্ধের মাধ্যমে তাদের শোষণ, লুণ্ঠন এবং আধিপত্যের ব্যবস্থা চাপিয়ে দিতে চায়।’

বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণে তেলের লাগাম টেনে ধরতে চায়, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এমন কথা বলে চক্ষুশূল হয়েছিলেন ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন। শেষ পরিণতি হয়েছিলো মৃত্যুদণ্ড।

২০০৩ সালে ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘তুমি যদি পুরো বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাও, তাহলে তোমাকে তেল নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। তেল নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হল ইরাককে ধ্বংস করা।’

শুধু তাই নয়, তেল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সচ্চার ছিলেন কিউবার বিপ্লবী নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো, লিবিয়া'র মুয়াম্মার গাদ্দাফি এবং দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলাও।

আরও পড়ুন:

২০০৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন, ‘যদি এমন কোনও দেশ থাকে যারা পৃথিবীতে অবর্ণনীয় নৃশংসতা চালাচ্ছে, তাহলে তা হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।’ 

ইরাকে সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে ফাঁসি দেয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের দিকে প্রশ্নের তীরও ছুড়ে দিয়েছিলেন লিবিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট ।

এদিকে ২০০৬ সালে লিবিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট, মুয়াম্মার গাদ্দাফিও বলেছিলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রকে জিজ্ঞেস করতে চাই, ইরাকে গণবিধ্বংসী অস্ত্র কোথায় ছিল? আমি বলবো ছিল না। আর একজন যুদ্ধবন্দীকে কীভাবে ফাঁসি দেয়া যেতে পারে? একজন আরব দেশের প্রেসিডেন্ট এবং আরব লীগের সদস্য। তোমাদের মধ্যে যে কেউ পরবর্তী হতে পারে।’

তেল নিয়ে আধিপত্যের লড়াইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ থাকলেও, যুগ যুগ ধরে হোয়াইট হাউজে জবাব বা যুক্তি একই। তা হলো, গণতন্ত্র ও নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে লড়াই করে যাচ্ছেন তারা।

এদিকে ভেনেজুয়েলার তেল বাণিজ্য ঘিরে রাশিয়া, চীন, ইরান, কিউবার সঙ্গে শুরু হওয়া উত্তেজনার পারদ বাড়ায়ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

এএম